হুদুড় দুর্গা: পরাজিত পূর্বপুরুষকে খুঁজে চলেছে এক জনগোষ্ঠী
পলাশ বরণ মাইতি
শরতের আকাশে যখন কাশফুল দোলে, ঢাকের আওয়াজে যখন মেতে ওঠে বাংলা, যখন মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দুর্গার অসুরবধের দৃশ্য দেখতে ভিড় করেন মানুষ, তখন পশ্চিমবঙ্গেরই কিছু আদিবাসী গ্রামে ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা। বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম ও পশ্চিম মেদিনীপুরের কয়েকটি জনজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে দুর্গাপুজোর দিনগুলি শুধু উৎসবের সময় নয়। কোথাও কোথাও তা শোক, স্মরণ এবং হারিয়ে যাওয়া এক পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সময়। এই প্রথার নাম হুদুড় দুর্গা।
যে মহিষাসুরকে প্রচলিত পুরাণে দেবী দুর্গার হাতে নিহত অসুররাজ হিসেবে দেখা হয়, খেরওয়াল সাঁওতাল-সহ কয়েকটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর লোকবিশ্বাসে তিনিই এক পরাক্রমী রাজা, তাঁদের পূর্বপুরুষ এবং রক্ষাকর্তা। তাঁদের কাছে তিনি হুদুড় দুর্গা। তাই যে বধকে মূলধারার দুর্গাপুজো অশুভ শক্তির বিনাশ হিসেবে উদ্যাপন করে, সেই একই ঘটনাকে এই জনজাতির মানুষের একাংশ দেখে তাঁদের প্রিয় নেতার মৃত্যু এবং পরাজয়ের স্মৃতি হিসেবে।
প্রচলিত হিন্দু পুরাণে মহিষাসুরের সঙ্গে দেবী দুর্গার যুদ্ধ ধর্ম ও অধর্মের সংঘাতের প্রতীক। দেবতাদের সম্মিলিত শক্তি থেকে আবির্ভূতা দেবী দুর্গা দীর্ঘ যুদ্ধের শেষে মহিষাসুরকে বধ করেন। এই কাহিনিতে দেবী ন্যায় ও শুভশক্তির প্রতীক, আর মহিষাসুর অশুভ শক্তির প্রতিভূ।
কিন্তু আদিবাসী লোককথায় এই কাহিনির ব্যাখ্যা অন্য রকম। তাঁদের বিশ্বাস অনুসারে, হুদুড় ছিলেন এক শক্তিশালী শাসক, যিনি নিজের জনজাতি ও রাজ্যকে বহিরাগত শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করতেন। লোকবিশ্বাসের একটি বয়ানে, তাঁর শক্তির সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে পেরে না উঠে শত্রুপক্ষ কৌশলের আশ্রয় নেয়। হুদুড়ের সঙ্গে এক নারীর বিবাহের ব্যবস্থা করা হয়। তাঁদের বিশ্বাস, সেই নারী পরে ছলনার মাধ্যমে হুদুড়কে হত্যা করেন। এই লোককাহিনিতে সেই নারীই দুর্গা নামে পরিচিত হন।
এই ব্যাখ্যায় দুর্গা আর তাঁদের আরাধ্য দেবী নন, বরং তিনি সেই শক্তির প্রতীক, যাঁর হাতে তাঁদের পূর্বপুরুষের মৃত্যু ঘটেছিল। আর মহিষাসুর কোনও দানব নন, তিনি তাঁদের স্মৃতিতে বীরপুরুষ।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। হুদুড় দুর্গার এই কাহিনি আদিবাসী সমাজের লোকবিশ্বাস ও বিকল্প সাংস্কৃতিক স্মৃতি। প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসে প্রমাণিত কোনও নির্দিষ্ট যুদ্ধের বিবরণ নয়। একই ভাবে, এই বয়ানকে মূলধারার পুরাণের আক্ষরিক ইতিহাস হিসেবেও ধরা যায় না। দুই কাহিনির উৎস, উদ্দেশ্য ও সাংস্কৃতিক অবস্থান আলাদা।
লোককাহিনিতে হুদুড়ের মৃত্যু শুধু একজন রাজার মৃত্যু নয়। তা একটি জনগোষ্ঠীর ক্ষমতা হারানো, নিজের ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত হওয়া এবং পরাজয়ের স্মৃতি বহন করে। এই কারণেই তাঁদের কাছে দুর্গাপুজোর মধ্যে তারা পালন করে শোকের আচার। তবে সব আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিশ্বাস এক নয় এবং সব গ্রামেও একইভাবে এই প্রথা পালিত হয় না।
পুরুলিয়ার এক গ্রামে খেরওয়াল সাঁওতালদের হুদুড় দুর্গা পালন এই বিশ্বাসের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তাঁদের কাছে মহিষাসুরের স্মরণ কোনও অসুরের উপাসনা মাত্র নয়, বরং নিজেদের পূর্বপুরুষের সম্মান পুনরুদ্ধারের একটি সাংস্কৃতিক প্রয়াস।
হুদুড় দুর্গার বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দাসাই পরব। দুর্গাপুজোর সময় কয়েকটি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ এই পরব পালন করেন। কোথাও পুরুষেরা নারীর পোশাক পরে, মাথায় ময়ূরের পালক লাগিয়ে, দলবদ্ধভাবে গ্রামে গ্রামে ঘুরে গান ও নাচের মাধ্যমে তাঁদের হারিয়ে যাওয়া নেতাকে খোঁজার প্রতীকী আচার পালন করেন। এই পরিবেশনা ও গানের মধ্যে শোক, বিচ্ছিন্নতা এবং পূর্বপুরুষকে ফিরে পাওয়ার আকুতি ফুটে ওঠে।
এই আচারের তাৎপর্য গভীর। প্রচলিত দুর্গাপুজোয় দেবী বিজয়ী হয়ে ফিরে আসেন, অশুভের বিনাশ ঘটে। আর দাসাই পরবের লোকবিশ্বাসে যেন উল্টো ছবি—পরাজিত পূর্বপুরুষকে খুঁজে চলেছে তাঁর জনগোষ্ঠী। যে কাহিনির এক প্রান্তে বিজয়োৎসব, অন্য প্রান্তে সেখানে শোকযাত্রা।
হুদুড় দুর্গার স্মরণ তাই কেবল দুর্গাপুজোর একটি ব্যতিক্রমী রীতি নয়। এটি এমন এক সাংস্কৃতিক স্মারক, যা মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাস ও পুরাণের পরিচিত চরিত্রগুলিকে ভিন্ন জনগোষ্ঠী ভিন্ন চোখে দেখে। আর কোনও কাহিনিতে যিনি পরাজিত, অন্য কোনও জনগোষ্ঠীর স্মৃতিতে তিনিই হতে পারেন নায়ক।
