আজ থেকে শুরু নবরাত্রি: নয়দিনে দেবীর ন’টি রূপের পুজো করা হয় কেন?
আজ থেকে শুরু নবরাত্রি। নবরাত্রি শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘নব’ এবং ‘রাত্রি’ থেকে। অর্থাৎ নয়টি রাত। এই নয় দিনে দেবী দুর্গার ন’টি রূপের পুজো করার প্রচলন রয়েছে। এই রূপগুলির সম্মিলিত নাম নবদুর্গা।
প্রথম দিন — শৈলপুত্রী
হিমালয়ের কন্যা পার্বতীর এই রূপ প্রকৃতি, স্থিরতা ও নতুন যাত্রার প্রতীক। নবরাত্রির সূচনা হয় তাঁর আরাধনার মধ্য দিয়ে।
দ্বিতীয় দিন — ব্রহ্মচারিণী
তপস্যা, সংযম ও অধ্যবসায়ের প্রতীক তিনি। শিবকে স্বামীরূপে লাভ করার জন্য পার্বতীর কঠোর তপস্যার কথা এই রূপের সঙ্গে যুক্ত।
তৃতীয় দিন — চন্দ্রঘণ্টা
শান্তি ও বীরত্বের যুগল প্রতীক। দেবীর এই রূপ অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শক্তির কথা মনে করিয়ে দেয়।
চতুর্থ দিন — কুষ্মাণ্ডা
প্রচলিত বিশ্বাসে, দেবীর হাসি থেকে বিশ্বসৃষ্টির সূচনা হয়েছিল। তাই তিনি সৃষ্টিশক্তি ও প্রাণের উৎসের প্রতীক।
পঞ্চম দিন — স্কন্দমাতা
দেবসেনাপতি কার্তিকের জননী। মাতৃত্ব, স্নেহ ও রক্ষাকারী শক্তি এই রূপের প্রধান তাৎপর্য।
ষষ্ঠ দিন — কাত্যায়নী
শক্তি, সাহস ও অসুরবিনাশের সঙ্গে যুক্ত দেবীর এই রূপ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের বার্তা এতে স্পষ্ট।
সপ্তম দিন — কালরাত্রি
দেবীর ভয়ংকর রূপ। অন্ধকার, ভয় ও অশুভ শক্তিকে পরাস্ত করার প্রতীক তিনি।
অষ্টম দিন — মহাগৌরী
পবিত্রতা, প্রশান্তি ও ক্ষমার প্রতীক। দেবীর এই রূপে সংযম ও অন্তরের শুদ্ধতার গুরুত্ব প্রকাশিত হয়।
নবম দিন — সিদ্ধিদাত্রী
সিদ্ধি, জ্ঞান ও পূর্ণতার প্রতীক। নবদুর্গার আরাধনার শেষ পর্যায়ে তাঁর পুজো করা হয়।
সতী থেকে পার্বতী: দেবীর পুনর্জন্মের কাহিনি
দেবী দুর্গার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পৌরাণিক পরিচয় রয়েছে সতী ও পার্বতীর আখ্যানে। প্রজাপতি দক্ষের কন্যা সতী শিবকে বিবাহ করেছিলেন। কিন্তু দক্ষ শিবকে পছন্দ করতেন না। একবার তিনি বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করলেও শিবকে আমন্ত্রণ জানাননি। পিতার যজ্ঞে উপস্থিত হয়ে সতী যখন স্বামীর অপমান সহ্য করতে পারেননি, তখন তিনি যোগাগ্নিতে দেহত্যাগ করেন। পরে হিমালয়রাজের গৃহে পার্বতী হিসেবে তাঁর পুনর্জন্ম হয়। কঠোর তপস্যার মধ্য দিয়ে তিনি আবার শিবকে স্বামীরূপে লাভ করেন। এই আখ্যানের মধ্যে মৃত্যু ও পুনর্জন্মের পাশাপাশি রয়েছে সংকল্প, আত্মমর্যাদা এবং অধ্যবসায়ের বার্তা। সতী থেকে পার্বতী—এই যাত্রা দেবীর শক্তিরই আরেকটি প্রকাশ।
নবরাত্রি ও বাঙালির দুর্গাপুজো: একই উৎসবের ভিন্ন রূপ
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নবরাত্রি পালনের ধরন আলাদা। গুজরাত ও পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন অংশে গরবা ও ডান্ডিয়া নাচ উৎসবের প্রধান আকর্ষণ। দক্ষিণ ভারতে পুতুল সাজিয়ে ‘গোলু’ পালনের রীতি রয়েছে। উত্তর ভারতে দশেরার সঙ্গে রাবণবধের আখ্যানও বিশেষভাবে যুক্ত।
বাংলায় অবশ্য দুর্গাপুজোর নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় রয়েছে। পঞ্চমী-ষষ্ঠীর প্রস্তুতি থেকে সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী এবং দশমীর বিসর্জন— দেবীকে ঘিরে বাঙালির আবেগ, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও সামাজিক মিলন এই উৎসবকে অনন্য করে তুলেছে। নবরাত্রির শেষ তিন দিন এবং বাংলার দুর্গাপুজোর প্রধান পুজোর দিনগুলির মধ্যে রয়েছে আচারগত যোগসূত্র, যদিও দু’টির পুজোপদ্ধতি এক নয়।
বাংলার দুর্গাপুজোয় দেবীকে দেখা হয় মহিষাসুরমর্দিনী রূপে। তাঁর সঙ্গে থাকেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। এই পারিবারিক প্রতিমার মধ্যে শক্তি, সম্পদ, বিদ্যা, সাহস এবং শুভবুদ্ধির এক সম্মিলিত রূপ ফুটে ওঠে।
নবরাত্রির আসল তাৎপর্য কোথায়?
নবরাত্রির ধর্মীয় তাৎপর্যকে কয়েকটি মূল ভাবনার মধ্যে ধরা যায়। প্রথমত, অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয়। মহিষাসুর কেবল পুরাণের এক অসুর নয়, প্রতীকী পাঠে সে মানুষের অহংকার, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অন্যায়েরও প্রতিরূপ হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, নারীশক্তির স্বীকৃতি। দেবীকে এখানে দুর্বল বা নির্ভরশীল হিসেবে দেখানো হয়নি। তিনি সৃষ্টিকর্ত্রী, পালনকর্ত্রী, জ্ঞানদাত্রী এবং প্রয়োজনে ধ্বংসের শক্তি। পুরাণের এই ধারণা নারীকে শক্তির স্বাধীন উৎস হিসেবে কল্পনা করে।
তৃতীয়ত, আত্মশুদ্ধি ও সংযম। উপবাস, প্রার্থনা, ধ্যান ও নিয়ম পালনের মধ্য দিয়ে ভক্তরা নিজেদের মনকে সংযত করার চেষ্টা করেন। এর উদ্দেশ্য শুধু বাহ্যিক আচার পালন নয়, নিজের দুর্বলতা ও প্রবৃত্তিগুলিকেও চিনতে শেখা।
চতুর্থত, সম্মিলিত শক্তির গুরুত্ব। দেবতাদের সম্মিলিত তেজ থেকে দুর্গার আবির্ভাবের কাহিনি মনে করিয়ে দেয়, বিচ্ছিন্ন শক্তি অনেক সময় ব্যর্থ হলেও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
শেষ কথা
নবরাত্রি তাই কেবল দেবীর আরাধনার নয়, নিজের ভিতরের শক্তিকে চিনে নেওয়ারও উৎসব। পুরাণের ভাষায় দেবী মহিষাসুরকে বধ করেন; আর প্রতীকী অর্থে এই যুদ্ধ প্রতিদিনের জীবনে অন্যায়, অহংকার, হিংসা ও অজ্ঞতার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াইয়ের কথা বলে।
নয় রাতের শেষে বিজয়া দশমী আসে বিজয়ের বার্তা নিয়ে। সেই বিজয় শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর পরাজয় নয়, নিজের ভিতরের অশুভকে জয় করার সংকল্পও হতে পারে।
