লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা কেন? কী বলছে শাস্ত্র, পুরাণ ও লোকবিশ্বাস

চিরঞ্জিত সরকার
লক্ষ্মী মানেই পদ্মফুল, ধানের শিষ, শস্যভরা গোলা আর সংসারের সুখ-সমৃদ্ধি। কিন্তু দেবী লক্ষ্মীর পাশে যে পাখিটিকে দেখা যায়, তার সঙ্গে সৌন্দর্য কিংবা ঐশ্বর্যের প্রচলিত ধারণার কোনও সহজ মিল নেই। সে পেঁচা। রাতের অন্ধকারে যার বিচরণ, নিস্তব্ধতায় যার উপস্থিতি, দিনের আলোয় যে অনেক সময় আড়ালে থাকে। সম্পদ ও সৌভাগ্যের দেবীর বাহন হিসেবে পেঁচাকেই কেন বেছে নেওয়া হল? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে পুরাণের পাশাপাশি প্রবেশ করতে হয় লোকবিশ্বাস ও প্রতীকের জগতে।
লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা: অন্ধকারের মধ্যে দেখার ক্ষমতা
হিন্দু ধর্মীয় চিত্রকল্পে দেবী লক্ষ্মীকে সাধারণত পদ্মের ওপর উপবিষ্ট অবস্থায় দেখা যায়। তাঁর সঙ্গে থাকে পেঁচা। বাংলার লক্ষ্মীমূর্তি ও পটচিত্রে এই পাখির উপস্থিতি বিশেষভাবে পরিচিত।
পেঁচা নিশাচর পাখি। অল্প আলোতেও তার দেখার ক্ষমতা রয়েছে, আর নিঃশব্দে শিকার ধরার দক্ষতা তাকে প্রকৃতির এক অসাধারণ প্রাণী করে তুলেছে। সেই বৈশিষ্ট্যকে প্রতীকীভাবে ব্যাখ্যা করলে পেঁচা আমাদের মনে করিয়ে দিতে পারে— অন্ধকারের মধ্যেও সতর্ক থাকা, চারপাশের পরিস্থিতি বুঝতে পারা এবং বিপদের আভাস চিনে নেওয়া জরুরি।
ধনসম্পদ অর্জন করা এক বিষয়, আর সেই সম্পদ রক্ষা করা অন্য বিষয়। অর্থ হাতে এলেই যে সমৃদ্ধি স্থায়ী হয়, তা নয়। প্রয়োজন বিচক্ষণতা, সংযম ও দূরদৃষ্টি। পেঁচার বাহনরূপকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে পড়লে একটি তাৎপর্যপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়: সম্পদ অর্জনের পাশাপাশি তাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করাও জরুরি।
লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা: প্রতীক, পুরাণ ও লোকবিশ্বাস
ধনদেবীর বাহন হিসেবে পেঁচাকে আমরা এতটাই স্বাভাবিক ধরে নিই যে প্রশ্নটা সহজে মনে আসে না। অথচ হাতি, পদ্ম বা কলসের মতো সুন্দর ও শুভ প্রতীক থাকতেও লক্ষ্মী বসলেন এমন এক পাখির পিঠে, যাকে অন্য অনেক সংস্কৃতিতে অমঙ্গলের চিহ্ন মনে করা হয়। এর কোনও একক, সর্বজনস্বীকৃত শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা নেই। যা আছে, তা মূলত লোককথা, প্রতীকী পাঠ ও সমাজতাত্ত্বিক অনুমানের এক মিশ্র ধারা।
প্রাচীন মূর্তিতত্ত্বে লক্ষ্মীর পরিচিত রূপ গজলক্ষ্মী। লক্ষ্মী পদ্মাসনা। সেখানে পেঁচার জায়গা নেই। পেঁচা বাহন হিসেবে স্থায়ী আসন পেয়েছে অনেক পরে। বিশেষত লৌকিক পূজা ও আঞ্চলিক পটচিত্রে।
সবচেয়ে প্রচলিত ব্যাখ্যাটি রাতকে ঘিরে। লক্ষ্মী চঞ্চলা, তিনি কোথাও স্থির থাকেন না। কোজাগরী পূর্ণিমা বা দীপাবলির মতো লক্ষ্মীপূজার প্রধান লগ্নগুলো নিশীথ রাতের। যে প্রাণী অন্ধকারে স্পষ্ট দেখে, সে-ই এই নিশাচারিণী দেবীর সঙ্গী হওয়ার উপযুক্ত। লোককথায় এ নিয়ে একটি গল্পও চালু আছে। দেবতারা যখন বাহন বেছে নিচ্ছিলেন, লক্ষ্মী জানালেন তিনি রাতে পৃথিবী পরিক্রমা করবেন। আর রাতের আঁধারে পথ দেখাতে পারে একমাত্র পেঁচা। এই গল্প কোনও শাস্ত্রগ্রন্থের নয়, লোকশ্রুতির।
লক্ষ্মীর বাহন পেঁচা, এর পেছনে তাই কোনও একটি কারণ নেই। আছে রাতের সঙ্গে দেবীর সম্পর্ক, কৃষিজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, ধনের অন্ধত্ব নিয়ে নৈতিক সতর্কতা, আর সম্ভবত প্রাচীনতর লোকবিশ্বাসের স্মৃতি। পেঁচা যেন ঐশ্বর্যের দুই দিকই বহন করে: শুভ আগমন এবং মোহের ঝুঁকি।
পেঁচা কি অশুভের প্রতীক?
অনেক সমাজে পেঁচার ডাককে অশুভ সংকেত বলে মনে করা হয়েছে। আবার অন্য নানা সংস্কৃতিতে পেঁচা জ্ঞান, সতর্কতা কিংবা রহস্যের প্রতীক। গ্রিক দেবী অ্যাথেনার সঙ্গেও পেঁচার সম্পর্ক ছিল, সেখানে সে প্রজ্ঞার প্রতীক। বাংলার লোকবিশ্বাসেও পেঁচাকে ঘিরে নানা ধারণা রয়েছে।
এই দ্বৈততার মধ্যেই লক্ষ্মীর বাহন হিসেবে পেঁচার উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। যে পাখিকে কেউ অমঙ্গলের সঙ্গে যুক্ত করেন, তাকেই আবার সম্পদ ও সৌভাগ্যের দেবীর বাহন হিসেবে পূজা-পরম্পরায় দেখা যায়।
