সন্ধিপুজো কী? কেন? এই পুজোয় কী ফল পাওয়া যায়?
জ্যোতিষাচার্য উৎপলকুমার দাস
দুর্গাপুজো হিন্দু বাঙালিদের সবচেয়ে বড় উৎসব। এই পুজোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ সন্ধিপুজো। ‘সন্ধি’ মানে মিলন। অর্থাৎ অষ্টমী ও নবমীর মিলনক্ষণে দেবী দুর্গাকে পুজো করা হয়। এই ক্ষণটিতে দেবী পুজিতা হন চামুণ্ডা রূপে। কথিত আছে, এই ক্ষণে মহিষাসুরের সঙ্গে দেবীর যুদ্ধ হয়েছিল এবং মহিষাসুরের দুই সেনাপতি চণ্ড ও মুণ্ডকে বধ করেছিলেন দুর্গা। সেই থেকে তিনি খ্যাত হন চামুণ্ডা নামে। চণ্ড ও মুণ্ডকে যে সন্ধিক্ষণে বধ করা হয়েছিল, তাকে স্মরণে রেখেই সন্ধিপুজোর আয়োজন করা হয় অষ্টমীর শেষ দণ্ড ও নবমীর প্রথম দণ্ডে। ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা মতে, সন্ধি পুজোর সময় ২ কার্তিক অর্থাৎ ১৯ অক্টোবর ২০২৬। এই পঞ্জিকা মতে দিবা ১০–২৮ গতে সন্ধিপুজো শুরু, দিবা ১০–৫২ গতে বলিদান এবং দিবা ১১–১৬ গতের মধ্যে সন্ধিপুজো সমাপন।
এখন প্রশ্ন হল, এই পুজো এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? সন্ধিপুজোয় দুর্গার পরিবর্তে কালীর আরেক রূপ দেবী চামুণ্ডার পুজো করা হয়ে থাকে। পুরাণ মতে, চণ্ড–মুণ্ড নামে দুই অসুর দেবী অম্বিকার সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য হঠাৎ উপস্থিত হয়। তখন দেবী অম্বিকা হিমালয় পর্বতে সিংহের ওপর বসে ছিলেন। তাঁকে দেখে দুই অসুর দৌড়ে আসে
এবং দেবীকে পেছন থেকে আক্রমণ করে। অসুরদের এমন অশোভন আচরণে দেবী অম্বিকা ক্রোধে কাঁপতে থাকেন এবং তাঁর মুখমণ্ডল কালো রূপ ধারণ করে। রাগে তাঁর ত্রিনেত্র খুলে যায়। তখন তাঁর ললাট দেশ থেকে দেবী কালীকা নির্গত হন। ভয়ঙ্করী কালিকা অসুরদের সঙ্গে মহাযুদ্ধ করে তাদের বিনাশ করেন। এই কারণেই তিনি চামুণ্ডা নামে পরিচিত। অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট এবং নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট মিলিয়ে মোট ৪৮ মিনিট সময়ের যে মহা সন্ধিক্ষণ, সেই সময়টিতে সন্ধিপুজো করা হয়ে থাকে। এই সময়টি প্রতিবছরই পরিবর্তিত হয়। কোনও বছর এই সন্ধিক্ষণ রাতে আবার কোনও কোনও বছর ভোররাত্রেও হতে পারে। দুর্গাপুজোর এই মহা সন্ধিক্ষণে মহা শক্তিশালী দেবী চামুণ্ডা জাগ্রত হন। সন্ধি পুজোর নৈবেদ্যই নবমীর পুজোয় দেবীকে নিবেদন করা শেষ নৈবেদ্য। তাই সন্ধি পুজোর আয়োজন সাড়ম্বরে করা হয়। ১০৮ টি পদ্ম, ১০৮ টি মাটির প্রদীপ সন্ধিপুজোর গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। নৈবেদ্য হিসেবে দেওয়া হয় গোটা চাল, জবা ফুল, শাড়ি, সাদা চাল, গয়না প্রভৃতি। অবশ্যই থাকে বেলপাতা। বলা হয়ে থাকে পদ্ম ভক্তির প্রতীক এবং প্রদীপ জ্বালানো জ্ঞানের প্রতীক। আর চণ্ড ও মুণ্ড হল যথাক্রমে মানুষের মনের প্রবৃত্তি এবং নিবৃত্তির প্রতীক। প্রবৃত্তির অর্থ ভোগ এবং নিবৃত্তির অর্থ ত্যাগ। মোক্ষ লাভের জন্য এই দুটিকেই খর্ব করার প্রয়োজন। পুরাণে আছে, অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে রাবণের দশমুণ্ড ছেদন করেছিলেন শ্রীরামচন্দ্র। সন্ধি পুজোর মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে আরও বলা হয়, সন্ধিকালের পুজোর ফল এক বছরের তুল্য। অর্থাৎ বর্ষব্যাপী দেবীর পুজোয় যে ফললাভ হয় সন্ধিপুজো একবার করলেই সেই ফল পাওয়া সম্ভব। সবশেষে সন্ধিপুজোয় দেবী মাহাত্ম্যের শ্লোকটি উল্লেখ করা যেতে পারে—‘ অষটমী নবমী সন্ধিকালোয়ং বৎসরাত্মক। তত্রৈব নবমী ভাগঃ কালঃ ঋকল্পাত্মকো মম।’
