দুর্গা ও দুর্গাপুজো
জ্যোতিষাচার্য উৎপলকুমার দাস
ভারতীয় জীবনযাত্রায় দুর্গা উৎসব শুধু বাহ্যিক আচরণ বিশিষ্ট কোনও পুজো বা অনুষ্ঠান নয়। এই পুজো এখানে জীবনের সঙ্গে মিলেমিশে রয়েছে। এই দেশে সব বর্ণের , সব জাতির মানুষ স্বাধীনভাবে নিজেদের পুজো,আচার–অনুষ্ঠান পালন করে থাকেন। তবে এর মধ্যে শারদীয়া দুর্গোৎসবকেই জাতীয় পুজোর মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
বহুল প্রচলিত ধারণা হল, দুর্গাপুজো কেবলমাত্র বাঙালির উৎসব। কিন্তু সারা ভারত জুড়েই এই উৎসব বিভিন্নভাবে, ভিন্ন নামে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। কাশ্মীর ও দক্ষিণাত্যে অম্বা ও অম্বিকা নামে, গুজরাটে হিঙ্গুলা ও রুদ্রাণী রূপে, কান্যকুব্জ বা কনৌজে কল্যাণী নামে, মিথিলায় উমা নামে এবং কুমারিকা প্রদেশে কন্যাকুমারী নামে দেবী পূজিতা হন দেবী।
ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলে যখন দুর্গা পুজো উদযাপিত হয়, সেই সময় দাক্ষিণাত্যে পালিত হয় নবরাত্রি উৎসব। সরস্বতী, লক্ষ্মী ও দুর্গাকে একসঙ্গে আরাধনা করা হয়। প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত ৯ রাত ধরে এই পুজো হয় বলে এর নাম নবরাত্রি। উত্তর ভারতে পালিত হয় দশেরা উৎসব দিন। দশমীর দিন দশমাথা রাবণের এক বিশাল মূর্তি তৈরি করে রাবণ বধের বিজয় উৎসব পালিত হয়।
এবার প্রশ্ন হল দেবী দুর্গা কে? তিনি কি বৈদিক দেবী? নাকি তন্ত্র, বেদপূর্ব দেবতা সে বিষয়ে কোনও সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেই। আদ্যা স্তোত্রে স্বয়ং শিব বলেছেন, ‘ত্বং কালী তারিণী দুর্গা ষোড়শী ভুবনেশ্বরী। ধূমাবতী ত্বং বগলা ভৈরবী ছিন্নমস্তিকা’। অর্থাৎ দশমহাবিদ্যার মূল আদ্যাশক্তি দক্ষিণা কালীর সঙ্গে দুর্গার অভিন্নতার বিষয়ে কোনও প্রশ্নই থাকে না। ‘দুর্গা’ শব্দে বিভিন্ন অর্থ শব্দকল্পদ্রুমে আছে— ‘দুর্গো দৈত্যে মহাবিঘ্নে ভববন্ধে কুকর্মণি। শোকে দুঃখে চ নরকে যমদণ্ডে চ জন্মনি। মহাভয়েহতিরোগে চাপ্যাশব্দো হন্থবাচক। এতান হন্ত্যেব যা দেবী সা দুর্গা পরিকীর্তিতা।’ অর্থাৎ দুর্গ নামক দৈত্য, মহাবিঘ্ন (বড় বাধা), ভববন্ধন (সংসার বন্ধন), কুকর্ম বা কুকার্য, শোক, দুঃখ, নরকবাস, যমদণ্ড (মৃত্যুর শাস্তি), জন্ম (বারবার জন্মগ্রহণের কষ্ট), মহাভয় এবং অতিরোগ (কঠিন ব্যাধি)। ‘আ’ শব্দের অর্থ হনন করা। হন্তা বা নাশক (যিনি ধ্বংস করেন)। অর্থাৎ উপরোক্ত এই সকল বিষয়কে যিনি হরণ করেন তিনি দুর্গা।
আবার দেবীই স্বয়ং চণ্ডীতে বলেছেন,‘তত্রৈব চ ব্যাধিষ্যামি দুর্গমাখ্যং মহাসুরম। দুর্গা দেবীতি বিখ্যাতং তন্মে নাম ভবিষ্যতি।’

অর্থাৎ দুর্গম নামে এক ভয়ঙ্কর অসুরকে বধ করে আমি দেবী দুর্গা নামে খ্যাত হবো। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে আছে, ‘নারায়ণী মহাভাগে দুর্গে দুর্গতিনাশিনী’। অর্থাৎ দুর্গতিনাশিনী নারায়ণী। তাঁর স্মরণে মানব কুলের দুর্গতি নাশ হয়। স্কন্ধ পুরাণে আছে, অদ্য প্রভৃতি মে নাম দুর্গেতি খ্যাতিমেষ্যতি। দুর্গ দৈত্যস্য সমরে পাতনাদতিদুর্গমাৎ, যে মাং দুর্গাং শরনগা ন তেষাং দুর্গতি।
যস্মাৎ ত্বয়া হতস্তত্র দুর্গামাখ্যো মহাসুরঃ। অর্থাৎ দুর্গম নামক দৈত্যকে যুদ্ধে বধ করার ফলে আজ থেকে আমি দুর্গা নামে খ্যাত হলাম। যে আমার স্মরণ নেবে, তার কখনও দুর্গতি হবে না। দেবী পুরাণে দেবীকে দুর্গে বিরাজমানা বলে অভিহিত করা হয়েছে। প্রচলিত মতে, দেবী দুর্গা দুর্গতি ও শঙ্কা হরণ করেন বলে তিনি দুর্গা দুর্গতিনাশিনী। চণ্ডীতে দুর্গার তিনটি রূপের কথা পাওয়া যায়— দুর্গা রূপে দেবী মহিষাসুরকে বধ করেন, মধু ও কৈটভ বধের জন্য আবির্ভূতা হন দুর্গার অংশ মহাকালী রূপে। অন্যদিকে শুম্ভ নিশুম্ভকে বধ করেন দুর্গার অংশ দেবী কৌশিকী। যার সঙ্গে তারাপীঠের কৌশিকী বা কৌশি অমাবস্যার উল্লেখ রয়েছে। এই কৌশিকী আসলে জয় দুর্গা, গনেশাদি পঞ্চ দেবতার অন্যতম।
