দাঁসাই নৃত্য: শাড়ির ভাঁজে, ধামসার আওয়াজে প্রবহমান এক জনগোষ্ঠীর প্রতিবাদ ও অনুসন্ধান

সংবাদদাতা, বাঁকুড়া: ‘দেবীরে দুর্গা লাগিৎ ভুয়াং সাডেকান / আয়ন কাজল লাগিৎ কাঁসা রাঁওয়াঃ কান।’ দেবী দুর্গার পুজো মণ্ডপে আদিবাসী পুরুষরা গান গেয়ে ঘুরে ঘুরে নাচেন। পায়ে তাঁদের আলতা, নূপুর পরা পা। পরণে ধুতির মতো করে পরা শাড়ি। মাথায় ফেট্টি বাঁধা। তাতে ময়ূরের পালক গোঁজা। কাঁসার থালা, ধামসা, ভুয়াং বাজিয়ে দুর্গা প্রতিমার সামনে নেচে গেয়ে ওঁদের রাজা হুদুড়ের অনুসন্ধান করেন ওঁরা। এই নাচকেই দাঁসাই নাচ বলে। দাঁসাই কথাটার মানে হল খোঁজ। আর্য বনাম অনার্য সংস্কৃতির দ্বন্দ্ব এখানে ধরা পড়ে। আদিবাসীদের দেবতা দুর্গা নন, অসুর। ওঁরা মনে করেন আর্যরা অন্যায়ভাবে মহিলাদের সামনে রেখে তাঁদের রাজাকে হত্যা করেছে। দুর্গা সেই মহিলাদের প্রতীক। ওঁরাও এই প্রতীকী নাচের মধ্য দিয়ে আর্যদের বিরুদ্ধে প্রতীকী লড়াই জারি রেখেছেন। ওঁদের এই প্রতিবাদ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। তবে সেই প্রতিবাদ খুবই শৈল্পিক। মাটির গন্ধ মাখা।
দুর্গাপুজোর দশমী বাঙালির কাছে বিষাদের দিন। কৈলাসে ফিরে যাবেন উমা, মণ্ডপে মণ্ডপে বাজবে বিসর্জনের বিষাদসুর। অথচ এই একই দিনে পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহলের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অন্য এক স্মৃতির উত্তরাধিকার বহন করে এগিয়ে চলে আদিবাসীদের দাঁসাই নৃত্য। পুরুষদের পরনে শাড়ি, পায়ে আলতা, হাতে কখনও লাঠি, কখনও ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র। ধামসা-মাদলের গম্ভীর আওয়াজে তাঁরা নেচে চলেন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এ নিছকই এক লোকনৃত্য। কিন্তু দাঁসাইয়ের শরীরী ভাষার ভিতরে লুকিয়ে আছে ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, শোক এবং এক সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক স্মৃতি।
কেন দশমীর দিনেই এই নাচ? কেন পুরুষেরা নারীর পোশাক পরেন? কোন হারিয়ে যাওয়া সময়ের কথা তাঁরা আজও মনে রেখেছেন? দাঁসাইকে বুঝতে হলে লোকসংস্কৃতির এই প্রশ্নগুলির গভীরে প্রবেশ করতে হয়।
দাঁসাই পরবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সাঁওতাল ও কয়েকটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব লোকবিশ্বাস। এই বিশ্বাসের কেন্দ্রে রয়েছেন হুদুড় দুর্গা— যাঁকে অনেক আদিবাসী গোষ্ঠী মহিষাসুরের সঙ্গে অভিন্ন বলে মনে করেন। মূলধারার পৌরাণিক কাহিনিতে মহিষাসুর পরাজিত অসুর, আর দুর্গা দেবীশক্তির প্রতীক। কিন্তু আদিবাসীদের একটি অংশের লোককথায় ছবিটা সম্পূর্ণ উল্টো। সেখানে হুদুড় দুর্গা তাঁদের পূর্বপুরুষদের বীর নেতা, আর তাঁর মৃত্যু এক গভীর শোকের ঘটনা।
কিন্তু এই নারীসাজকে নিছক বিনোদন কিংবা লিঙ্গপরিচয়ের আধুনিক ধারণা দিয়ে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। দাঁসাইয়ের প্রচলিত লোকব্যাখ্যায় এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আত্মগোপন, ছদ্মবেশ এবং হারিয়ে যাওয়া নেতার সন্ধানের কাহিনি। লোককথার একাধিক রূপে বলা হয়, শত্রুর চোখ এড়িয়ে নিজেদের পরিচয় আড়াল করে আদিবাসী পুরুষেরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন। সেই স্মৃতিরই প্রতীক হয়ে উঠেছে তাঁদের বিশেষ পোশাক ও নৃত্যভঙ্গি।
এখানে পোশাক কেবল শরীর ঢাকার উপকরণ নয়। তা হয়ে ওঠে স্মৃতির ভাষা। যে মানুষটি শাড়ি পরে, পায়ে আলতা মেখে নাচছেন, তিনি যেন নিজের শরীরকে ব্যবহার করছেন পূর্বপুরুষদের কাহিনি বহন করার মাধ্যম হিসেবে। এই পোশাকের মধ্যে একই সঙ্গে রয়েছে আত্মরক্ষার স্মৃতি, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং এক হারানো সময়ের বেদনা।
যদি দাঁসাইকে শুধু শাড়ি পরা পুরুষের নাচ, আলতা মাখা পা কিংবা ধামসার ছন্দে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়, তা হলে তার অন্তর্নিহিত অর্থ অধরাই থেকে যাবে।
দাঁসাই কেবল একটি লোকনৃত্য নয়। এটি এমন এক সাংস্কৃতিক স্মৃতি, যা বিজয়ীর কাহিনির পাশাপাশি পরাজিতের কণ্ঠস্বরও শুনতে শেখায়। যে ইতিহাস রাজপ্রাসাদের দলিলে লেখা থাকে না, যে বেদনা সব সময় লিখিত সাহিত্যে জায়গা পায় না, তা কখনও কখনও বেঁচে থাকে মানুষের শরীরের ছন্দে, গানের কথায়, পোশাকের ভাঁজে এবং ধামসার গম্ভীর আওয়াজে। এভাবেই একটি জনজাতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহন করে চলেছে একটি সংস্কৃতি।
