বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
টাইগার শ্রফের উপর হামলায় ধৃত আরও ৪ আজ বিজয়া দশমী, ঘাটে ঘাটে চলছে প্রতিমা নিরঞ্জন ভারতের সঙ্গে চুক্তি অন্যরকম, জানালেন ট্রাম্প দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে দশেরা

নায়ক অমিতাভ বনাম প্রবীণ অমিতাভ: একই মানুষের অভিনয়ের দু’টি ধারা

11 October, 2026 9:19 AM Sandipan Saha
শেয়ার করুন

আজ বলিউডের সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চনের জন্মদিন। তাঁর অভিনয় জীবনকে দু’টি ভাগে ভাগ করা যায়। একটি অ্যাংরি হিরো, অন্যটি  প্রবীণ চরিত্রাভিনেতা। কোন অভিনেতা বেশি শক্তিশালী! আলোচনা করেছেন দীপ্যমান দত্ত।

 

নায়ক অমিতাভ

অমিতাভ বচ্চনকে বুঝতে গেলে তাঁর জনপ্রিয়তার ইতিহাসের পাশাপাশি অভিনয়ের ইতিহাসটিও পড়তে হয়। কারণ, এই অভিনেতার জীবনে এমন একটি সময় ছিল, যখন তাঁর পর্দায় উপস্থিতি ছিল ছবির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। দর্শক অপেক্ষা করতেন তাঁর সংলাপের জন্য, তাঁর অ্যাংরি ইমেজের জন্য, তাঁর চোখের স্থির দৃষ্টির জন্য। আবার পরবর্তী সময়ে এমন কিছু ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন, যেখানে তাঁর কণ্ঠের গাম্ভীর্য বা তারকাসুলভ ব্যক্তিত্বের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে চরিত্রটির খুঁত, দুর্বলতা, অভ্যাস এবং মানসিক জটিলতা। নায়ক অমিতাভ আর চরিত্রাভিনেতা অমিতাভের মধ্যে পার্থক্য এখানেই।

১৯৭১ সালের ‘আনন্দ’ ছবিতে অমিতাভ বচ্চনকে দেখলে বোঝা যায়, তাঁর অভিনয়ের ভিত তৈরি হয়েছিল জনপ্রিয় নায়ক হয়ে ওঠার আগেই। রাজেশ খান্নার আনন্দ ছবির আবেগের কেন্দ্র হলেও অমিতাভের ডাঃ ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায় চরিত্রটি কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আনন্দের প্রাণোচ্ছলতা ও জীবনকে উদ্‌যাপন করার প্রবণতার বিপরীতে ভাস্কর একজন সংশয়ী, যুক্তিবাদী, কিছুটা রুক্ষ মানুষ। জীবনের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি আনন্দের সম্পূর্ণ বিপরীত। অমিতাভ এখানে কণ্ঠের জোর বা শরীরী ভাষার সাহায্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চাননি। বরং চরিত্রটির ভিতরে জমে থাকা অসহায়তা, বিরক্তি ও মমতাকে প্রকাশ করেছেন সংযমের সঙ্গে। আনন্দের মৃত্যুর সম্ভাবনা তাঁকে যতটা বিচলিত করে, তার চেয়েও বেশি বিচলিত করে জীবন সম্পর্কে তাঁর নিজের ধারণার ভেঙে পড়া। অমিতাভের অভিনয়ে এই দ্বন্দ্বটি গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৭৩ সালের ‘জঞ্জির’ অমিতাভের অভিনয়-জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। বিজয় খান্না চরিত্রের মধ্যে দিয়ে তিনি হিন্দি ছবির নায়কের পরিচিত ব্যাকরণ বদলে দেন। এত দিন নায়কের জনপ্রিয়তার বড় উপাদান ছিল রোম্যান্স, গান, নাচ এবং নায়িকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রেমের কাহিনি। বিজয় সেই পরিচিত ছক থেকে অনেকটাই আলাদা। তার মধ্যে আছে শৈশবের ক্ষত, সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্রোধ এবং এক ধরনের একাকিত্ব। অমিতাভের উচ্চতা, ভারী কণ্ঠস্বর, স্থির দৃষ্টি এবং সংলাপ বলার বিশেষ ভঙ্গি চরিত্রটির সঙ্গে মিশে যায়। কিন্তু তাঁর অভিনয়ের আসল শক্তি শুধু রাগ দেখানোর মধ্যে ছিল না। বরং রাগকে সব সময় প্রকাশ না করে ধরে রাখার মধ্যেও ছিল। বিজয়কে দেখে মনে হয়, সে যেন দীর্ঘদিন ধরে নিজের ভিতরে একটা বিস্ফোরণ আটকে রেখেছে। এই অভিনয়ই পরবর্তী সময়ে অমিতাভকে ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’ পরিচিতির দিকে নিয়ে যায়।

১৯৭৫ সালের ‘দিওয়ার’ সেই ক্রুদ্ধ নায়ককে আরও জটিল করে তোলে। বিজয় বর্মা অপরাধজগতের সঙ্গে যুক্ত হলেও তাকে নিছক খলনায়ক হিসেবে দেখা যায় না। তার জীবনের পেছনে রয়েছে দারিদ্র্য, অপমান, বাবার সামাজিক কলঙ্ক এবং মায়ের প্রতি গভীর টান। অমিতাভের অভিনয়ের বিশেষত্ব, তিনি বিজয়ের অপরাধকে ন্যায্য বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন না, বরং দর্শককে বোঝান, কীভাবে একটি মানুষের ক্ষোভ, আত্মসম্মান ও বঞ্চনা তাকে এমন পথে নিয়ে যেতে পারে। ‘মেরে পাস মা হ্যায়’ সংলাপটি জনপ্রিয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু বিজয়ের অভিনয়কে শুধু এই সংলাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ করলে ভুল হবে। ভাই রবির সঙ্গে সংঘাতের দৃশ্য, মায়ের সামনে তার অসহায়তা এবং নিজের তৈরি জগতের মধ্যে আটকে পড়ার মুহূর্তগুলিতে অমিতাভের অভিনয় অনেক বেশি সূক্ষ্ম। তাঁর চোখে আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি এক ধরনের পরাজয়ের আভাসও থাকে। এখানে নায়কোচিত ব্যক্তিত্ব চরিত্রের দুর্বলতাকে ঢেকে দেয়নি, বরং সেই দুর্বলতাই বিজয়কে ট্র্যাজিক করে তুলেছে।

একই বছরে মুক্তি পাওয়া ‘শোলে’ অমিতাভের অভিনয়ের অন্য একটি দিক সামনে আনে। জয় চরিত্রটি বীরের মতো বহির্মুখী নয়। ধর্মেন্দ্রর প্রাণবন্ত, কথাবার্তায় ভরপুর বীরের পাশে অমিতাভের জয় অনেক বেশি সংযত, পর্যবেক্ষণশীল এবং নীরব। দুজনের বন্ধুত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হয়েছে এই বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে। জয়ের রসবোধ খুব সূক্ষ্ম। সে সব সময় কৌতুক করে না, কিন্তু তার মুখের সামান্য পরিবর্তনেও হাস্যরস তৈরি হয়। আবার রাধার সঙ্গে তার সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই নীরবতাই হয়ে ওঠে আবেগ প্রকাশের মাধ্যম। নায়ক অমিতাভের এই সংযত রূপটি তাঁর পরবর্তী চরিত্রাভিনয়ের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র তৈরি করে।

‘অমর আকবর অ্যান্টনি’ ছবিতে আবার সম্পূর্ণ অন্য অমিতাভকে পাওয়া যায়। অ্যান্টনি গনজালভেস চরিত্রে তিনি গম্ভীর নায়কের পরিচিত ভাবমূর্তিকে ভেঙে ফেলেছেন। তাঁর শরীরী ভাষা, কথার ছন্দ, মুখের অভিব্যক্তি এবং ইচ্ছাকৃত নাটকীয়তা— সব কিছুতেই এখানে কমেডির উপাদান। আয়নার সামনে নিজের ক্ষত নিজেই সারানোর দৃশ্যটি শুধু হাস্যরসের জন্য স্মরণীয় নয়, এটি দেখায় নিজের ব্যক্তিত্বকে কতটা সচেতনভাবে অতিরঞ্জিত করে হাসির উপকরণ বানাতে পারেন অমিতাভ। এই অভিনয় প্রমাণ করে, তাঁর প্রতিভা শুধু ক্রোধ, যন্ত্রণা বা ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

১৯৮২ সালের ‘শক্তি’ ছবিতে দিলীপ কুমারের মতো শক্তিশালী অভিনেতার বিপরীতে অমিতাভের অভিনয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিজয় কুমার এমন একজন ছেলে, যে বাবার নীতিবোধ ও কর্তব্যপরায়ণতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। কিন্তু তার বিদ্রোহের মধ্যে শুধু জেদ নেই, আছে বাবার কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও। অমিতাভের অভিনয়ে এই দ্বন্দ্বটি বারবার ফিরে আসে। সে বাবার বিরুদ্ধে কথা বলে, অথচ বাবার কাছেই নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি চায়। দিলীপ কুমারের সংযত ও কর্তৃত্বপূর্ণ অভিনয়ের পাশে অমিতাভের আবেগ অনেক সময় বেশি তীব্র। কিন্তু এই তীব্রতা চরিত্রের স্বভাবের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

 

চরিত্রাভিনেতা অমিতাভ

নব্বইয়ের দশক ও তার পরবর্তী সময়ে অমিতাভের অভিনয় জীবনে যে পরিবর্তন আসে, তার পিছনে ছিল বয়স, চলচ্চিত্রশিল্পের বদল এবং তাঁর তারকাসত্তাকে নতুনভাবে ব্যবহার করার প্রয়োজন। এক সময়ের অ্যাকশন-নায়ক ধীরে ধীরে এমন চরিত্রে অভিনয় করতে শুরু করেন, যাদের ক্ষমতা শরীরের জোরে নয়, অভিজ্ঞতা, কণ্ঠস্বর, বুদ্ধি কিংবা সামাজিক অবস্থানের মধ্যে নিহিত। তবে এই পরিবর্তনকে শুধু বয়সের অনিবার্য ফল বলা যাবে না। চরিত্রের খুঁটিনাটি নির্মাণের প্রতি তাঁর আগ্রহও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

২০০৫ সালের ‘ব্ল্যাক’ ছবিতে দেবরাজ সহায় চরিত্রে অমিতাভের অভিনয় তাঁর এই পরিবর্তনের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। অন্ধ ও বধির এক তরুণীকে শিক্ষার মাধ্যমে নিজের জগৎ খুঁজে পেতে সাহায্য করেন দেবরাজ। কিন্তু তিনি কোনও আদর্শ শিক্ষক নন। তাঁর মধ্যে আছে কঠোরতা, অস্থিরতা, মদ্যপানের সমস্যা এবং নিজের পদ্ধতির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। অমিতাভ চরিত্রটিকে নিখুঁত মহৎ মানুষ হিসেবে নির্মাণ করেননি। তাঁর কণ্ঠের ওঠানামা, শরীরের অস্থিরতা এবং শিক্ষাদানের সময় কঠোর আচরণের মধ্য দিয়ে দেবরাজের ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পেয়েছে। আবার স্মৃতিশক্তি হারানোর পর তাঁর অসহায়তা চরিত্রটিকে অন্য মাত্রা দেয়। পাশাপাশি একজন মানুষের ক্রমশ ভেঙে পড়ার বেদনাও প্রকাশ পেয়েছে।

২০০৯ সালের ‘পা’ ছবিতে অমিতাভ নিজের অভিনয় ক্ষমতার আরও একটি কঠিন পরীক্ষা নেন। বারো বছরের অরো চরিত্রে অভিনয় করার জন্য তাঁকে এমন এক শারীরিক রূপ গ্রহণ করতে হয়েছিল, যা তাঁর বাস্তব বয়স ও পরিচিত ব্যক্তিত্বের সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রস্থেটিক মেকআপ তাঁকে শিশুর মতো দেখতে সাহায্য করেছে, কিন্তু চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার কাজটি করেছে তাঁর অভিনয়। অরোর কথা বলার ধরন, শিশুসুলভ দুষ্টুমি, কৌতূহল, আবেগের দ্রুত পরিবর্তন এবং নিজের অসুস্থতা সম্পর্কে সচেতনতার মধ্যে অমিতাভ একটি স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব তৈরি করেছেন। এখানে অভিনয়ের ঝুঁকি ছিল, চরিত্রটি যেন কেবল মেকআপের প্রদর্শনী হয়ে না ওঠে। অমিতাভ সেই বিপদ অনেকটাই সামলেছেন। অরোকে তিনি শুধু অসুস্থতার প্রতীক করেননি, একটি স্বাভাবিক শিশুর আনন্দ, অভিমান ও আত্মসম্মানও দিয়েছেন।

তবে চরিত্রাভিনেতা অমিতাভের সবচেয়ে স্বাভাবিক এবং পরিণত কাজগুলির একটি খুঁজতে গেলে ২০১৫ সালের ‘পিকু’ ছবির কথা আসবেই। ভাস্কর বন্দ্যোপাধ্যায় একজন খিটখিটে, স্বাস্থ্য নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন, আত্মকেন্দ্রিক বৃদ্ধ। তাঁর জীবনের ছোটখাটো শারীরিক সমস্যা, বিশেষ করে কোষ্ঠকাঠিন্য নিয়ে অস্বাভাবিক ব্যস্ততা, ছবির হাস্যরসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কিন্তু অমিতাভের অভিনয় এই কৌতুকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে একজন মানুষ নিজের শরীর, অভ্যাস ও নিয়মের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় থেকে ক্রমশ অসহিষ্ণু হয়ে উঠতে পারেন। অমিতাভ চরিত্রের দ্বন্দ্বকে কোনও বড় আবেগঘন সংলাপের সাহায্যে প্রকাশ করেননি। ছোট ছোট আচরণ, কথার ভঙ্গি, মুখের অভিব্যক্তি এবং অপ্রয়োজনীয় তর্কের মধ্য দিয়ে চরিত্রটিকে জীবন্ত করেছেন।

২০১৬ সালের ‘পিঙ্ক’ ছবিতে আবার অমিতাভের পুরনো নায়কসত্তা ফিরে আসে, তবে নতুন প্রেক্ষাপটে। অবসরপ্রাপ্ত আইনজীবী দীপক সেহগল যৌন হয়রানির শিকার তিন তরুণীর পক্ষে আদালতে দাঁড়ান। চরিত্রটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং নিজের কর্তৃত্ব দিয়ে প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানায়। এই বৈশিষ্ট্যগুলি অমিতাভের পরিচিত পর্দা ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মেলে। আদালতের দৃশ্যে তাঁর কণ্ঠস্বর, প্রশ্ন করার ভঙ্গি এবং প্রতিপক্ষের যুক্তির অসংগতি ধরার ক্ষমতা দৃশ্যগুলিকে শক্তিশালী করে।

তাই নায়ক অমিতাভ বড়, না চরিত্রাভিনেতা অমিতাভ —এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। নায়ক হিসেবে তিনি হিন্দি ছবির দর্শকের কল্পনাকে নতুন রূপ দিয়েছিলেন। চরিত্রাভিনেতা হিসেবে তিনি সেই কল্পনার সীমানা ভেঙেছেন। তাঁর নায়কসত্তা দর্শককে মুগ্ধ করে, আর তাঁর চরিত্রাভিনয় দর্শককে মানুষ চিনতে সাহায্য করে। প্রথমটি তাঁকে কিংবদন্তি করেছে, দ্বিতীয়টি সেই কিংবদন্তিকে দীর্ঘ অভিনয়জীবনের পরেও প্রাসঙ্গিক রেখেছে।

প্রতিবেদন

Sandipan Saha