মানবিক দিবসের ভাবনা: মানুষ মানুষের জন্য
আমাদের আজকের পৃথিবী হিংসায় দীর্ণ। আধিপত্যবাদ, যুদ্ধ, রক্তপাত এসবই যেন আজ ভাগ্যলিখন হয়ে উঠেছে। তবে সেটাই শেষ কথা হতে পারে না। যে পৃথিবীতে যুদ্ধ আছে, সেখানে মানবিকতার স্পর্শও আছে। যে পৃথিবীতে বোমা পড়ে, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে গুঁড়িয়ে যায় শহর, সেখানে কেউ না কেউ ছুটে এসে আহত মানুষটির দিকে হাত বাড়িয়ে দেন। যে পৃথিবীতে ঘর ভেঙে যায়, সেখানে কেউ না কেউ আশ্রয়হীন শিশুটির মাথায় ছাদ তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। নিরন্ন মানুষের দিকে কেউ না কেউ খাবার এগিয়ে দেন। সেই মানুষগুলিই মানবতার শেষ ভরসা। তাঁদের ভালোবাসার ছোঁয়ায় এখনও টিকে রয়েছে পৃথিবীর সৌন্দর্যটুকু।
আজ ১৯ আগস্ট বিশ্ব মানবিক দিবস। দিনটি শুধু মানবিক কর্মীদের স্মরণ করার দিন নয়, এটি আসলে আত্মসমীক্ষার দিন। মানুষের বিপদে আমরা কি সত্যিই মানুষের পাশে দাঁড়াই? আমরা কি ভুলে গেছি কামিনী রায়ের সেই বিখ্যাত কবিতা, ‘সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।’
২০০৩ সালের ১৯ আগস্ট বাগদাদে রাষ্ট্রসঙ্ঘের ক্যানাল হোটেলে বোমা হামলায় ২২ জন মানবিক সহায়তা কর্মী প্রাণ হারিয়েছিলেন। তাঁদের আত্মত্যাগের স্মরণেই এই দিনটি আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হয়। ২৩ বছর পরেও প্রশ্নটি আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা আজ আর্তদের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে যাওয়া মানুষটিও নিরাপদ নন। যুদ্ধক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিক যেমন আক্রান্ত হচ্ছেন, তেমনই আক্রান্ত হচ্ছেন তাঁদের সাহায্য করতে যাওয়া মানবিক কর্মীরাও।
আজ পৃথিবীর নানা প্রান্তে যুদ্ধ, সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি ও প্রাকৃতিক বিপর্যয় মানুষের জীবনকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে মানবিকতার অর্থ আরও বড় হয়ে উঠেছে। তাই লক্ষ্য হল শুধু ত্রাণ দেওয়া নয়, মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা। শুধু জীবন বাঁচানো নয়, মানুষের বাঁচার অধিকার রক্ষা করা। এই পরিপ্রেক্ষিতে মানবিকতা কোনও ধর্মের বা দেশের অথবা রাজনৈতিক মতাদর্শের ওপর নির্ভর করে না। ক্ষুধার্ত মানুষটির ধর্ম জিজ্ঞাসা করে খাবার দেওয়া মানবিকতা নয়। আহত মানুষটির পরিচয় জেনে তার শুশ্রূষা করা মানবিকতা নয়। বিপন্ন শিশুটির নাগরিকত্ব যাচাই করে তাকে বাঁচানোও মানবিকতা নয়। মানুষের বিপন্নতাই তার সবথেকে বড় পরিচয়, সব থেকে বড় অসহায়তা। তাই তথাকথিত সভ্য পৃথিবীর মৌলিক দায়িত্ব হল, আন্তর্জাতিক মানবিক আইনকে সম্মান করা, সাধারণ নাগরিক ও মানবিক কর্মীদের সুরক্ষা দেওয়া এবং মানবিক সহায়তার পথকে নিরাপদ রাখা।
মানবিক দিবসের শপথ হতে পারে, যে কোনও সংকটে মানুষকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। কেননা ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভূতি কী মানুষ পেতে পারে না!’ হায়রে পৃথিবী! এখানে বন্ধুর থেকে শত্রুর সংখ্যা বেশি, এখানে মানবিকতাকে প্রতি মুহূর্তে হারিয়ে দিচ্ছে বিদ্বেষ।
আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধের ও হিংসার পটভূমিকায় দেখা যাচ্ছে, মানবিক সহায়তা কর্মীরা পর্যন্ত নিরাপদ নন। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে যুদ্ধদীর্ণ অঞ্চলে ত্রাণকর্মীদের ওপর হামলার সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। চিকিৎসক, শুশ্রূষাকর্মী, ত্রাণ সরবরাহকারী সহ অনেকেই নিরপেক্ষভাবে মানবিক কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। দেখা গিয়েছে এবছর বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর মোট ৯১৪টি আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে এবং তাতে ৯১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত দশ বছরের হিসাব ধরলে দেখা যাবে, যত মানবিক কর্মীর মৃত্যু ঘটেছে, তাঁদের মধ্যে ৯০ শতাংশ মানুষই স্বাস্থ্যকর্মী। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
