AI নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ: গবেষকদের পদত্যাগের ঢেউ, আর ওয়াশিংটন-বেইজিং টানাপোড়েন
নিউ ইয়র্ক, 15 সেপ্টেম্বর: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ঘিরে উদ্বেগ যেন প্রতি সপ্তাহেই নতুন মাত্রা পাচ্ছে। একদিকে বড় বড় ল্যাবের ভেতর থেকেই নিরাপত্তা-গবেষকরা একে একে সরে দাঁড়াচ্ছেন, সতর্ক করছেন ঝুঁকি নিয়ে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনে নিয়ন্ত্রণ চাপানো নিয়ে তীব্র বিতর্ক, আর বেইজিং সেই বিতর্ককে দেখছে একেবারে ভিন্ন চোখে।
গবেষকদের পদত্যাগের ঢেউ
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় একের পর এক নামী AI ল্যাব থেকে নিরাপত্তা-বিশেষজ্ঞরা পদত্যাগ করেছেন। Anthropic-এর জেকব কক্সন প্রথম আলোচনায় আসেন, তাঁর দাবি ছিল—চলতি দশক শেষ হওয়ার আগেই AI মানবসভ্যতার জন্য মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে। এর কিছুদিন পরই Anthropic-এর আরেক নিরাপত্তা-গবেষক জো বেন্টনও সংস্থা ছাড়েন।
এবার সেই তালিকায় যোগ দিলেন Google-এর DeepMind-এর AGI সেফটি টিমের গবেষক জশ এঙ্গেলস। তিনি জানিয়েছেন, প্রায় তিন সপ্তাহ আগে তিনি DeepMind ছেড়েছেন এবং এখন যোগ দিয়েছেন স্বাধীন AI-মূল্যায়ন সংস্থা METR-এ, যারা মূলত AI-এর ঝুঁকি ও ভুল-সংযোজন (misalignment) খতিয়ে দেখার কাজ করে। এঙ্গেলস জানান, DeepMind-এর কাজ তিনি উপভোগ করতেন, এমনকি Anthropic ও OpenAI-এর প্রস্তাবও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন—তবু ঝুঁকির মাত্রা তাঁর কাছে অসহনীয় ঠেকেছে বলেই এই সিদ্ধান্ত।
তাঁর মূল আশঙ্কা তথাকথিত “রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট” (RSI) নিয়ে—অর্থাৎ AI সিস্টেম নিজের চেয়েও শক্তিশালী পরবর্তী প্রজন্মের সিস্টেম তৈরিতে সাহায্য করছে, অথচ এই ক্ষমতা যতটা দ্রুত বাড়ছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ততটা এগোতে পারছে না। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার কথাও তিনি তুলে ধরেছেন, যেখানে বিভিন্ন AI মডেল নাকি নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করেছে, সিস্টেম হ্যাক করেছে এবং নিজেদের কাজের প্রমাণ মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। আগামী পাঁচ বছরে AI থেকে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা যথেষ্ট বাস্তব বলেই তাঁর মত।
ওয়াশিংটনে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানাপোড়েন
গবেষকদের এই সতর্কবার্তার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে AI নিয়ন্ত্রণ একটি বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি এই উদ্বেগকে “হোক্স” (hoax) এবং “সিক কনস্পিরেসি” বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ চাপালে চিনের কাছে সুবিধা চলে যাবে; বরং একজন “শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান প্রেসিডেন্ট”-ই যথেষ্ট AI নিয়ন্ত্রণের জন্য। তাঁর কথায়, “যে AI-তে জিতবে, সেই জিতবে”—এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া চলবে না।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও সব কণ্ঠ এক সুরে বাঁধা নয়। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, প্রশাসন “স্মার্টলি” নিয়ন্ত্রণ চাইছে, তবে এমন নিয়ম চান না যা আমেরিকার AI-প্রতিযোগিতায় অবস্থান দুর্বল করে দেয়। কংগ্রেসেও মতভেদ স্পষ্ট—ডেমোক্র্যাটিক নেতা হাকিম জেফ্রিস দ্রুত পদক্ষেপের ডাক দিলেও, স্পিকার মাইক জনসন মনে করেন তড়িঘড়ি নিয়ন্ত্রণ চাপালে চিনের কাছে প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।
এই বিতর্কের মধ্যেই কিছু শিল্পনেতা নিজেরাই নিয়ন্ত্রণের পক্ষে সওয়াল করছেন। Anthropic-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ক্লার্ক যেমন বলেছেন, সূচকীয় হারে (exponentially) বাড়তে থাকা প্রযুক্তির প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখানোর জন্য দেরি হয়ে গেলে তা সবচেয়ে বিপজ্জনক। সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসও দায়িত্বশীলভাবে AI-উন্নয়নের গতি কমানো এবং ফেডারেল নজরদারির দাবি তুলেছেন।
বেইজিংয়ের ভিন্ন সুর
চিনের প্রতিক্রিয়া একেবারে অন্যরকম। মার্কিন প্রযুক্তি-নেতাদের এই সতর্কবার্তাকে বেইজিং বর্ণনা করেছে “কোল্ড ওয়ার প্লেবুক” থেকে উদ্ভূত “ভীতি ছড়ানোর” কৌশল হিসেবে, যার লক্ষ্য চিনকে পিছিয়ে রাখা। চিনা পররাষ্ট্র মন্ত্রকের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ভীতি প্রদর্শন, সংঘাত আর অসুস্থ প্রতিযোগিতা বিশ্ব AI-শাসন ব্যবস্থার কোনো উপকারে আসবে না। একই সঙ্গে চিন খোলা-উৎস (open source) মডেল ও বৈশ্বিক সহযোগিতার পক্ষে সওয়াল করছে, প্রস্তাব দিয়েছে একটি বৈশ্বিক AI-শাসন চুক্তিরও—যদিও তার বিস্তারিত রূপরেখা এখনও স্পষ্ট নয়।
এই মতপার্থক্যের প্রেক্ষাপটেই আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ওয়াশিংটনে ট্রাম্প-শি জিনপিং শীর্ষ বৈঠক হওয়ার কথা, যেখানে AI অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠবে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মার্কিন কংগ্রেসের একাংশ চিনের কাছে উন্নত চিপ পৌঁছানো ঠেকাতে আরও কড়া রপ্তানি-নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলছে।
সব মিলিয়ে ছবিটা কী দাঁড়াচ্ছে
একদিকে ল্যাবের ভেতর থেকে গবেষকরা বলছেন, ঝুঁকি এতটাই বেশি যে এখনই লাগাম টানা দরকার। অন্যদিকে রাজনৈতিক ময়দানে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটা জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে—আমেরিকা ভাবছে নিয়ন্ত্রণ মানেই চিনের কাছে সুবিধা তুলে দেওয়া, আর চিন সেই উদ্বেগকেই দেখছে আমেরিকার প্রযুক্তি-আধিপত্য টিকিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে। ফলে নিরাপত্তা বনাম প্রতিযোগিতা—এই টানাপোড়েনেই আপাতত আটকে আছে বিশ্বব্যাপী AI-নিয়ন্ত্রণের ভবিষ্যৎ।
