বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
বেলুড় মঠে মহাসাড়ম্বরে হয়ে গেল কুমারী পুজো পাঁজরে হাড় ভেঙে ফুসফুসে, চোরবাগানের ময়নাতদন্তের ভয়াবহ রিপোর্ট টাইগার শ্রফের উপর গুলি, হামলা, গ্রেপ্তার ৩ টাইগার শ্রফকে হামলায় দায়স্বীকার বিষ্ণোই গ্যাংয়ের

কোন কোন গাছ থাকে নবপত্রিকায়, কেন বলা হয় শস্যলক্ষ্মী?

17 October, 2026 10:06 AM Sandipan Saha
শেয়ার করুন

লিখেছেন কঙ্কণা লাহিড়ী

সপ্তমীর ভোরে যখন শিশির ভেজা শিউলি টুপটুপ করে ঝরে পড়ে, তখন বেজে ওঠে ঢাকের আওয়াজ। সেই ব্রাহ্মমুহূর্তে থাকেশহর থেকে গ্রাম পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে এক অপার্থিব আনন্দে।  সেই সময় সর্বত্র দেখা যায় একটি দৃশ্য। পুরোহিতের পিছনে কারও কোলে চেপে ঘোমটা-টানা এক ‘বউ’ নদীর ঘাটে চলেছেন। তাঁকে স্নান করানো হবে, লালপেড়ে শাড়ি পরানো হবে, তারপর বসানো হবে গণেশের পাশে। এই বউ আসলে কোনও নারী নন, একগুচ্ছ গাছ। নাম নবপত্রিকা, লোকমুখে কলাবউ। লোককথা আর পুরাণ কিন্তু ভিন্ন কথা বলছে। একটু দেখা যাক, অআসলে এটা কী। দুর্গাপুজোর সঙ্গে তার সম্পর্কই বা কী।

মহিষাসুরমর্দিনীর রণরূপ আমাদের সবচেয়ে চেনা ছবি। কিন্তু পুজোর সবচেয়ে প্রাচীন ও মাটির-কাছের স্তরটি বোধহয় এই নবপত্রিকাতেই ধরা আছে। কিন্তু কেন নয়টি গাছ? সেগুলি কী  কী! দুর্গাপুজোর সঙ্গে তার সম্পর্ক কী?

আসলে নয়টি গাছকে ধরা হয় নয়টি দেবীরূপ। নবপত্রিকার নয়টি গাছকে নবদুর্গার প্রতীক ধরা হয়। প্রতিটি গাছের সঙ্গে এক-একটি দেবীরূপ জড়িয়ে আছে।

১) কলা— এর অর্থ দেবীর ব্রহ্মাণী রূপ।

২) কচু— এই গাছটি দেবীর কালিকা রূপ

৩) হলুদ— দেবী দুর্গার রূপ

৪) জয়ন্তী— দেবীর কার্তিকী রূপ

৫) বেল— দেবীর শিবা রূপ

৬) ডালিম— দেবীর রক্তদন্তিকা    রূপ

৭) অশোক — শোকরহিতার প্রতীক

৮) মানকচু— দেবীর চামুণ্ডা রূপ

৯) ধান— দেবীর লক্ষ্মী রূপ

তালিকাটি ভালো করে পড়লে একটি জিনিস চোখে পড়ে। নয়টির প্রায় সবই মানুষের প্রাত্যহিক বেঁচে থাকার সঙ্গে যুক্ত। ধান, কলা, কচু ও মানকচু খাদ্য জোগায়। হলুদ, বেল, ডালিম ও অশোক ওষুধ ও মঙ্গলের কাজে লাগে। এর মধ্যে কচু-জাতীয় কন্দ-মূল ছিল অনটনের দিনের ভরসা। অর্থাৎ যে গাছ মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, সেখানেই দেবীর অধিষ্ঠান কল্পনা করা হয়েছে। দেবী এখানে অস্ত্রধারিণী নন, অন্নদাত্রী।

জয়ন্তী নিয়ে একটু মতভেদ আছে। কেউ কেউ একে সেসবানিয়া জাতীয় গাছ বলে শনাক্ত করেন, যা মাটিতে নাইট্রোজেন জোগায় এবং সবুজ সার হিসেবে চাষিদের পরিচিত। আবার বোধনের ঘটে যব বুনে সেই অঙ্কুরকেও “জয়ন্তী” বলা হয়, যা দশমীতে আশীর্বাদ হিসেবে মাথায় ধরার রীতি আছে। কোন পরিচয়টি মূল, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে দুই ক্ষেত্রেই সূত্রটি সেই শস্য ও উর্বরতা।

তাই কলাবউ স্ত্রী নন, তিনি শস্যলক্ষ্মী। লোকমুখে অবশ্য কলাবউ গণেশের স্ত্রী। এই ধারণা শাস্ত্রসম্মত নয়। কলাবউ আসলে নবপত্রিকা, অর্থাৎ দেবী দুর্গারই নবরূপ। গণেশের পাশে তাঁকে বসানোর রীতি থেকেই সম্ভবত বউ-ধারণাটি জন্মেছে।

তবে বধূর সাজের একটি অর্থ খুঁজে নেওয়া যায়। লালপেড়ে শাড়ি, ঘোমটা, সিঁদুর, এ সবই মঙ্গল ও সন্তানধারণের প্রতীক। নতুন ফসলকে মাতৃত্বের রূপে দেখার এই ভাবনা কৃষিসমাজে বহু জায়গাতেই মেলে। গাছগুলিকে নদীতে স্নান করানো যেন বৃষ্টি ও জলকে ডেকে আনার প্রতীকী আচার, যে জলে ফসল বাঁচে।

দুর্গাপুজো হয় আশ্বিনে। তখন বর্ষা ফুরিয়ে আসছে, আমন ধান মাঠে দুধ-ভরা অবস্থায়, কিন্তু ঘরে ওঠার সময় আসেনি। চাষির জীবনে এ এক উদ্বেগের সন্ধিক্ষণ। শেষ বৃষ্টিতে ফসল কতটা বাঁচবে, বন্যা এলে কী হবে, কেউ জানে না। ঠিক এই সময়ে ভালো ফসলের জন্য প্রার্থনা বা কৃতজ্ঞতার উৎসব গড়ে ওঠা অস্বাভাবিক নয়।

দশমীর পরে আসে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। সেখানে ধানের শিষ ও নতুন ধানই আরাধ্য। দুর্গাপুজো থেকে লক্ষ্মীপুজোর এই ধারাবাহিকতাও শস্যের সঙ্গে পুজোর সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।

প্রতিমার কাঠামোতে বাঁশ ও খড়, গায়ে নদীর পলিমাটি, বাঁধনে পাটের দড়ি। এসবই গ্রামীণ কৃষিজীবনের উপজাত দ্রব্য। প্রতিমা গড়ার সামগ্রী এসেছে মাঠ আর নদী থেকে, আর বিসর্জনে ফিরে যায় নদীতেই। একে মাটির সঙ্গে সম্পর্ক বলা যায়।

শস্যদাত্রী দেবীর ধারণা পুরাণেও আছে। দেবীমাহাত্ম্যের একাদশ অধ্যায়ে দেবী বলেন, বহু বছরের অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তিনি নিজের শরীর থেকে উৎপন্ন শাকসবজি দিয়ে সমস্ত জগৎকে পালন করবেন। তাই তাঁর নাম হবে শাকম্ভরী। দুর্গম নামের এক অসুরকে বধ করার কারণে তিনি দুর্গা নামেও পরিচিত হবেন, এমন কথাও সেই অংশে আছে। এই বর্ণনায় দেবীর যুদ্ধরূপ ও পালনরূপ পাশাপাশি দেখা যায়।

বাংলার দুর্গাপুজোর স্বাতন্ত্র্য বোধহয় এই মিলনেই। এক হাতে অস্ত্র নিয়ে যিনি অসুরের বুকে শূল বিদ্ধ করেন, তিনিই আবার ঘরের মা, যিনি ধানের শিষে, কলাগাছের পাতায়, হলুদের গন্ধে ধরা দেন। মণ্ডপের আলো-আড়ম্বরের পাশে সপ্তমীর ভোরে ঘাটে যাওয়া সেই কলাবউ মনে করিয়ে দেন, এই উৎসবের শিকড় মাটির অনেক গভীরে।

 

প্রতিবেদন

Sandipan Saha