পর্যটনে এক নম্বর হতে পারে পশ্চিমবঙ্গ, খামতিটা কোথায়?
কী নেই এই বাংলায়! এখানে পাহাড় আছে। সমুদ্র আছে। জঙ্গল আছে। নদী আছে। চা-বাগান আছে। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ আছে। বাঘ দর্শনের সুযোগ আছে। আছে মন্দির, মসজিদ, গির্জা, মঠ, রাজবাড়ি, প্রাচীন স্থাপত্য, ঔপনিবেশিক ইতিহাস, নবজাগরণের স্মৃতি। আছে রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, নেতাজি, চৈতন্য, বঙ্কিম, শরৎচন্দ্র থেকে শুরু করে বাংলার অসংখ্য সাংস্কৃতিক স্মৃতির ভাণ্ডার। এক কথায়, পর্যটনের জন্য যা যা লাগে, তার অনেকটাই বাংলার হাতে মজুত।
তাহলে প্রশ্নটা স্বাভাবিক, এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পর্যটনে বাংলা এখনও কেন নিজের সম্ভাবনার তুলনায় অনেক পিছিয়ে? পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তর নিজেই স্বীকার করে যে, রাজ্যের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য একটি বড় সম্পদ। সরকারি পর্যটন পরিকল্পনায় পাহাড়, সমুদ্র, জঙ্গল, সুন্দরবন, চা-বাগান, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পর্যটন এবং নদী-ক্রুজ পর্যটনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সম্ভাবনার অভাব নেই। আসল প্রশ্ন পরিকল্পনা, পরিকাঠামো এবং পর্যটন-অভিজ্ঞতার মান।
বাংলায় পর্যটনকে অনেক সময় কয়েকটি পরিচিত গন্তব্যের মধ্যে আটকে রাখা হয়েছে। একটা সময় বাঙালির ট্যুরিজম বলতে বোঝাত দী-পু-দা। অর্থাৎ দীঘা, পুরী, দার্জিলিং। সেখান থেকে বাঙালি অনেকটা বেরিয়ে এসেছ। আজ সে নানা ধরনের অফবিট জায়গা খোঁজে বেড়াতে যাওয়ার জন্য। গড়পরতা বাঙালি আজ বিদেশেও বেড়াতে যাচ্ছে। তা সত্ত্বে বাংলার পর্যটনে বিরাট কোনও আশার আলো দীর্ঘদিন দেখা যায়নি। দার্জিলিং, দীঘা, সুন্দরবন, মন্দারমণি, শান্তিনিকেতন, এর বাইরে রয়েছে বিশাল এক বাংলা।
কয়েকটার কথা বলা যেতে পারে। মুর্শিদাবাদ হতে পারে ইতিহাসের শহর। বিষ্ণুপুর হতে পারে টেরাকোটা ও মন্দির স্থাপত্যের আন্তর্জাতিক গন্তব্য। কোচবিহার, মালদহ, গৌড়, পাণ্ডুয়া হতে পারে হেরিটেজ সার্কিট। পুরুলিয়া হতে পারে প্রকৃতি, লোকসংস্কৃতি ও অ্যাডভেঞ্চার পর্যটনের কেন্দ্র। দুই দিনাজপুর, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম, বীরভূম, আলিপুরদুয়ার প্রতিটি জেলার নিজস্ব পর্যটন পরিচয় তৈরি করা সম্ভব। এমনকী কলকাতাকেও নতুনভাবে দেখতে হবে। কলকাতার ইতিহাস, উত্তর কলকাতার পুরনো বাড়ি, বাবু সংস্কৃতি, ঔপনিবেশিক স্থাপত্য, থিয়েটার, সাহিত্য, খাবার— সব মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ Urban Heritage Tourism তৈরি করা সম্ভব।
এছাড়া রয়েছে গঙ্গা। এটি বাংলার সবচেয়ে বড় অব্যবহৃত পর্যটন সম্পদগুলির একটি। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরও নদী এবং ক্রুজ পর্যটনকে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কলকাতা থেকে গঙ্গাসাগর, সুন্দরবন বা ঐতিহাসিক নদীবন্দরগুলিকে যুক্ত করে পরিকল্পিত নদী-ভ্রমণ, ডিনার ক্রুজ, হেরিটেজ ক্রুজ কিংবা বহুদিনের রিভার-সাফারি কেন হবে না?
তবে শুধু নতুন পর্যটনকেন্দ্র ঘোষণা করলেই পর্যটন বাড়ে না। পর্যটককে যাতায়াত, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, ভালো থাকার ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য পরিবহণ, প্রশিক্ষিত গাইড, ডিজিটাল তথ্য এবং স্বচ্ছ মূল্যব্যবস্থা দিতে হয়। পর্যটন মানে শুধু একটি সুন্দর জায়গা নয়; পর্যটকের পুরো অভিজ্ঞতা। এখানেই বাংলার বড় কাজ বাকি। ইতিবাচক কিছু পদক্ষেপ অবশ্যই হয়েছে। হোমস্টে নীতি, পর্যটক গাইডদের প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন, পর্যটন পরিষেবা প্রদানকারীদের স্বীকৃতি এবং কিছু পর্যটন ইউনিটকে শিল্পের মর্যাদা দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। রাজ্য সরকারের ২০২৫ সালের বাজেট নথি অনুযায়ী, ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ পর্যন্ত ৫,৩২২টি হোমস্টে নিবন্ধিত ছিল এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মিলিয়ে ৪১,৩২০টি কর্মসংস্থানের কথা সরকার উল্লেখ করেছে।
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে পর্যটন দপ্তরের জন্য ৫২৫.৯২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাবও রয়েছে। এই উদ্যোগগুলিকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে হবে। কারণ পর্যটন শুধু হোটেল ব্যবসা নয়। পর্যটনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে গাড়ি, নৌযান, রেস্তোরাঁ, হস্তশিল্প, কৃষিপণ্য, লোকশিল্প, গাইড, ফটোগ্রাফার, ট্রাভেল এজেন্সি, ডিজিটাল কনটেন্ট, সংস্কৃতি এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসা। অর্থাৎ একটি পর্যটনকেন্দ্র তৈরি হলে তার অর্থনৈতিক প্রভাব চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। তাই বাংলার পর্যটন নীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু ‘কত পর্যটক এলেন’ নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত, কতদিন থাকলেন, কত টাকা খরচ করলেন, স্থানীয় মানুষের কতটা আয় হল এবং কত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হল।
আমাদের আরও একটি পরিবর্তন দরকার। বদলাতে হবে ভাবনা। Tourist Destination নয়, Tourism Circuit ভাবনাকে প্রাধান্য দিতে হবে। দার্জিলিং একা নয়। আছে দার্জিলিং, কালিম্পং, ডুয়ার্স। মুর্শিদাবাদ একা নয়। আছে মুর্শিদাবাদ-মালদহ-গৌড়-পাণ্ডুয়া। বিষ্ণুপুর একা নয়। আছে বিষ্ণুপুর-জয়পুর-বাঁকুড়া-পুরুলিয়া। কলকাতা একা নয়। কলকাতা, চন্দননগর, হুগলি, মুর্শিদাবাদ। এভাবে পর্যটকের থাকার সময় বাড়ানো সম্ভব।
বিশ্ব পর্যটন দিবসে তাই বাংলার সামনে প্রশ্নটি শুধু ‘কত পর্যটক এল?’ হওয়া উচিত নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত,আমরা কি আমাদের সম্পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছি? বাংলার পর্যটন দপ্তরের বর্তমান উদ্যোগগুলিকে আরও শক্তিশালী করে, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে, জেলাভিত্তিক পর্যটন পরিকল্পনা তৈরি করে এবং পরিকাঠামোর ঘাটতি পূরণ করতে পারলে পর্যটন বাংলার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে। পর্যটনে বাংলা হোক ভারতের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। আর সেই পর্যটনের সুফল পৌঁছে যাক বাংলার মানুষের ঘরে ঘরে।
