বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নয়, মানবিক স্পর্শের নামই শিক্ষকতা

05 September, 2026 12:36 PM UTSAB RC
শেয়ার করুন

সন্দীপন বিশ্বাস

আজ শিক্ষক দিবস। প্রতি বছর এই দিনটিতে আমরা শিক্ষকদের শ্রদ্ধা জানাই। সব স্কুলেই নানা ধরনের অনুষ্ঠান হয়। ছাত্রছাত্রীরা প্রিয় শিক্ষকের হাতে ফুল তুলে দেয়। সামাজিক মাধ্যমে ভেসে আসে অসংখ্য শুভেচ্ছাবার্তা। কিন্তু এই আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা জানানোর মধ্যেই আজ একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সমাজের মধ্য থেকেই ক্রমশ উঠে আসছে। বর্তমান সময়ে শিক্ষক দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য কতটা?

কেন এমন প্রশ্ন? উত্তরটা লুকিয়ে আছে আমাদের চারিদিকে। স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ চোখে সেদিকে তাকালে আর কোনও দ্বন্দ্ব থাকে না। একদিকে আমরা শিক্ষককে জাতি গঠনের কারিগর বলি। অন্যদিকে দেখি শিক্ষাক্ষেত্রে অরাজকতার ছায়া। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কোথাও ছাত্রসংখ্যা কম, কোথাও শিক্ষক নেই, কোথাও পরিকাঠামোর অভাব। বহু স্কুল ভবন আজ নিরাপদ নয়। নেই শক্তপোক্ত ছাদ, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ, পানীয় জল কিংবা শৌচাগারের মতো ন্যূনতম সুবিধা। শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার হওয়ার কথা। অথচ আমরা ছাত্রদের একটি উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষ সবক্ষেত্রে দিতে পারিনি। এমন পরিস্থিতে শুধু শিক্ষককে সম্মান জানিয়ে কি আমরা আমাদের দায়িত্ব শেষ করতে পারি? তাই যদি হয়, তবে সেটা ভঙ্গি দিয়ে মন ভোলানোর প্রয়াস।

আরও বড় সংকট দেখা দিয়েছে শিক্ষক নিয়োগকে ঘিরে। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দীর্ঘ আইনি জটিলতার অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি কেবল চাকরিপ্রার্থীদের নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গোটা শিক্ষাব্যবস্থা।

একজন যোগ্য তরুণ বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় থাকেন। অন্যদিকে বহু স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। কোথাও একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয় পড়াতে হয়, কোথাও একজনের কাঁধে চাপানো হয় প্রশাসনিক কাজের পাহাড়। ফলে প্রশ্ন ওঠে, আমরা কি সত্যিই শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি, নাকি শিক্ষা আমাদের কাছে শুধুই একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রকল্প?

একটি শিশুর কাছে শিক্ষক প্রথম এমন একজন মানুষ, যিনি তাকে পরিবারের বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। শিক্ষক শুধু অঙ্ক শেখান না; শেখান যুক্তি। ইতিহাস শেখান না, শেখান অতীতকে ভালোবাসতে। শুধু ভাষা শেখান না, শেখান নিজের কথা বলতে। শুধু পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করেন না, প্রস্তুত করেন জীবনে মাথা তুলে দাাঁড়ানোর জন্য। সেই কারণেই শিক্ষকতা অন্য পেশার থেকে কিছুটা স্বতন্ত্র। এখানে পেশার সঙ্গে একটা ব্রতও থাকে।

আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে দেখা যাচ্ছে, ছাত্র ও শিক্ষকের সম্পর্কের মধ্যে জটিলতা বাড়ছে। একসময় শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্কের মধ্যে ছিল দূরত্ব। সেই দূরত্বের মধ্যে ছিল ভয়, শ্রদ্ধা এবং এক ধরনের কর্তৃত্ব। আজ পৃথিবী বদলেছে। আজকের ছাত্রের হাতে স্মার্টফোন আছে। ইন্টারনেটে মুহূর্তের মধ্যে সে এমন তথ্য পেয়ে যেতে পারে, যা একসময় শিক্ষকের বইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে শিক্ষক আর তথ্যের একমাত্র উৎস নন। এই পরিবর্তন শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ককে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে।

তাই পরিপ্রেক্ষিত বদলেছে। আজকের শিক্ষককে শুধু জ্ঞান বিতরণ করলেই চলে না, তাঁকে হতে হয় পথপ্রদর্শক। ছাত্রের হাতে তথ্যের পাহাড় থাকতে পারে, কিন্তু কোন তথ্য সত্য, কোনটি মিথ্যা, কোনটি প্রয়োজনীয়, কোনটি বিপজ্জনক— সেই বিচারবোধ তৈরি করে দিতে হবে শিক্ষককে।

ছাত্রদের দিক থেকেও একবার বিষয়টি দেখা দরকার। বর্তমানে তাদের মানসিক চাপ বেড়েছে, প্রতিযোগিতা বেড়েছে, সামাজিক মাধ্যম তাদের জীবনকে আরও প্রকাশ্য এবং অনিশ্চিত করেছে। পরিবারের প্রত্যাশা, পরীক্ষার চাপ, ক্যারিয়ারের দুশ্চিন্তা। সব মিলিয়ে আজকের ছাত্রজীবন আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

অন্যদিকে শিক্ষকরাও নানা চাপের মধ্যে রয়েছেন। ফলাফল দেখানোর চাপ, প্রশাসনিক কাজ, অভিভাবকের প্রত্যাশা, ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার বাধ্যবাধকতা। সব মিলিয়ে শিক্ষকও আজ এক কঠিন কর্মপরিবেশের মধ্যে কাজ করেন।

শিক্ষা ব্যবস্থার এই গোলোকধাঁধাঁয় একজন শিক্ষক ভাবেন, ছাত্র তাঁকে যথেষ্ট সম্মান করছে না। ছাত্র ভাবে, শিক্ষক তাকে বুঝতে চাইছেন না। এই ভুল বোঝাবুঝির মাঝখানে হারিয়ে যাচ্ছে সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দটি। সেটা হল বিশ্বাস।

আজ আমাদের বুঝতে হবে, তাহলে শিক্ষার সংকটটা কোথায়? এক কথায় বলা যায়, শিক্ষা যেদিন থেকে পণ্য হিসাবে গণ্য হয়েছে, সেদিন থেকেই তার লক্ষ্য ঘুরে গিয়েছে এবং সংকটকে ডেকে এনেছ। শিক্ষা ক্রমশ একটি বাজারে পরিণত হচ্ছে। নম্বর, র‍্যাঙ্কিং, প্যাকেজ, প্লেসমেন্ট— এই শব্দগুলি শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্যকে ক্রমশ আড়াল করছে। অভিভাবকের প্রশ্ন, ছেলে বা মেয়ে কত নম্বর পেল? কোন চাকরি পাবে? কত টাকা উপার্জন করবে?

এই প্রশ্নগুলি কি সত্যই অস্বীকার করা যায়? না যায় না। কিন্তু এর মধ্যে আর একটি প্রশ্ন হারিয়ে যাচ্ছে। সেটাকে আমরা কেউই খোঁজার চেষ্টা করছি না। সেটা হল, সে কেমন মানুষ হয়ে উঠছে? এই শিক্ষা ব্যবস্থা তাকে কতটা সংবেদনশীল করে তুলছে! সে সামগ্রিক সমাজভাবনা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে না তো? চাকরি, উন্নতি, অর্থ উপার্জন— এসবের বাইরে যে একটা সহমর্মী মন থাকে, সেটাকে সে বর্জন করছে না তো?

শিক্ষার উদ্দেশ্য অবশ্যই চাকরি। কিন্তু সেই লক্ষ্যে দৌড়াতে গিয়ে আমরা যেন কখনওই মূল্যবোধকে ব্যবহৃত ঠোঙার মতো ছুঁড়ে ফেলে না দিই। কেননা শিক্ষার মূল্য অনেক বড়।

শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়। অন্যের মতকে সম্মান করতে শেখায়। ব্যর্থতাকে গ্রহণ করতে শেখায়। বিজ্ঞানমনস্ক হতে শেখায়, আবার শিল্প ও সাহিত্যকে ভালোবাসতে শেখায়। সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষা মানুষকে মানুষ হতে শেখায়। এই কাজটি কোনও অ্যাপ, কোনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা কোনও ডিজিটাল স্ক্রিন সম্পূর্ণভাবে করতে পারবে না। প্রযুক্তি তথ্য দিতে পারে। কিন্তু মানুষের চোখের জল বুঝতে পারে না সব সময়। একটি ভীত ছাত্রের কাঁধে হাত রেখে বলতে পারে না, ‘ভেঙে পড়ো না, তুমিও পারবে।’ সেই মানবিক স্পর্শের নামই শিক্ষকতা।

 

প্রতিবেদন

UTSAB RC