নরেন্দ্র মোদির ২৫ বছরের প্রশাসনিক যাত্রা: সেবা ও সাফল্যের পাশাপাশি কিছু প্রশ্ন
একজন মুখ্যমন্ত্রী থেকে তিনি হয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। তারপর কেটে গেল ২৫ বছর। ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। ২০১৪ সালে তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। ২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর প্রশাসনের শীর্ষে তাঁর ২৫ বছর পূর্ণ হল। ১৩ বছর গুজরাতে এবং ১২ বছরের বেশি সময় আছেন কেন্দ্রে, এত দীর্ঘ সময় ধরে কোনও নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে থাকা ভারতের রাজনীতিতে বিরল ঘটনা।
এই ২৫ বছরকে শুধু সাফল্যের গল্প হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আবার শুধুই সমালোচনা করলেও ছবিটা অসম্পূর্ণ থাকবে। মোদিকে বুঝতে হলে দেখতে হবে, কী করেছেন, কী করতে পারেননি, কোথায় তাঁর প্রশাসন মানুষের জীবন বদলেছে, কোথায় প্রশ্ন উঠেছে এবং এত বছর পরেও তাঁর জনপ্রিয়তা টিকে আছে কেন!
শুরুটা খুব সহজ ছিল না। ২০০১ সালে গুজরাতের দায়িত্ব যখন মোদির হাতে আসে, তখন রাজ্য ভূমিকম্পের ধাক্কা সামলাচ্ছে। তার সঙ্গে ছিল খরা, জলসংকট, বিদ্যুৎ সমস্যা এবং প্রশাসনিক অস্থিরতা। এর কিছুদিন পরেই আসে ২০০২-এর গোধরা এবং তার পরের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এই ঘটনাই মোদির রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলির একটি হয়ে থাকে। তাঁর সমর্থকেরা প্রশাসনের পরবর্তী উন্নয়নকে সামনে আনেন, আবার সমালোচকেরা ২০০২-এর ভূমিকা ও প্রশাসনিক দায় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে থাকেন।
অর্থাৎ, মোদির রাজনৈতিক যাত্রার শুরুতেই উন্নয়ন এবং বিতর্ক— দু’টি বিষয় পাশাপাশি এসেছে। ২০০২-এর পর মোদি ধীরে ধীরে নিজের রাজনৈতিক পরিচয়কে উন্নয়নের সঙ্গে জুড়তে শুরু করেন। রাস্তা, বিদ্যুৎ, সেচ, শিল্প, জল ইত্যাদি ক্ষেত্রে গুজরাতের অগ্রগতি দেখা যায়। রাজ্যে শিল্প বিনিয়োগ বাড়ে।
সমস্ত প্রশংসা এবং সমালোচনার মধ্যে মোদি নিজেকে শুধু বিজেপির নেতা হিসেবে নয়, একজন দক্ষ প্রশাসক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পেরেছিলেন। এই ভাবমূর্তিই তাঁকে দিল্লির দিকে নিয়ে যায়। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মোদি বুঝতে পেরেছিলেন, গুজরাতে যা কাজ করেছেন, তার জাতীয় সংস্করণ তৈরি করতে হবে। সেখান থেকেই জনধন, উজ্জ্বলা, স্বচ্ছ ভারত, প্রধানমন্ত্রী আবাস, আয়ুষ্মান ভারত, পি এম কিষান, জল জীবন মিশনের মতো প্রকল্পের সূচনা করেন।
এই প্রকল্পগুলির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, সরকারি সুবিধা সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। একজন দরিদ্র মানুষ যদি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট পান, গ্যাসের সংযোগ পান, বাড়ি পান বা সরাসরি টাকা পান, তাহলে তাঁর কাছে সরকারের উপস্থিতি আর বিমূর্ত থাকে না। সরকার হয়ে ওঠে সচল, দৃশ্যমান। এটাই মোদি সরকারের বড় রাজনৈতিক সাফল্যগুলির একটি। কিন্তু এখানে প্রশ্নও আছে। সরকারের কোনও প্রকল্পে কোটি কোটি মানুষ যুক্ত হলেই তার অর্থ এই নয় যে, সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা আর সেই অ্যাকাউন্টে নিয়মিত লেনদেন হওয়া এক বিষয় নয়। গ্যাসের সংযোগ পাওয়া আর গ্যাসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকাও এক নয়। বাড়ি তৈরি হওয়া আর সেই পরিবারের স্থায়ী আয় তৈরি হওয়াও এক নয়। অর্থাৎ, কল্যাণ প্রকল্পের সংখ্যা দিয়ে উন্নয়ন মাপা যায় না। দেখতে হবে মানুষের আয় বাড়ল কি না, চাকরি তৈরি হল কি না, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান বাড়ল কি না। এই জায়গাতেই মোদি সরকারের সামনে এখনও বড় প্রশ্ন রয়েছে। সেগুলির সমাধান হোক, চান দেশের মানুষ।
আবার বলতেই হয়, মোদির সবচেয়ে বড় শক্তি হল যোগাযোগ। এই রাজনৈতিক যোগাযোগ তাঁর জনপ্রিয়তাকে আনপ্যারালাল করে তুলেছে। মানুষকে ভাবতে বাধ্য করেছেন যে, মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়। সেই জাদুই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে পঁচিশ বছরের পাদপীঠে।
স্বচ্ছ ভারত, মেক ইন ইন্ডিয়া, আত্মনির্ভর ভারত, বিকশিত ভারত —এগুলি শুধু সরকারি প্রকল্পের নাম নয়। এগুলি সাধারণ মানুষের মনে একটি বড় রাজনৈতিক ছবিও তৈরি করেছে। এছাড়া মন কি বাত, সামাজিক মাধ্যম, বড় জনসভা, বিদেশ সফর —সব মিলিয়ে মোদি নিজেকে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
এছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা, সীমান্ত, পাকিস্তান, সন্ত্রাসবাদ, আর্টিকল ৩৭০, রাম মন্দির, ভারতের আন্তর্জাতিক মর্যাদা—এই বিষয়গুলিকে তিনি নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছেন। সমর্থকদের কাছে এগুলি শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী ভারতের প্রতীক। সমালোচকদের কাছে আবার এগুলির কিছু বিষয় দেশের সামাজিক বিভাজন বাড়িয়েছে। দুই দিকের ব্যাখ্যাই কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।
বুঝতে হবে, মোদির জনপ্রিয়তা শুধু অর্থনীতি বা কল্যাণের ফল নয়। জাতীয়তাবাদ এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্নও তাঁর জনপ্রিয়তার বড় অংশ। বিরোধীদের দুর্বলতাও মোদির শক্তি। মোদির সাফল্যের গল্প তাই শুধু মোদির নিজের গল্প নয়। তাঁর সামনে থাকা বিরোধীদের গল্পও। কংগ্রেস দীর্ঘ সময় ধরে নেতৃত্ব, সংগঠন এবং রাজনৈতিক সংকটে ছিল। বিরোধী দলগুলি অনেক ক্ষেত্রেই মোদির বিরুদ্ধে একজোট হতে পারলেও তাঁর বিকল্প রাজনৈতিক চরিত্র তৈরি করতে পারেনি। মোদির জনপ্রিয়তা বাড়ার পিছনে বিরোধীদের এই নেগেটিভ পারফরমেন্সও রয়েছে।
