বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
বেলুড় মঠে মহাসাড়ম্বরে হয়ে গেল কুমারী পুজো পাঁজরে হাড় ভেঙে ফুসফুসে, চোরবাগানের ময়নাতদন্তের ভয়াবহ রিপোর্ট টাইগার শ্রফের উপর গুলি, হামলা, গ্রেপ্তার ৩ টাইগার শ্রফকে হামলায় দায়স্বীকার বিষ্ণোই গ্যাংয়ের

অভিযান শেষে ফিরল জাহাজ, অথচ ফিরলেন না ক্যাপ্টেন!

16 September, 2026 4:32 PM UTSAB RC
শেয়ার করুন

সন্দীপন বিশ্বাস

১৫২২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর, ভোরবেলা। স্পেনের দক্ষিণ উপকূলে সানলুকার দে বারামেদা বন্দরের জেলেরা যখন প্রথম জাহাজটি দেখল, তখন তারা বুঝতে পারেনি ঠিক কী দেখছে। একটা জীর্ণ, কাঠামো-ভাঙা জাহাজ, পাল ছেঁড়া, খোলে জল ঢুকে খানিকটা হেলে আছে। ডেকে হাঁটাচলা করা মানুষগুলো কঙ্কালের মতো রোগা, চামড়ার নীচে হাড় গোনা যাচ্ছে। এভাবেই ফিরলেন মাত্র আঠারোজন মানুষ। তিন বছর আগে দুশো সত্তরের বেশি মানুষ পাঁচটি জাহাজে চড়ে বেরিয়েছিল। তার মধ্যে মাত্র একটি জাহাজ এবং তাতে এই ক’জন মানুষ বেঁচে ফিরলেন।

জাহাজটির নাম ভিক্টোরিয়া। তার মধ্যে যাঁরা জীবিত অবস্থায় ফিরে এলেন, তাঁরা একটা কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলেছেন। তাঁরা পৃথিবীটাকে সম্পূর্ণ ঘুরে এসেছেন। সেই প্রথম এমন ঘটনা ঘটল। এই অভিযান থেকেই প্রমাণিত হয়েছিল পৃথিবীটা গোল। তার আগে সম্পূর্ণ পৃথিবী সম্বন্ধে কারও কোনও সম্যক ধারণা ছিল না। কিন্তু যে মানুষটির স্বপ্ন আর জেদ এই যাত্রার জন্ম দিয়েছিল, সেই ফার্দিনান্দ ম্যাগেলন তখন আর বেঁচে নেই। তিনি ফেরেননি। ফিরতে পারেননি।

ফার্দিনান্দ ম্যাগেলন। পর্তুগিজ নাবিক, কিন্তু নিজের দেশের রাজার কাছে তিনি অবহেলিত। বহুবার আবেদন করেও পর্তুগালের রাজা প্রথম মানোয়েলের কাছ থেকে কোনও নতুন অভিযানের অনুমতি পাননি তিনি। শেষে ১৫১৭ সালে ম্যাগেলন পর্তুগাল ছেড়ে স্পেনে চলে যান এবং সেখানকার তরুণ রাজা প্রথম কার্লোসের (পরবর্তীকালে সম্রাট পঞ্চম চার্লস) কাছে এক দুঃসাহসী প্রস্তাব রাখেন। তিনি বলেন, মশলার দ্বীপ অর্থাৎ মলুক্কাস, যেখান থেকে ইউরোপের ব্যবসায়ীরা লবঙ্গ-জায়ফল আনতেন, সেখানে পশ্চিমমুখী পথে পৌঁছানো সম্ভব। পূর্ব দিকে পর্তুগিজদের দখলে থাকা পথ এড়িয়ে, আটলান্টিক পেরিয়ে, দক্ষিণ আমেরিকার নীচ দিয়ে একটা প্রণালী খুঁজে বার করে পশ্চিম দিক থেকে এশিয়ায় পৌঁছানো যেতে পারে।

এমন কোনও প্রণালীর অস্তিত্ব তখনও কেউ নিশ্চিতভাবে জানতেন না। ম্যাগেলন নিজেও জানতেন না সেটা ঠিক কোথায়, কতদূরে। তবু কার্লোস তাঁর প্রস্তাবে রাজি হলেন। ১৫১৯ সালের ২০ আগস্ট পাঁচটি জাহাজ সেভিয়া থেকে যাত্রা শুরু করল। এগুলির নাম ছিল ত্রিনিদাদ, সান আন্তোনিও, কনসেপসিওন, সান্তিয়াগো আর ভিক্টোরিয়া। জাহাজের ক্রুদের মধ্যে ছিলেন নানা দেশের মানুষ। তাঁদের মধ্যে বিশিষ্ট ছিলেন ইতালীয় পর্যটক-লেখক আন্তোনিও পিগাফেত্তা। তাঁর লেখা দিনলিপি না থাকলে আজ অবশ্য সেই যাত্রার কিছুই জানা যেত না।

আটলান্টিক পেরিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূল ধরে যতই দক্ষিণে নামতে থাকল জাহাজগুলো, ততই আবহাওয়া কঠিন হতে লাগল। ১৫২০ সালের এপ্রিলে, পাতাগোনিয়ার উপকূলে পোর্ট সান হুলিয়ানে শীতকাল কাটানোর সময় ঘটল সেই অভিযানের সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত। তিনজন স্পেনীয় ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে বিদ্রোহ শুরু হল। তাঁরা মনে করতেন, একজন পর্তুগিজের হাতে স্পেনীয় নৌবহরের নেতৃত্ব থাকা উচিত নয়। তাছাড়া এই যাত্রার কোনও ভবিষ্যৎও নেই। তাঁরা জাহাজের পুরো কর্তৃত্ব কব্জা করতে চেয়েছিলেন। ম্যাগেলন নির্মম হাতে বিদ্রোহ দমন করলেন। একজন ক্যাপ্টেনকে হত্যা করা হল, আরেকজনকে ফাঁসি দেওয়া হল, দু’জনকে সেই জনমানবহীন উপকূলেই ফেলে রেখে বাকি নৌবহর এগিয়ে গেল। এর কিছুদিন পরে সান্তিয়াগো জাহাজটি এক অভিযানে নষ্ট হয়ে যায়, যদিও প্রাণহানি হয়নি।

অবশেষে, ১৫২০ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে, দক্ষিণ আমেরিকার একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে সেই বহু আকাঙ্ক্ষিত জলপথ খুঁজে পাওয়া গেল। আজ সেটাকেই আমরা ‘ম্যাগেলন প্রণালী’ নামে চিনি। এটা চিলির দক্ষিণ প্রান্তে দক্ষিণ আমেরিকার মূল ভূখণ্ড এবং তিয়েরার দেল ফুয়েগো দ্বীপপুঞ্জের মাঝে অবস্থিত। এই প্রণালী যুক্ত করেছে আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে। ম্যাগেলন তাঁর অভিযানের সময় এই প্রণালীর নাম রেখেছিলেন ‘এস্ত্রেচো ডি টোডোস লস সান্তোষ’ বা ‘সমস্ত প্রণালীর মধ্যে সেরা প্রণালী’। পরে অবশ্য পঞ্চম চার্লস এই প্রণালীর নামকরণ করেন ম্যাগেলনের নামেই।

সেই প্রণালী পেরোনোর সময়েই সান আন্তোনিও জাহাজের একদল নাবিক পালিয়ে স্পেনে ফিরে যায়। বাকি তিনটি জাহাজ নিয়ে ম্যাগেলন পা রাখলেন এক বিশাল, অচেনা সমুদ্রে। এই সমুদ্র এত শান্ত মনে হয়েছিল যে তিনি তার নাম দিলেন মার প্যাসিফিকো বা শান্ত সমুদ্র। অর্থাৎ প্রশান্ত মহাসাগর।

এই নামকরণ ছিল এক মর্মান্তিক পরিহাস। প্রশান্ত মহাসাগরের বিশালতার কোনও ধারণাই ইউরোপীয়দের ছিল না। ম্যাগেলন ভেবেছিলেন কয়েক সপ্তাহেই এশিয়ার কোনও দ্বীপে পৌঁছে যাবেন। বাস্তবে লাগল প্রায় চার মাস। আর এই চার মাস হয়ে উঠল অভিযানের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়। খাদ্য ফুরিয়ে গেল। পিগাফেত্তা লিখেছেন, ‘নাবিকরা পোকায় খাওয়া, গুঁড়ো হয়ে যাওয়া বিস্কুট খেয়েছেন, জাহাজের পাল বাঁধার চামড়ার ফালি ভিজিয়ে সেদ্ধ করে খেয়েছেন, ইঁদুর ধরে খাওয়ার জন্য তাঁদের চরম মূল্য দিতে হয়েছে। স্কার্ভি রোগে মাড়ি ফুলে দাঁত পড়ে যাচ্ছিল। একের পর এক নাবিক মারাও যাচ্ছিলেন। ঊনিশজন মানুষ মারা যান শুধু এই প্রশান্ত মহাসাগর পেরোনোর সময়েই।

১৫২১ সালের মার্চে অবশেষে দেখা মিলল ভূখণ্ডের। সেটা ছিল আজকের গুয়াম দ্বীপ, তারপর ফিলিপিন্স দ্বীপপুঞ্জ। এখানে এসে ম্যাগেলন স্থানীয় রাজা হুমাবোনকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করতে সফল হলেন। এরপরই নিজের ধর্মীয় উদ্যম আর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় তিনি জড়িয়ে পড়লেন। এর ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব বাধল।

সেবু দ্বীপের কাছেই ছোট্ট মাক্তান দ্বীপের প্রধান লাপু-লাপু ম্যাগেলনের প্রস্তাবিত আনুগত্য মানতে অস্বীকার করলেন। ম্যাগেলন স্থির করলেন, শক্তি দেখিয়ে তাঁকে বশ করবেন। ১৫২১ সালের ২৭ এপ্রিল, মাত্র ষাটজন সশস্ত্র লোক নিয়ে তিনি মাক্তানের সৈকতে নামলেন। প্রতিপক্ষ হিসাবে তখন দাঁড়িয়ে ছিল দেড় হাজারেরও বেশি স্থানীয় যোদ্ধা। আগ্নেয়াস্ত্র ছিল ম্যাগেলানের পক্ষে, কিন্তু জোয়ারের জলে সব ভিজে গিয়েছে। তাই জাহাজের কামান কাজে এল না। এদিকে ভারী বর্ম পরে লড়াই করতে হচ্ছিল অগভীর জলে দাঁড়িয়ে। বিষমাখা বাঁশের বর্শা আর তরোয়ালের আঘাতে একে একে ঘায়েল হলেন তাঁর সঙ্গীরা। পিগাফেত্তা লিখেছেন, ‘ম্যাগেলন শেষ পর্যন্ত পিছু হটার নির্দেশ দিয়েছিলেন, নিজে পিছনে থেকে সঙ্গীদের রক্ষা করছিলেন, আর ঠিক তখনই একটা বিষমাখা বর্শা তাঁর পায়ে বিঁধল। মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর তাঁকে ঘিরে ধরল যোদ্ধারা। যে মানুষটা পৃথিবীর অর্ধেকটা পাড়ি দিয়ে এসেছিলেন, তিনি নিজের লক্ষ্যের এত কাছে এসেও পৌঁছতে পারলেন না। সুতরাং মাক্তানের অগভীর জলে তাঁর যাত্রা শেষ হয়ে গেল।’

ম্যাগেলনের মৃত্যুর পর নেতৃত্বের বারবার বদল হতে গেল। তিনটি জাহাজের বহর কমতে কমতে একটিতে এসে ঠেকল। সম্বল তখন শুধুই ভিক্টোরিয়া। বাকি জাহাজগুলো হয় নষ্ট হয়ে গেল, নয়তো পুড়িয়ে ফেলা হল লোকবলের অভাবে। কোনওটা ফিরতি পথে প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে আমেরিকার দিকে চলে গেল। শেষ পর্যন্ত বাস্ক নাবিক হুয়ান সেবাস্তিয়ান এলকানোর নেতৃত্বে ভিক্টোরিয়া একাই মলুক্কাস দ্বীপপুঞ্জ থেকে মশলা বোঝাই করে ভারত মহাসাগর আর আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে ফেরার পথ ধরল। সেই পথ তখন পর্তুগিজদের একচেটিয়া দখলে। সেখানে ধরা পড়লে পরিণতি হতে পারত ভয়াবহ।

এই শেষ ধাপটাও কম কষ্টের ছিল না। খাদ্য ও পানীয় জলের সংকটে আরও অনেকে মারা গেলেন। কেপ ভার্দে দ্বীপপুঞ্জে জল আর খাবার সংগ্রহ করতে নামা তেরোজন নাবিককে পর্তুগিজরা বন্দি করে ফেলল। বাকিদের নিয়ে, প্রায় অনাহারে-অর্ধমৃত অবস্থায়, এলকানো শেষ পর্যন্ত জাহাজ ভেড়ালেন সেই বন্দরে, যেখান থেকে তিন বছর আগে যাত্রা শুরু হয়েছিল।

৬ সেপ্টেম্বর, ১৫২২। সানলুকার দে বারামেদায় ফিরলেন আঠারোজন ইউরোপীয় নাবিক। তাঁদের সঙ্গে ভিক্টোরিয়া জাহাজে মশলার বস্তা। শুধু এইটুকুই অবশিষ্ট ছিল। তার মধ্য দিয়েই তাঁরা ইতিহাস সৃষ্টি করলেন।

মানব ইতিহাসে প্রথমবার প্রমাণিত হল, পৃথিবীকে জলপথে সম্পূর্ণ প্রদক্ষিণ করা সম্ভব। কিন্তু যিনি এই স্বপ্নের জনক, যাঁর জেদ আর নেতৃত্বে এই যাত্রা সম্ভব হয়েছিল, তিনি নিজে সেই বিজয়ের মুহূর্তটা দেখে যেতে পারেননি। ইতিহাস তাঁকেই মনে রেখেছে প্রথম বিশ্বপরিক্রমাকারী হিসেবে। যদিও তিন চক্রটাকে নিজে সম্পূর্ণ করতে পারেননি। তবুও তিনিই তো প্রথম স্বপ্ন দেখে এই যাত্রা শুরু করেছিলেন। ইতিহাস তাঁকে মনে রেখেছে। কিন্তু এলকানো আর ভিক্টোরিয়ার সেই আঠারোজন ক্লান্ত, রোগজীর্ণ মানুষ, যাঁরা লড়াই করে বিধ্বস্ত অবস্থায় ফিরে এলেন, ইতিহাস তাঁদের মনেই রাখেনি।

প্রতিবেদন

UTSAB RC