সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে দক্ষিণ মেরুর কাছেই বাসা বাঁধত ডাইনোসর! নতুন আবিষ্কারে চমকে গবেষকরা
ক্যালগেরি: আজ থেকে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর আগে গোটা পৃথিবী জুড়ে রাজত্ব করত নানা প্রজাতির ডাইনোসর। আন্টার্কটিকাতেও তাদের অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে আগেই। কিন্তু প্রশ্ন ছিল— অতটা ঠান্ডা এলাকাতেও কি তারা বাসা বেঁধে ডিম পাড়ত? সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, উত্তর হ্যাঁ— খুব ঠান্ডা এলাকাতেও ডিম পাড়তে পারত ডাইনোসরেরা, আর সেই ডিম ফুটে শাবকও বেরোত।
সত্যজিৎ রায়ের ‘টেরোড্যাকটিলের ডিম’ গল্পের কথা মনে পড়তে পারে অনেকেরই— যেখানে রহস্যময় অভিযাত্রী বদনবাবু শুনিয়েছিলেন উড়ন্ত ডাইনোসরের ডিম চুরির কাহিনি। বাস্তবে অবশ্য এবার যা মিলেছে, তা হিংস্র টেরোড্যাকটিলের নয়— বিশালদেহী অথচ শান্তশিষ্ট তৃণভোজী টাইটানোসরের ডিমের জীবাশ্ম। আর সেটিও মিলেছে এমন এক জায়গায়, যা বিজ্ঞানীরা এতদিন কল্পনাও করেননি— দক্ষিণ মেরু বৃত্তের গা ঘেঁষা এলাকায়।
দক্ষিণ আর্জেন্টিনায় সম্প্রতি পাওয়া গিয়েছে টাইটানোসরের ডিমের খোসার ২৫৫টি টুকরো। কার্বন ডেটিং অনুযায়ী এগুলি প্রায় ৬ কোটি ৮০ লক্ষ বছরের পুরনো। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হল, যে অঞ্চল থেকে এই ডিমের খোসাগুলি মিলেছে, তা পড়ে ৫৫-৬০ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশে— অর্থাৎ সাড়ে ৬৬ ডিগ্রি অক্ষাংশে অবস্থিত দক্ষিণ মেরু বৃত্তের খুব কাছেই।
জুরাসিক যুগের এই তৃণভোজী দানবের ওজন হত প্রায় ৭০ টন, কোনও কোনও ক্ষেত্রে তারও বেশি— আজকের দিনের প্রায় ১০টি হাতির সমান!
এতদিন পর্যন্ত টাইটানোসর বা অন্যান্য ডাইনোসর প্রজাতির যত ডিম বা ডিমের খোসা পাওয়া গিয়েছে, তার প্রায় সবই ছিল নিরক্ষীয় অঞ্চল বা তার আশপাশে— কারণ সেখানে উষ্ণতা বেশি থাকায় ডিম ফোটানো সহজ। যদিও মঙ্গোলিয়া, আমেরিকার টেক্সাস, দক্ষিণ আর্জেন্টিনা এমনকি আন্টার্কটিকাতেও ডাইনোসরের জীবাশ্ম মিলেছে আগে, কিন্তু তারা সেখানে সত্যিই বাসা বাঁধত কি না, তা স্পষ্ট ছিল না এতদিন। এই নতুন আবিষ্কার প্রথমবার প্রমাণ দিল যে, নিরক্ষরেখা থেকে বহু দূরের শীতল এলাকাতেও বাসা বাঁধতে পারত এই দানবাকৃতি প্রাণীরা।
গবেষণার নেতৃত্বে থাকা কানাডার ক্যালগেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্মবিদ ডারলা জ়েলেনিতস্কি জানিয়েছেন, জুরাসিক যুগের অধিকাংশ সরীসৃপের মতোই টাইটানোসরেরাও নিজেদের ডিমে নিজেরা তা দিত না। কিন্তু ডিম ফোটাতে দরকার হয় উষ্ণতার, আর দক্ষিণ মেরু বৃত্তের কাছাকাছি এলাকায় সূর্যের তাপ ছিল অনেক কম। এই সমস্যা সমাধানে বিশেষ এক কৌশল বের করেছিল তারা— গাছপালা ও মাটি দিয়ে তৈরি করত ঢিবির মতো বাসা, যার মধ্যে পুঁতে রাখত ডিম। গাছপালা পচনের সময় যে তাপ উৎপন্ন হত, সেটাই ডিম ফোটাতে সাহায্য করত।
এছাড়া ডিমের খোসায় থাকা ছোট ছোট ছিদ্রও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। গবেষকদের অনুমান, খোলা জায়গায় রাখলে ডিমগুলো শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত বলেই মাটি-বালি-গাছপালার আবরণে ঢেকে রাখা হত সেগুলো, যাতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় থাকে।এই আবিষ্কার সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘রয়্যাল সোসাইটি ওপেন সায়েন্স’ জার্নালে। দক্ষিণ মেরু বৃত্তের এত কাছে এই প্রথমবার ডাইনোসরের ডিমের সন্ধান মেলায়, বিজ্ঞানীদের ধারণা— এই আবিষ্কার ডাইনোসরদের পরিবেশ-অভিযোজন ক্ষমতা নিয়ে আগামী দিনে আরও গভীর গবেষণার পথ খুলে দিতে পারে।
