বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

কেন শ্রীকৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল কারাগারের অন্ধকারে?

04 September, 2026 12:12 PM UTSAB RC
শেয়ার করুন

আজ জন্মাষ্টমী। ভারতীয় সভ্যতার ইতিহাসে এই দিনটি শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের দিন নয়, এ এক অসাধারণ প্রতীকের দিন। কারণ যে শিশুর জন্মের কথা আজ কোটি কোটি মানুষ আনন্দে স্মরণ করে, তাঁর জন্ম হয়েছিল রাজপ্রাসাদের আলোয় নয়, কারাগারের অন্ধকারে। তিনি শ্রীকৃষ্ণ। তাঁকে ভারতীয় সংস্কৃতিতে শুধু দেবতা হিসেবে নয়, এক অসাধারণ পুরুষ, রাষ্ট্রচিন্তক, কূটনীতিবিদ, দার্শনিক, প্রেমিক, বন্ধু এবং মানবজীবনের গভীরতম সত্যের ব্যাখ্যাকার হিসেবে স্মরণ করা হয়।

কৃষ্ণের জন্মের সময়টি ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার কাল। ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিল ভয়। মথুরার রাজা কংস নিজের ক্ষমতা রক্ষার জন্য এতটাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে উঠেছিলেন যে, নিজের বোন দেবকীকেও বন্দি করতে তাঁর দ্বিধা হয়নি। ভবিষ্যদ্বাণীর ভয়ে তিনি একের পর এক নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করেছিলেন। কংস ছিলেন এমন একজন অত্যাচারী শাসক, যিনি ক্ষমতা ছাড়া আর কিছু বোঝেন না। নিজের সিংহাসন রক্ষার জন্য মানবিকতা, সম্পর্ক এবং নৈতিকতার মূল উপড়ে ফেলেছিলেন তিনি। তিনি হয়ে উঠেছিলেন হিংসা ও স্বৈরতন্ত্রের প্রতিভূ।

এই প্রেক্ষাপটে কৃষ্ণের জন্ম। তাই তা অত্যন্ত তাৎপর্যবাহী। তিনি জন্মেছিলেন এমন এক সময়ে, যখন সমাজের মানুষ বুঝতে শুরু করেছিল, শক্তি যদি ন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে সেই শক্তি অত্যাচারে পরিণত হয়। রাজক্ষমতা যদি মানুষের জন্য না হয়, তবে রাজা জনগণের রক্ষক নন, তিনি ভয়ের প্রতীক। কংস সেই ভয়ের প্রতীক। আর কৃষ্ণের আবির্ভাব ছিল সেই ভয়ের বিরুদ্ধে মানুষের চিরন্তন প্রতিরোধের প্রতীক। শ্রীকৃষ্ণের জন্ম তাই একটা সোচ্চার প্রতিবাদ, স্বৈরাচারের ভিতকে উপড়ে ফেলার শক্তি।

আর একটি বিষয় এই প্রেক্ষিতে অত্যন্ত তাৎপযৎপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেটা হল কৃষ্ণের জন্ম কারাগারে। কারাগার কী? কারাগার হল স্বাধীনতার বিপরীত প্রতীক। সেখানে মানুষের শরীর বন্দি থাকে, তার চলার পথ রুদ্ধ থাকে, চারদিকে প্রহরা থাকে, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত থাকে। কারাগার মানে অন্ধকার, অসহায়তা এবং ক্ষমতার নির্মম উপস্থিতি। সেই কারাগারেই জন্ম নিলেন কৃষ্ণ।

এই প্রতীকের মধ্যেই যেন ভারতীয় ভাবনার এক গভীর সত্য লুকিয়ে আছে। তাঁর জন্ম হল অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো। কৃষ্ণের জন্ম তাই শুধু একজন শিশুর জন্ম নয়। এটি অত্যাচারের ভিতর থেকে মুক্তির সম্ভাবনার জন্ম। বন্দিত্বের মধ্যে স্বাধীনতার স্বপ্নের জন্ম। ভয়ের মধ্যে সাহসের জন্ম।

দেবকী ও বসুদেব তখন বন্দি। তাঁদের হাত-পা শৃঙ্খলিত। কিন্তু ইতিহাসের এক আশ্চর্য সত্য হল, শরীরকে বন্দি করা যায়, ভবিষ্যৎকে নয়। কংস কারাগারের দরজা বন্ধ করতে পেরেছিলেন, কিন্তু যে সময়ের জন্ম আসন্ন, তাকে আটকাতে পারেননি। এই কারণেই কৃষ্ণের জন্মকাহিনি আমাদের আজও এত গভীরভাবে স্পর্শ করে। সেই জন্ম যেন আর এক নব দর্শনের জন্ম দিয়ে যায়।

কৃষ্ণ কোনও একমাত্রিক চরিত্র নন। তিনি শুধু বাঁশি বাজানো বৃন্দাবনের রাখাল নন। তিনি শুধু গোপীদের প্রিয় কৃষ্ণ নন। তিনি শুধু মহাভারতের রথের সারথিও নন। তিনি জীবনের বহুমাত্রিকতার প্রতীক। শৈশবে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন। যৌবনে তিনি প্রেমকে দিয়েছেন এক অনন্য সাংস্কৃতিক ব্যঞ্জনা। রাজনীতিতে তিনি দেখিয়েছেন দূরদর্শিতা। বন্ধুত্বে তিনি ছিলেন নিঃস্বার্থ। আর কুরুক্ষেত্রে তিনি মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন জীবনের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন, কর্তব্য কী? ন্যায় কী? এবং সংকটের মুহূর্তে মানুষ কীভাবে সিদ্ধান্ত নেবে?

এই কারণেই তাঁকে বলা হয় পুরুষোত্তম। পুরুষোত্তম কাকে বলে? মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের এক আদর্শ। এমন এক মানুষ, যিনি জীবন থেকে পালিয়ে যান না। যিনি সংসারকে অস্বীকার করেন না। যিনি প্রেম করেন, যুদ্ধের বাস্তবতা বোঝেন, রাজনীতি করেন, বন্ধুর পাশে দাঁড়ান, আবার প্রয়োজন হলে কঠিন সিদ্ধান্তও নেন। কৃষ্ণের জীবন আমাদের শেখায়, নৈতিকতা মানে সব সময় নিষ্ক্রিয় কোমলতা নয়। কখনও কখনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই নৈতিকতার সবচেয়ে বড় প্রকাশ।

কংসের কারাগারে জন্ম নেওয়া সেই শিশুর জীবনের পথ শেষ পর্যন্ত কেবল ব্যক্তিগত মুক্তির গল্প হয়ে ওঠেনি। কৃষ্ণের জীবন ভারতীয় সমাজকে এক নতুন চিন্তার দিকে নিয়ে গিয়েছিল। ধর্মকে তিনি কেবল আচার বা প্রথার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর দর্শনে ধর্ম হয়ে উঠেছে কর্তব্য, ন্যায় এবং মানুষের বৃহত্তর কল্যাণের প্রশ্ন।

এই কারণেই জন্মাষ্টমী শুধু মন্দিরের উৎসব নয়। কেননা আজও কি আমাদের চারপাশে কংসের মতো ক্ষমতার অহংকার নেই? আজও কি ভয়ের কারণে সত্য অনেক সময় বন্দি হয়ে পড়ে না? আজও কি মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং ন্যায়ের প্রশ্ন আমাদের সামনে বড় হয়ে দাঁড়ায় না? যদি দাঁড়ায়, তবে মনে রাখতে হবে, কৃষ্ণের জন্মের তাৎপর্য আজও শেষ হয়ে যায়নি।

কারাগারের অন্ধকারে কৃষ্ণের জন্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্ধকার যত গভীরই হোক, তার মধ্যেও আলো জন্ম নিতে পারে। অত্যাচার যত শক্তিশালীই হোক, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্তিও জন্ম নেয়। এবং ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন অনেক সময় শুরু হয় সবচেয়ে অসহায় বলে মনে হওয়া মুহূর্ত থেকে। কারাগারের সেই অন্ধকার কক্ষে জন্ম নেওয়া কৃষ্ণ তাই শুধু একটি ধর্মের আরাধ্য নন। তিনি মানুষের চিরন্তন আশা। তিনি বুঝিয়েছেন, যেখানে অন্যায়, সেখানে তাঁর প্রয়োজন। যেখানে অন্ধকার সবচেয়ে গভীর, সেখানেই হয়তো নতুন কোনও কৃষ্ণ রয়েছেন জন্মের অপেক্ষায়। জন্মাষ্টমীর প্রাক্কালে পুরুষোত্তম শ্রীকৃষ্ণকে জানাই প্রণাম।

প্রতিবেদন

UTSAB RC