নেপালে মহাপ্রলয়: হিমালয় কি প্রতিশোধ নিচ্ছে?
বুধবার নেপালে বিপর্যয়ের ছবি দেখতে দেখতে আমাদের সকলের বুক নিশ্চয় কেঁপে উঠেছে। হিমালয়ের বুক থেকে হড়পা বান নেমে এসে জনপদকে ভাসিয়ে নিয়ে চলে গেল, মৃত্যুর অবতার হয়ে নেমে এল ধস আর পাথরের অবিরাম স্রোত। ভেঙে চুরমার বাড়ি, রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ প্রকল্প। বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে, শত শত মানুষ নিখোঁজ। এই মুহূর্তে উদ্ধারকাজই প্রথম কাজ। দুর্গতদের কাছে দ্রুত পৌঁছে দিতে হবে ত্রাণ। কিন্তু উদ্ধারপর্ব শেষ হওয়ার পর আমাদের একটি কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে। কেন বারবার এই বিপর্যয়? এ কি শুধুই প্রকৃতির রোষ? নাকি প্রকৃতির প্রতিশোধ? প্রকৃতিকে আমরা যেভাবে ক্রমাগত ক্ষতবিক্ষত করে চলেছি, তার পাল্টা ফল আমরা পাচ্ছি না তো?
নেপালের এবারের বিপর্যয়ের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, বরফ-পাথরের ধস নদীর গতিপথে বাধা তৈরি করেছে এবং হড়পা বানের সৃষ্টি করেছে। তাহলে তো দেখাই যাচ্ছে, এর সঙ্গে ভূতাত্ত্বিক অস্থিরতার সম্পর্ক রয়েছে। সুতরাং বৃহত্তর ছবিটা আরও উদ্বেগজনক। হিমালয় আজ এমন এক পরিবেশগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহের পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং চরম আবহাওয়া বিপদের স্বাভাবিক মাত্রাকেই বদলে দিচ্ছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের আধিপত্যবাদ। যেখানে উন্নয়নের নামে হিমালয়ের ওপর চলছে দারুণ নির্যাতন।
রাস্তা চাই, বিদ্যুৎ চাই, পর্যটন চাই, জলবিদ্যুৎ চাই। পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এ সবই সত্যি। কিন্তু প্রশ্ন হল, উন্নয়নের নামে পাহাড়ের সহনশীলতার সীমা আমরা বুঝছি তো?
নেপাল সরকারের নিজস্ব বিশ্লেষণেই বলা হয়েছে, পাহাড় কাটা, অরণ্যকে সাফ করে দেওয়া, অপরিকল্পিতভাবে বাসস্থান নির্মাণ এবং অবৈজ্ঞানিক পরিকল্পনায় রাস্তা ও অন্যান্য নির্মাণ কিন্তু পাহাড় ধসের ঝুঁকি বাড়ায়। সেসব বিশ্লেষণকে থোড়াই কেয়ার করে নির্মাণ হয়েই চলেছে। উপায় নেই জনসংখ্যা বাড়ছে। চাপ বাড়ছে হিমালয়ের ওপর। অর্থাৎ প্রকৃতির বিপদকে অনেক সময় মানুষের কর্মকাণ্ডই আরও বিপজ্জনক করে তুলছে।
২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার পর যে সমীক্ষা হয়েছিল, সেখানে বলা হয়েছিল পাহাড়ের ঢাল ও নদীখাতে অনিয়ন্ত্রিত খননের জন্যই বিপর্যয়ের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এজন্য অবশ্য শুধু নেপালকে দোষারোপ করে লাভ নেই। হিমালয় সংলগ্ন সব দেশই এই একই কাণ্ড ঘটিয়ে চলেছে। মনে রাখা দরকার, হিমালয় কেবল পর্যটন ক্ষেত্র বা তুষারঢাকা শৃঙ্গ নয়। এই পর্বতমালা কোটি কোটি মানুষের জল, কৃষি, নদী ও জীবনের সঙ্গে যুক্ত। হিমালয়ের উপরে যে পরিবর্তন শুরু হয়, তার অভিঘাত বহু দূরের সমতলেও পৌঁছতে পারে।
আজ নেপাল বিপন্ন। কিন্তু কাল উত্তর ভারত, ভুটান, তিব্বত বা বাংলাদেশের নদী অববাহিকা অন্য কোনও বিপদের মুখে পড়তে পারে। হিমালয় কোনও রাজনৈতিক সীমান্ত মানে না। আর তাই পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নটিকে আর বিলাসিতা হিসেবে দেখার সময় নেই।
অবশ্যই উন্নয়নের চাকা থামিয়ে দেওয়া কোনও স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। কিন্তু বুঝতে হবে প্রকৃতির ক্ষমতা, রক্ষা করতে হবে তার ভারসাম্য। সেইটুকু বুঝলে উন্নয়ন কখনও অভিশাপ হতে পারে না। আমরা বহুদিন ধরে প্রকৃতিকে জয় করার কথা বলেছি। পাহাড় কেটেছি, নদীর গতিপথ বদলেছি, জঙ্গল সরিয়েছি, নদীখাতের বালি-পাথর তুলেছি। তারপর যখন পাহাড় ধসে পড়ে, নদী ফুলে ওঠে, বরফের বাঁধ ভেঙে যায়, তখন তাকে বলি ‘প্রাকৃতিক বিপর্যয়’। কিন্তু কেন বারবার এই ধরনের বিপর্যয় ঘটে। কয়েকদিন সমীক্ষা চালিয়ে আবার আমরা তা ভুলে যাই। নেপালের এই বিপর্যয় তাই শুধু শোকের সংবাদ নয়, এটি অবশ্যই একটি সতর্কবার্তা। বুঝতে হবে, হিমালয়কে রক্ষা করা মানে শুধু নেপালকে রক্ষা করা নয়, এর ফলে রক্ষা পাবে দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎও।
