মহাবিশ্বের মৌলিক নিয়ম, স্ট্রিং থিয়োরি ও কৃষ্ণগহ্বরের রহস্য উন্মোচনে যুগান্তকারী গবেষণার স্বীকৃতি

বিদ্যুৎ চট্টোপাধ্যায়
মহাবিশ্ব কী দিয়ে তৈরি? কৃষ্ণগহ্বরের ভিতরে কী ঘটে? প্রকৃতির সমস্ত নিয়ম কি কোনও একটি সূত্রের সাহায্যে ব্যাখ্যা করা সম্ভব? এমনই কিছু কঠিন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন বাঙালি বিজ্ঞানী অশোক সেন। ২০২৬ সালে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি পেলেন আন্তর্জাতিক সম্মান অস্কার ক্লেইন মেডেল।
১৯৫৬ সালে কলকাতায় জন্ম অশোক সেনের। প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা শুরু। পরে আইআইটি কানপুর থেকে স্নাতকোত্তর এবং আমেরিকার স্টনি ব্রুক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি। দীর্ঘ গবেষণাজীবনে তিনি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম জটিল ক্ষেত্র স্ট্রিং থিয়োরি বা তারতত্ত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
স্ট্রিং থিয়োরি কী?
আমাদের চারপাশের সবকিছুই পদার্থ দিয়ে তৈরি। পদার্থকে ভাঙতে ভাঙতে পাওয়া যায় অতি ক্ষুদ্র কণা। স্ট্রিং থিয়োরি বলছে, প্রকৃতির একেবারে মৌলিক উপাদানগুলো বিন্দুর মতো কণা না হয়ে অতি ক্ষুদ্র কম্পনশীল সুতোর মতোও হতে পারে। যেমন একটি বাদ্যযন্ত্রের তার বিভিন্নভাবে কম্পিত হয়ে বিভিন্ন সুর তৈরি করে, তেমনই এই তত্ত্বে স্ট্রিংয়ের বিভিন্ন কম্পনের সঙ্গে বিভিন্ন কণার সম্পর্ক রয়েছে। যদিও এই ধারণা এখনও পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি, তবু মহাবিশ্বের মৌলিক নিয়ম বোঝার ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অশোক সেনের অন্যতম বড় অবদান হল, তিনি দেখিয়েছেন নির্দিষ্ট কিছু তাত্ত্বিক কাঠামোয় শক্তিশালী বলের সমস্যাকে দুর্বল বলের সাহায্যে বোঝার পথ পাওয়া যায়। সহজ ভাষায়, যে সমস্যার সমাধান কোনও ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠিন, অন্য একটি সমতুল্য পদ্ধতিতে সেটি সহজ হতে পারে। তাঁর এই গবেষণা স্ট্রিং থিয়োরির বিভিন্ন ধারণার মধ্যে গভীর সম্পর্ক খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে।
কৃষ্ণগহ্বর নিয়েও তাঁর গবেষণা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কৃষ্ণগহ্বরের এনট্রপি বলতে তার অভ্যন্তরীণ সম্ভাব্য কোয়ান্টাম অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পরিমাপকে বোঝায়। অশোক সেনের কাজ নির্দিষ্ট ধরনের কৃষ্ণগহ্বরের ক্ষেত্রে এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অবস্থাগুলোর সংখ্যা গণনা করার তাত্ত্বিক পথ দেখিয়েছে। এর ফলে মহাকর্ষ ও কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের মধ্যে সম্পর্ক বোঝার গবেষণা এগিয়েছে।
অস্কার ক্লেইন মেডেল তাঁর প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নয়। ২০১২ সালে তিনি ব্রেকথ্রু প্রাইজ ইন ফান্ডামেন্টাল ফিজিক্স এবং ২০১৪ সালে ডিরাক মেডেল পান। ভারত সরকারও তাঁকে পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণে সম্মানিত করেছে।
অস্কার ক্লেইন মেডেলকে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মান বলা যায়। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মহাবিশ্বের মৌলিক নিয়ম, স্ট্রিং থিয়োরি ও কৃষ্ণগহ্বরের রহস্য উন্মোচনে ধারাবাহিক ও যুগান্তকারী গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবেই অশোক সেন অস্কার ক্লেইন মেডেল পেয়েছেন। এর আগে এই পুরস্কার পেয়েছেন স্টিফেন হকিং এবং পিটার হিগসের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানীরা।
অশোক সেনের গবেষণার ফল হয়তো সরাসরি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগে না। কিন্তু তাঁর কাজ আমাদের এমন কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করে, যা মানবসভ্যতার জ্ঞানকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়। মহাবিশ্বের গভীরতম রহস্য এখনও অজানা। সেই অজানাকে জানার নিরন্তর চেষ্টাতেই আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানমঞ্চে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছেন এক বাঙালি বিজ্ঞানী।
