বিজয়ার গানে মেয়ের বিদায়বেলার কান্না, শাক্ত পদাবলির এক অনন্ত সাহিত্যধারা

লিখেছেন সন্দীপন বিশ্বাস
শারদীয় দুর্গোৎসবের নবমী যেন আনন্দের বুকের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক বিষাদের নাম। চারদিকে ঢাকের বাদ্যি, ধূপের গন্ধ, আরাধনার শেষ লগ্নের ব্যস্ততা—তবু কোথাও একটা মনখারাপের সুর ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মনে হয়, সময় বড় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। যে মেয়ে চার দিন আগে বাপের বাড়িতে এসেছিল, সে আবার ফিরে যাবে স্বামীর ঘরে। কৈলাসে ফিরে যাবেন উমা। মণ্ডপে মণ্ডপে জ্বলতে থাকা আলোর মধ্যেও তাই নবমীর আকাশে যেন জমে ওঠে বিদায়ের মেঘ।
এই বিষাদ শুধু বাঙালির ধর্মীয় অনুভূতির বিষয় নয়। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তা এক অসামান্য কাব্যিক ঐতিহ্যের জন্ম দিয়েছে। মেয়ের বিদায়ের মধ্যে দিয়ে কবিরা খুঁজে পেয়েছেন সংসারের বিচ্ছেদ, মায়ের বুকের হাহাকার, সময়ের নিষ্ঠুরতা এবং মানুষের চিরন্তন হারানোর বেদনা। শাক্ত পদাবলির আগমনী ও বিজয়ার গান সেই বেদনাকেই দিয়েছে ভাষা।
বাংলার দুর্গাপুজোর কল্পনায় একটি বিশেষত্ব আছে। এখানে মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা যেমন অসুরবিনাশিনী, তেমনই তিনি হিমালয় ও মেনকার আদরের কন্যা উমা। দেবীকে ঘিরে এই পারিবারিক কল্পনাই বাঙালির শাক্ত সাহিত্যকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। পুরাণের মহাশক্তি ঘরের মেয়ে হয়ে ওঠেন। তাঁর আগমন আনন্দের, আর তাঁর বিদায় অসহনীয় বেদনার।
এই আবেগের কেন্দ্রে রয়েছেন মা মেনকা। মেয়েকে দেখতে না পাওয়ার দীর্ঘ প্রতীক্ষা, মেয়ের ফিরে আসার আনন্দ, কয়েকটি দিনের জন্য সংসার ভরে ওঠা, তারপর আবার বিচ্ছেদের আশঙ্কা—সব মিলিয়ে মেনকা যেন বাংলার ঘরে ঘরে থাকা এক চিরপরিচিত মা। অন্যদিকে, উমা সেই মেয়ে, যে শ্বশুরবাড়ির সংসার ছেড়ে কয়েক দিনের জন্য ফিরে আসে পিতৃগৃহে। দেবী ও মানবীর এই মেলবন্ধনেই শাক্ত পদাবলি ধর্মীয় আখ্যানের সীমা ছাড়িয়ে হয়ে ওঠে বাঙালির পারিবারিক জীবনের কাব্য।
এই ধারার নাম আগমনী-বিজয়ার গান। আগমনীতে উমার ঘরে ফেরার আনন্দ, আর বিজয়ায় তাঁর চলে যাওয়ার বেদনা। কিন্তু নবমী এই দুই অনুভূতির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে। বিদায় এখনও ঘটেনি, অথচ তার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। আনন্দের মধ্যেই বিচ্ছেদের পূর্বাভাস। তাই নবমীর বিষাদ অন্য রকম—এ এক আসন্ন শূন্যতার বেদনা।
শাক্ত পদাবলির এই আবহের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহুল পরিচিত পঙ্ক্তি—‘যেও না রজনী, আজি লয়ে তারাদলে’। মধুসূদন দত্তের এই পঙ্ক্তির মধ্যেই যেন ধরা পড়ে নবমীর সমস্ত মনখারাপ।
রজনীকে চলে যেতে বারণ করা হচ্ছে। কিন্তু কেন? কারণ রাত পেরোলেই এগিয়ে আসবে বিদায়ের মুহূর্ত। যে সময়টুকু এখনও মায়ের সঙ্গে কাটানো যায়, যে কয়েকটি মুহূর্তে উমাকে কাছে পাওয়া সম্ভব, সেই সময়টুকু যেন কোনওভাবেই ফুরিয়ে না যায়। তাই কবির আকুতি, রাত তুমি যেয়ো না, তোমার তারাদের দল নিয়ে আরও কিছুক্ষণ থেকে যাও।
এখানে রজনী শুধু প্রকৃতির একটি সময়পর্ব নয়। সে যেন বিচ্ছেদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক নীরব সহায়। রাতের অবসান মানে ভোরের আগমন, আর সেই ভোরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিদায়ের অনিবার্যতা। কবি তাই প্রকৃতির কাছেই আবেদন জানাচ্ছেন, সময়কে একটু থামিয়ে রাখতে। একই আকুতি ধরা পড়েছে কমলাকান্তের গানেও। ‘ওরে নবমী নিশি, না হইও রে অবসান।’ তাঁর আর একটি গানে ফুটে উঠেছে এই যন্ত্রণার কথা। ‘আমার গৌরীরে লয়ে যায়, হর আসিয়ে। / কি কর হে গিরিবর! রঙ্গ দেখ বসিয়ে॥’
এই আকুতির মধ্যে বাঙালি সাহিত্যের এক গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। মানুষ জানে, সময়কে আটকে রাখা যায় না। তবু প্রিয়জনের চলে যাওয়ার মুহূর্তে সে সময়ের কাছেই হাত পাতে। আরও কিছুক্ষণ, আর একটু সময়—এই চিরকালীন আকাঙ্ক্ষাই বিচ্ছেদের গানকে যুগে যুগে নতুন করে বাঁচিয়ে রেখেছে।
বাংলার শাক্ত পদাবলির আলোচনায় রামপ্রসাদ সেনের নাম অনিবার্য। অষ্টাদশ শতকের এই সাধক-কবি শ্যামাসংগীতের পাশাপাশি মাতৃভাবনাকে বাংলা গানের এক গভীর সাহিত্যিক ভাষা দিয়েছিলেন। তাঁর গানে কালী কখনও বিশ্বজননী, কখনও অভিমানী মা, আবার কখনও এমন এক আপনজন, যাঁর কাছে সন্তান নির্দ্বিধায় নিজের দুঃখ, অভিযোগ ও অভিমান জানাতে পারে।
এই মাতৃভাবনার সঙ্গে আগমনী-বিজয়ার আবেগের একটি গভীর যোগ রয়েছে। ঈশ্বর এখানে দূরের কোনও অধরা সত্তা নন। তিনি সংসারেরই একজন। তাঁকে ভালোবাসা যায়, তাঁর উপর অভিমান করা যায়, তাঁর কাছে অভিযোগ জানানো যায়। দেবীর সঙ্গে মানুষের এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই শাক্ত গানের সাহিত্যিক শক্তি।
রামপ্রসাদের পর কমলাকান্ত ভট্টাচার্যের গানেও মাতৃভাবনা ও মানবিক আবেগ বিশেষ মাত্রা পেয়েছে। শাক্ত কবিদের কাছে ভক্তি কেবল স্তব বা বন্দনা নয়; ভক্তি মানে সম্পর্ক। আর সম্পর্কের মধ্যে যেমন ভালোবাসা আছে, তেমনই আছে অভিমান, অপেক্ষা ও বিচ্ছেদ।
আগমনী-বিজয়ার গানে এই মানবিক অনুভূতিগুলি বিশেষভাবে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মেনকার কাছে উমা দেবী হলেও তিনি সর্বাগ্রে মেয়ে। তাই তাঁর বিদায়ের বেদনা কোনও দার্শনিক তত্ত্বের মধ্যে আটকে থাকে না। তা হয়ে ওঠে মায়ের চোখের জল, বুকের ভিতরের হাহাকার।
শাক্ত পদাবলির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, এর মধ্য দিয়ে বাংলার তৎকালীন পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের কিছু ছবি ধরা পড়ে। অল্প বয়সে মেয়ের বিবাহ, স্বামীর সংসারে তার বসবাস, পিতৃগৃহে ফিরে আসার সীমিত সুযোগ এবং মেয়েকে ছেড়ে থাকার যন্ত্রণা—এসব অভিজ্ঞতার সঙ্গে বাংলার মানুষ পরিচিত ছিল।
পুরাণের উমাকে এই সামাজিক অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পনা করা হয়েছিল। ফলে দেবীর আগমন শুধু কৈলাস থেকে মর্ত্যে আসার ঘটনা নয়; তা যেন দূরে বিয়ে দেওয়া মেয়ের বাপের বাড়ি ফিরে আসা। আবার তাঁর প্রস্থানও কেবল দেবলোকের যাত্রা নয়, পরিচিত সংসার থেকে মেয়ের চলে যাওয়া।
এখানেই এই গানগুলির অসামান্য সাহিত্যিক সার্থকতা। কবিরা সরাসরি সামাজিক ইতিহাস লেখেননি, কিন্তু তাঁদের কাব্যে সমাজের অনুভূতি, পারিবারিক সম্পর্ক ও নারীর জীবনযাপনের অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয়েছে। দেবীর কাহিনি মানুষের কাহিনিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
শাক্ত পদাবলির এই বিচ্ছেদবোধ বাংলা সাহিত্যের বৃহত্তর ধারার সঙ্গেও সম্পর্কিত। রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে চলে যাওয়া, হারিয়ে ফেলা, অপেক্ষা এবং অনিত্যতার অনুভূতি। যদিও তাঁর সাহিত্যিক জগৎ শাক্ত পদাবলির ধারার অনুরূপ নয়, তবু উভয়ের মধ্যে একটি মৌলিক সাদৃশ্য রয়েছে—যা চলে যায়, তার মূল্য আমরা গভীরভাবে অনুভব করি।
নবমীর বিষাদও ঠিক এইখানে। উমা এখনও মণ্ডপে রয়েছেন, পুজোর আনুষ্ঠানিকতা এখনও শেষ হয়নি, কিন্তু মানুষ জানে, এই আনন্দ স্থায়ী নয়। যে মুহূর্তে আমরা আনন্দ করছি, সেই মুহূর্তই ধীরে ধীরে স্মৃতিতে পরিণত হচ্ছে।
বাংলার লোকসংগীত, শ্যামাসংগীত, আগমনী-বিজয়ার পদ এবং পরবর্তী কালের আধুনিক গান—বিভিন্ন ধারায় এই অনুভূতির নানা প্রকাশ দেখা যায়। ধর্মীয় বিশ্বাসের সীমা অতিক্রম করে তা হয়ে ওঠে মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। পুজোর সময় বাড়ি ফিরে আসা সন্তান, দূরে থাকা মেয়ে, হারিয়ে যাওয়া শৈশব কিংবা কোনও প্রিয়জনের স্মৃতি—সব কিছুর সঙ্গেই নবমীর বিষাদ মিলেমিশে যেতে পারে।
নবমীর বেদনা অবশ্য চূড়ান্ত বিচ্ছেদের বেদনা নয়। বাঙালি জানে, উমা আবার আসবেন। পরের বছর আবার কৈলাস থেকে মর্ত্যে নেমে আসবে আনন্দের বার্তা। এই বিশ্বাসই আগমনী-বিজয়ার গানকে এক অদ্ভুত দ্বৈত অনুভূতি দিয়েছে। এখানে কান্না আছে, কিন্তু হতাশা নেই; বিচ্ছেদ আছে, কিন্তু সম্পর্কের অবসান নেই।
এই কারণেই নবমী বাঙালির কাছে কেবল পুজোর একটি তিথি নয়। এটি আনন্দের শেষ প্রহরে দাঁড়িয়ে ফিরে দেখার দিন। মণ্ডপে দেবীর মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, আর তো ক’টা ঘণ্টা। ঢাকের শব্দের মধ্যেও কেমন যেন একটা শূন্যতা তৈরি হয়। বিসর্জনের আগেই মন বিদায়ের জন্য প্রস্তুত হতে থাকে।
শাক্ত পদাবলির কবিরা সেই অনুভূতিকেই শব্দ দিয়েছিলেন। তাঁরা জানতেন, দেবীকে বন্দনা করা যায়, তাঁর কাছে প্রার্থনা করা যায়, কিন্তু সময়কে থামানো যায় না। তাই তাঁদের গান হয়ে উঠেছে সময়ের কাছে মানুষের এক চিরন্তন আবেদন—আর একটু থাকো, আর একটু কাছে থাকো।
নবমীর সন্ধ্যায় সেই আবেদন আজও বাঙালির মনে ফিরে আসে। দেবী মণ্ডপে রয়েছেন, প্রদীপ জ্বলছে, ধূপের ধোঁয়া উঠছে, ঢাক বাজছে। অথচ মনের ভিতরে কেউ যেন নিঃশব্দে বলে উঠছে—রজনী, যেয়ো না। এই আনন্দটুকু, এই কাছের মানুষটুকু, এই মায়ের মুখটুকু আরও কিছুক্ষণ থাকুক।
কারণ বাঙালি জানে, বিসর্জন শুধু প্রতিমার হয় না। বিসর্জন হয় কয়েকটি দিনের আনন্দের, এক টুকরো শৈশবের, ফিরে পাওয়া আপনজনের সান্নিধ্যের। আর সেই বিসর্জনের বেদনাকেই বাংলা সাহিত্য চিরকাল ধরে রেখেছে আগমনী-বিজয়ার গানে—যেখানে দেবী হয়ে ওঠেন ঘরের মেয়ে, আর ভক্তি হয়ে ওঠে মায়ের চোখের জল।
