চোরবাগানের বিপর্যয় প্রশ্ন তুলে দিল প্রশাসনের প্রস্তুতি ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে
মানুষ কি ঠাকুর দেখতে যাওয়ার নিরাপত্তাটুকুও পাবে না? উৎসবের আনন্দে শামিল হতে গিয়ে কি তাকে প্রাণের ঝুঁকি নিতে হবে? চোরবাগানের মর্মান্তিক বিপর্যয় এই প্রশ্নগুলিকেই সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। যে দুর্গাপুজো বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি ও মিলনের উৎসব, সেই উৎসবের ভিড় যদি মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে, তার দায় কে নেবে? যাঁরা প্রাণ হারালেন, তাঁদের অপরাধ কী ছিল? তাঁরা তো আর পাঁচজনের মতোই পুজো দেখতে বেরিয়েছিলেন। আনন্দের কয়েকটি মুহূর্ত ভাগ করে নিতে চেয়েছিলেন প্রিয়জনদের সঙ্গে। অথচ উৎসবের সেই আনন্দই যদি শেষ পর্যন্ত শোকের কারণ হয়, তার চেয়ে বড় ট্রাজেডি আর কী হতে পারে!
চোরবাগানের ঘটনাকে নিছক একটি দুর্ঘটনা বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না। দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে, কিন্তু সেই দুর্ঘটনা কতটা অনিবার্য ছিল, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। ভিড় নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশ ও বেরোনোর পথ, মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, বিপদের আশঙ্কা আগেভাগে চিহ্নিত করা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধারকাজ— এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রশাসনের প্রস্তুতি কতটা কার্যকর ছিল, তার নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। মানুষের প্রাণহানির পর শুধু শোকপ্রকাশ যথেষ্ট নয়। জানতে হবে, কোথায় ভুল হয়েছিল, কোন সতর্কতা উপেক্ষিত হয়েছিল এবং ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে বড় ধর্মীয় সমাবেশে পদপিষ্ট হয়ে মানুষের মৃত্যুর ঘটনা আমরা দেখেছি। কুম্ভমেলার মতো বিপুল জনসমাগমে নিরাপত্তা ও ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা কী ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তার নজির রয়েছে। কিন্তু কলকাতার দুর্গাপুজোকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা বরাবরই আলাদা। এই শহর বহু বছর ধরে বিপুল জনসমাগম সামলেছে। পুজোর দিনগুলিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নামেন। দেশ-বিদেশের মানুষ কলকাতার পুজো দেখতে আসেন। সেই অভিজ্ঞতা, পরিকাঠামো ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির পরেও যদি এমন মর্মান্তিক বিপর্যয় ঘটে, তা হলে প্রশ্ন উঠবেই—আমরা কি কোথাও আত্মতুষ্টিতে ভুগেছি?
পুজোর আগে পুলিশ ও প্রশাসনের একাধিক বৈঠক হয়। পুজো উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলে। নিরাপত্তা, যান চলাচল, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি পরিষেবা নিয়ে নানা নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু বৈঠক হওয়া আর সেই বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাস্তবে কার্যকর হওয়া এক কথা নয়। কাগজে-কলমে পরিকল্পনা নিখুঁত হলেই মাঠের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, পর্যাপ্ত কর্মী মোতায়েন, বিপদের মুহূর্তে মানুষের নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়— এসবই প্রকৃত প্রস্তুতির পরীক্ষা। চোরবাগানের বিপর্যয় সেই পরীক্ষার সামনে প্রশাসনকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এখানে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলাও জরুরি। পুজোর সময় পুলিশের কাজ শুধু যানজট সামলানো, ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা কিংবা কোনও নির্দিষ্ট নির্দেশ কার্যকর করা নয়। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান দায়িত্ব। কোন এলাকায় বিপজ্জনক ভিড় তৈরি হতে পারে, কোথায় অতিরিক্ত পুলিশ প্রয়োজন, কোন পথে মানুষকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে— এই সব বিষয়ে আগাম পরিকল্পনা ও বাস্তব পরিস্থিতির উপর নজরদারি অপরিহার্য। বিপর্যয়ের পর তদন্তে যদি কোনও গাফিলতি বা সমন্বয়ের অভাব ধরা পড়ে, তা হলে সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণ করতে হবে। পদমর্যাদা বা রাজনৈতিক পরিচয় যেন সেই দায় এড়ানোর ঢাল না হয়ে ওঠে।
আরও একটি প্রশ্ন উঠছে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের। বিরোধীদের অভিযোগ, পুজোর সময় পুলিশকে সিপিএমের বইয়ের স্টল ভাঙার মতো ঘটনায় ব্যস্ত দেখা গিয়েছে। অন্যদিকে, পুলিশের শীর্ষকর্তার রাস্তার রং নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যও জনপরিসরে আলোচনার বিষয় হয়েছে। এই অভিযোগগুলির সত্যতা ও প্রেক্ষিত আলাদাভাবে বিচার করা দরকার। কিন্তু মূল প্রশ্নটি এড়ানো যায় না— প্রশাসনের মনোযোগের কেন্দ্রে কি মানুষের নিরাপত্তা ছিল? রাজনৈতিক বিতর্ক, রাস্তার রং কিংবা বিরোধী দলের কর্মসূচি নিয়ে চাপানউতোরের ঊর্ধ্বে উঠে পুলিশকে তার মৌলিক দায়িত্ব পালন করতে হবে। উৎসবের মরশুমে একটি মানুষের প্রাণও যাতে অকারণে বিপন্ন না হয়, সেটাই অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
সরকারের পক্ষে ঘটনার পর বিবৃতি দেওয়া স্বাভাবিক। তদন্তের ঘোষণা হবে, দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও মিলবে। কিন্তু সরকারি বিবৃতি আর জবাবদিহি এক জিনিস নয়। তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ হচ্ছে, তার ফলাফল প্রকাশ করা হচ্ছে কি না, দায়িত্বে অবহেলা প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না— নাগরিকের কাছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা মানেই তদন্তের আগেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়। বরং তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে হলে প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সাহস দেখাতে হবে প্রশাসনকেই।
আমাদের ভরসা রাখতে হবে তদন্তের উপর। কিন্তু ভরসা মানে অন্ধ আনুগত্য নয়। তদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা এবং একই সঙ্গে প্রশাসনিক ব্যর্থতার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা পরস্পরবিরোধী নয়। বরং গণতন্ত্রে এই দুইয়ের সহাবস্থানই জরুরি। কোনও দুর্ঘটনার পর সরকারকে বিব্রত না করার জন্য প্রশ্ন বন্ধ করে দেওয়া যায় না। মানুষের প্রাণের মূল্য রাজনৈতিক অস্বস্তির চেয়ে অনেক বেশি।
চোরবাগানের বিপর্যয় তাই শুধু একটি এলাকার ঘটনা নয়। এটি কলকাতার পুজো ব্যবস্থাপনা, পুলিশের প্রস্তুতি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির সামনে একটি কঠিন প্রশ্নচিহ্ন। এত বড় উৎসবকে নিরাপদ রাখতে হলে প্রচলিত ব্যবস্থার উপর নির্ভর করলেই চলবে না। প্রতিটি বড় পুজোয় ভিড়ের ধারণক্ষমতা নির্ধারণ, প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ পৃথক রাখা, বিপদের সময় দ্রুত মানুষকে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত উদ্ধারকর্মী এবং কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। পুজো কমিটিগুলিরও দায় রয়েছে। নিরাপত্তা কোনও আনুষ্ঠানিক অনুমতিপত্রের শর্ত নয়, মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত একটি মৌলিক দায়িত্ব।
দুর্গাপুজো আমাদের কাছে আনন্দের, মিলনের এবং অসুর শক্তির বিরুদ্ধে শুভশক্তির জয়ের প্রতীক। সেই উৎসবের ভিড়ে মানুষের মৃত্যু যদি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েও না ঠেকানো যায়, তবে তাকে শুধু দুর্ভাগ্য বলে মেনে নেওয়া যায় না। মৃতদের পরিবারের কাছে কোনও বিবৃতিই তাঁদের প্রিয়জনকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। কিন্তু নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত দায় নির্ধারণ এবং কার্যকর সংস্কার অন্তত ভবিষ্যতের প্রাণহানি ঠেকানোর পথ তৈরি করতে পারে।
মানুষ ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরবে— এটুকু প্রত্যাশা কোনও বিলাসিতা নয়। এটি প্রতিটি নাগরিকের অধিকার এবং প্রশাসনের দায়িত্ব। চোরবাগানের বিপর্যয়ের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই একটাই— উৎসবের আয়োজন যত বড়ই হোক, মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কি কিছু হতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর বিবৃতিতে নয়, প্রশাসনের কাজে দিতে হবে।
