হারিয়ে যাচ্ছে হাওড়ার শিল্প-গৌরব, বন্ধ কারখানার ভিড়ে ফিকে বিশ্বকর্মা পুজোর উৎসব
সংবাদদাতা, হাওড়া: কথায় বলে, হাওড়া হল বাংলার শেফিল্ড। একটা সময় ছিল যখন হাওড়া শহরকে বলা হতো ইংল্যান্ডের শেফিল্ড নগরী। ভারতের শিল্প মানচিত্রে হাওড়ার নাম ছিল উজ্জ্বল। লোহা-লক্কর, ফাউন্ড্রি, ঢালাই, লেদ মেশিন, নাট-বল্টু তৈরির ছোট-বড় হাজার হাজার কারখানায় গমগম করত গোটা হাওড়া শহর। ভোর হলেই কারখানার সাইরেন, হাজার হাজার শ্রমিকের সাইকেলের ঘণ্টা, আর যন্ত্রের শব্দে জেগে উঠত শহর। রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকে, এমনকী বিহার, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড থেকেও হাজার হাজার মানুষ আসতেন হাওড়ায় কাজের জন্য। এই শহরই ছিল বহু পরিবারের অন্নদাতা। আর সেই সময় বিশ্বকর্মা পুজো ছিল হাওড়ার প্রধান উৎসব। দুর্গাপুজোর থেকেও বেশি জাঁকজমক ছিল বিশ্বকর্মা পুজোয়। প্রতিটি কারখানায় বিশাল প্রতিমা, আলোর রোশনাই, মাইকে গান, শ্রমিকদের নতুন জামা, মালিকের তরফে ভুরিভোজ – এক কথায় উৎসবের চেহারা নিত গোটা শিল্পাঞ্চল।
কিন্তু আজ সেই ছবিটা পুরোটাই বদলে গেছে। হাওড়ার অধিকাংশ কলকারখানাই আজ বন্ধ। কোথাও মরচে ধরা গেটে তালা ঝুলছে, কোথাও কারখানা বিক্রি করে মালিক চলে গেছেন অন্য ব্যবসায়। যে কয়েকটি কারখানা টিকে আছে, তারাও ধুঁকছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্বকর্মা পুজোয়। এখন আর বড় প্রতিমা এনে, প্যান্ডেল করে পুজো করার ক্ষমতা নেই বেশিরভাগ মালিকের। অনেক কারখানাতেই এখন শুধু নিয়মরক্ষার জন্য ঘট পুজো করা হচ্ছে।
কারখানা মালিকদের অভিযোগ, কাঁচামালের আকাশছোঁয়া দাম, বিদ্যুতের বিল বৃদ্ধি এবং কাজের অভাবই এই শিল্প বন্ধের মূল কারণ। একজন কারখানা মালিক জানান, ‘আগে যে লোহা ৩০ টাকা কেজি ছিল, এখন তা ৭০ টাকা। কিন্তু আমরা কাজের যে দাম পাই, তা বাড়েনি। ফলে কারখানা চালিয়ে লোকসান হচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছেন।’ তাঁদের আক্ষেপ, একসময় যেখানে ১০০ জন শ্রমিক কাজ করতেন, এখন সেখানে ৫-৭ জনকে নিয়ে কোনও রকমে টিকে থাকতে হচ্ছে।
তাই তাঁদের একটাই দাবি, হাওড়ার এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে বাঁচাতে সরকার যেন নজর দেয়। সরকারি সহযোগিতা পেলে হয়তো আবার ঘুরে দাঁড়াবে হাওড়ার শিল্প, ফিরবে বিশ্বকর্মা পুজোর সেই হারানো জৌলুস। নতুন সরকারের কাছে তাঁদের প্রত্যাশা অনেক।
