বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
বেলুড় মঠে মহাসাড়ম্বরে হয়ে গেল কুমারী পুজো পাঁজরে হাড় ভেঙে ফুসফুসে, চোরবাগানের ময়নাতদন্তের ভয়াবহ রিপোর্ট টাইগার শ্রফের উপর গুলি, হামলা, গ্রেপ্তার ৩ টাইগার শ্রফকে হামলায় দায়স্বীকার বিষ্ণোই গ্যাংয়ের

থিম পুজোর শুরু ও অগ্রগতি: নেপথ্যে আর্ট কলেজের শিল্পীদের সৃজনশীল বিপ্লব

19 October, 2026 11:19 AM Sandipan Saha
শেয়ার করুন

লিখেছেন শীর্ষেন্দু সমাদ্দার

একটা সময় ছিল, দুর্গাপুজো মানেই সাবেকি মণ্ডপ, প্রতিমার চিরাচরিত রূপ আর পরিচিত সাজসজ্জা। পুজোর আকর্ষণ ছিল মূলত দেবীপ্রতিমার ঐতিহ্য, পুজোর আচার-অনুষ্ঠান এবং পাড়ার উৎসবকে ঘিরে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে দুর্গাপুজোর ভাষা। মণ্ডপ হয়ে উঠেছে শিল্পের ক্যানভাস, প্রতিমা পেয়েছে নতুন আঙ্গিক, আর পুজো উদ্যোক্তাদের ভাবনায় জায়গা করে নিয়েছে থিম। এই পরিবর্তনের পিছনে বড় ভূমিকা রয়েছে কলকাতার আর্ট কলেজের ছাত্রছাত্রীদের এবং শিল্পশিক্ষায় শিক্ষিত একদল সৃজনশীল মানুষের।

শিল্পকলার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, লোকশিল্পের ঐতিহ্য, আধুনিক শিল্পভাবনা এবং নতুন উপকরণের ব্যবহারে দুর্গাপুজো ক্রমশ হয়ে উঠেছে এক স্বতন্ত্র শিল্পমাধ্যম। মণ্ডপের বাঁশ, কাঠ, মাটি, কাপড়, ধাতু কিংবা পরিত্যক্ত সামগ্রী—সব কিছুই শিল্পীদের হাতে পেয়েছে নতুন অর্থ। কোথাও উঠে এসেছে বাংলার গ্রামজীবন, কোথাও ইতিহাস ও পুরাণ, কোথাও পরিবেশের সংকট, আবার কোথাও ফুটে উঠেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের চেনা অথচ উপেক্ষিত ছবি। দর্শক শুধু প্রতিমা দেখতে আসেন না, তাঁরা আসেন শিল্পীর ভাবনা দর্শন করতে, মণ্ডপের প্রতিটি কোণে লুকিয়ে থাকা গল্প আবিষ্কার করতে।

কিন্তু কীভাবে শুরু হল থিমের পুজো? এক কথায় অবশ্য এর উত্তর পাওয়া যাবে না। ঠিকভাবে বলতে গেলে থিমপুজোর ভাবনাটা শুরু হয়েছে প্রতিমা শিল্পের আঁতুড়ঘর কুমোরটুলি থেকেই। তখন প্রতিমার সাবেকি ভাবনা ছেড়ে একটু অন্য রকমের প্রতিমা গড়লেন গোরাচাঁদ পাল। সেটা সাতের দশক। পাহাড়ের এক কোণে দুর্গা, অন্য কোণে মহিষাসুর। এইভাবে একটু একটু বদল হতে থাকে। তখন বলা হতো আর্টের ঠাকুর। সাতের দশকের শেষ দিকে বাবুবাগানের প্রতিমা নির্মাণ করতেন শিল্পী মীরা মুখোপাধ্যায়। তবে পুরোপুরি বিষয়টা দ্রুত বদলে গেল এক রঙের কোম্পানির উদ্যোগে। ১৯৮৫ সাল থেকে  চালু হওয়া এই পুরস্কার বদলে দিল কলকাতার সর্বজনীন পুজোকে। সেই পুরস্কার পাওয়ার বাসনায় নতুনত্বের খোঁজে নামল পুজো কমিটিগুলো। শুরু হল ভিড় টানার প্রতিযোগিতা। আরও কিছু পরে সেই নতুন ধারায় এসে যোগ দিলেন আর্ট কলেজ থেকে পাস করা কিছু ছাত্র।

এই নতুন ধারার অন্যতম পরিচিত নাম সনাতন দিন্দা। প্রতিমা নির্মাণে তাঁর স্বতন্ত্র শিল্পভাষা, শারীরিক গঠনের নাটকীয়তা এবং দেবীমূর্তির অভিব্যক্তি দুর্গাপুজোর শিল্পচর্চায় আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছে। তাঁর কাজ দেখিয়েছে, দেবীপ্রতিমা শুধু পুজোর উপকরণ নয়, তা হতে পারে শিল্পীর নিজস্ব দর্শন প্রকাশের মাধ্যমও।

একইভাবে ভবতোষ সুতার-এর মতো শিল্পী মণ্ডপসজ্জা ও প্রতিমার পরিকল্পনায় শিল্পবোধ, কারিগরি দক্ষতা এবং কল্পনার মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। গৌরাঙ্গ কুইল্যা-র মতো শিল্পীরাও থিম পুজোর পরিসরে নিজেদের কাজের মাধ্যমে নতুন ভাবনার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁদের পাশাপাশি কলকাতা ও আশপাশের বহু শিল্পী, ভাস্কর, স্থপতি, চিত্রকর এবং শিল্পনির্দেশক দুর্গাপুজোকে নিয়ে গিয়েছেন এক নতুন উচ্চতায়। এছাড়া যাঁদের নাম করতে হয়, তাঁরা হলেন বন্দন রাহা, প্রদীপ দাস, সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রশান্ত পাল প্রমুখ। ইদানীং এই ক্ষেত্রে অনেক শিল্পী এসেছেন,  যাঁরা আকর্ষণীয় প্রচুর কাজ করছেন।

তবে থিম পুজোর ইতিহাস কোনও একক শিল্পী বা একটি প্রতিষ্ঠানের অবদান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বিভিন্ন সময়ে পুজো কমিটির উদ্যোগ, শিল্পীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কুমোরটুলির প্রতিমা শিল্পীদের দক্ষতা এবং মণ্ডপ নির্মাণের কারিগরদের শ্রম, আলোকশিল্পীদের কাজ মিলেই তৈরি করেছে এই পরিবর্তনের ইতিহাস। দুর্গাপুজো একটা সম্মিলিত আর্টওয়ার্ক। আর্ট কলেজের শিক্ষিত শিল্পীদের আগমন সেই ধারাকে দিয়েছে নতুন গতি, নতুন নন্দনতত্ত্ব এবং বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছনোর সুযোগ।

এর ফলে দুর্গাপুজো আর কেবল ধর্মীয় উৎসবের পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তা হয়ে উঠেছে বাংলার সমকালীন শিল্পচর্চার এক বিশাল জনপরিসর। যে শিল্প দেখতে একসময় মানুষকে যেতে হতো গ্যালারিতে, সেই শিল্পই আজ নেমে এসেছে রাস্তার মোড়ে, পাড়ার মাঠে, সর্বজনীন মণ্ডপে। শিল্প আর দর্শকের মধ্যে দূরত্ব কমেছে। শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাধারণ মানুষের উৎসব, আবেগ এবং নাগরিক অভিজ্ঞতা।

কিন্তু এই পরিবর্তনের সঙ্গে কিছু প্রশ্নও উঠে এসেছে। থিমের প্রতিযোগিতায় কোথাও কি শিল্পের চেয়ে জাঁকজমক বড় হয়ে উঠছে? বিপুল বাজেট, পুরস্কারের দৌড় এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের আকাঙ্ক্ষা কি শিল্পীর মূল ভাবনাকে কখনও আড়াল করে দিচ্ছে? আবার অন্যদিকে, এই বিপুল কর্মযজ্ঞের ফলে বহু শিল্পী ও কারিগরের কাজের সুযোগও তৈরি হয়েছে। তাই থিম পুজোকে বিচার করতে গেলে তার শিল্পমূল্য, সামাজিক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা—সব দিকই দেখতে হবে।

দুর্গাপুজোর এই বিবর্তনের গল্প আসলে কয়েক প্রজন্মের শিল্পীদের গল্প। তাঁদের হাত ধরে মণ্ডপ পেয়েছে নতুন ভাষা, প্রতিমা পেয়েছে নতুন ব্যঞ্জনা, আর বাঙালির উৎসব পেয়েছে এক অনন্য শিল্পপরিচয়। দেবী একই থেকেছেন, বদলেছে তাঁকে উপস্থাপনের ভাষা। সেই ভাবনা থেকেই দুর্গোৎসব এখন বাংলার অন্যতম বৃহৎ মুক্ত শিল্পমঞ্চ।

 

প্রতিবেদন

Sandipan Saha