চন্দ্রগ্রহণের কুসংস্কার পতন ডেকে এনেছিল একটা সাম্রাজ্যের
সন্দীপন বিশ্বাস
সেটা ছিল এক ভয়ঙ্কর রাত। কিন্তু সন্ধ্যা থেকে তার কোনও ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। রাত
তখন গভীর। সিসিলির আকাশে বিশাল এক রুপোলি চাঁদ। তার মায়াবী আলোয় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। সমুদ্রের
ধারে সারি সারি জাহাজ প্রস্তুত, পালে বাতাস লাগার অপেক্ষা মাত্র। শিবিরে টিমটিম করে জ্বলছে মশাল,
ক্লান্ত সৈন্যরা শুয়ে আছে বর্ম গায়ে দিয়ে। কাল সকালেই তারা ফিরে যাবে নিজেদের ঘরে। ঠিক তখনই
আকাশের দিকে তাকিয়ে এক সৈন্যের নিঃশ্বাস যেন আটকে গেল। চাঁদের কোণ থেকে একটা কালো ছায়া ধীরে
ধীরে গিলতে শুরু করেছে চাঁদকে।
মুহূর্তে খবর ছড়িয়ে পড়ল। এরপর শিবির জুড়ে শুরু হল ফিসফাস। সেই সঙ্গে বাড়তে লাগল আতঙ্ক। সকলেই
তাকিয়ে আকাশের দিকে। সেই রুপোলি চাঁদ ক্রমশ রক্তের মতো লাল হয়ে উঠল। তারপর প্রায় অন্ধকার।
চাঁদ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে চোখের সামনে থেকে। আতঙ্কে সকলেই হাঁটু গেড়ে বালিতে বসে হাত তুলে দেবতাদের
উদ্দেশে প্রার্থনা করতে লাগল। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে অর্থাৎ ৪১৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ২৭
আগস্টের সেই অভিশপ্ত রাত এথেন্সের গোটা একটা বাহিনীর ভাগ্য লিখে দিয়েছিল।
এথেন্স তখন এক পরাক্রমী নৌশক্তি। স্পার্টার সঙ্গে তারা দীর্ঘদিন ধরে পেলোপনেসীয় যুদ্ধে জড়িয়ে
ছিল। কারও কারও মাথায় এল এক দুঃসাহসী পরিকল্পনা। কেন শুধু গ্রিসেই যুদ্ধ সীমাবদ্ধ থাকবে?
সিসিলির ধনী নগররাষ্ট্র সিরাকিউজ দখল করা গেলে এথেন্সের সম্পদ আর প্রভাব বেড়ে যাবে বহুগুণ।
এথেন্সের সাধারণ সভায় যখন এই প্রস্তাব ওঠে, তখন একজন সেনাপতি উঠে দাঁড়িয়ে সতর্ক করেছিলেন।
তাঁর নাম নিকিয়াস। বয়স্ক, রক্ষণশীল, ধর্মভীরু এই সেনাপতি বলেছিলেন, ‘এত দূরে গিয়ে যুদ্ধ করা উচিত
হবে না।’ কিন্তু জনতার উন্মাদনার সামনে তাঁর কথা ধোপে টেকেনি। আর নিয়তির এমনই নিষ্ঠুর পরিহাস যে,
অভিযানের বিরোধিতা করলেও নেতৃত্বের ভার পড়েছিল তাঁর ওপরেই।
সিরাকিউজের উঁচু পাথুরে দেওয়াল। তার নীচে মাইলের পর মাইল ছড়িয়ে এথেনীয় শিবির। সবদিক থেকেই
এথেন্সের সেনারা এগিয়ে। কিন্তু দীর্ঘ দু’বছর ধরে যুদ্ধের পর অনেকেই ক্লান্ত। বাড়ির জন্য অনেকের মন
কেমন করছে। এবার তারা ঘরে ফিরতে চায়। তাছাড়া সেনাপতি নিকিয়াস অসুস্থ। শরীর ভেঙে পড়েছে দীর্ঘ
অভিযানের ধকলে। তবু তাঁকেই সিদ্ধান্ত নিতে হয় প্রতিদিন। স্পার্টা থেকে খাদ্য, অস্ত্র পৌঁছায়
সিরাকিউজে। সমুদ্রে এথেনীয় নৌবহর একের পর এক ধাক্কা খায়। এথেন্স থেকে এবার পাঠানো হয় দ্বিতীয়
একটি বাহিনী। সেটা দেমোস্থেনিসের নেতৃত্বে। উজ্জ্বল, তেজি, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ায় অভ্যস্ত তিনি।
কিন্তু ততদিনে সময় ফুরিয়ে এসেছে। দেমোস্থেনিস একরাতে চেষ্টা করেন সিরাকিউজের উঁচু এপিপোলাই
মালভূমি দখলের, রাতের অন্ধকারে বিশৃঙ্খল যুদ্ধে এথেনীয় বাহিনী নিজেরাই নিজেদের সৈন্যদের আঘাত
করে বসে। কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছিল না। সেই রাতের পর দেমোস্থেনিস বুঝে যান, আর দেরি নয়, এখনই
পালাতে হবে। তারই প্রস্তুতি চলছে। চলে যাবে এথেন্স বাহিনী। ওদিকে সিরাকিউজরাও খুব ক্লান্ত। তারাও
চায় এথেন্সের বাহিনী ফিরে যাক। এই রক্তক্ষয়ী লড়াই থেকে তারাও মুক্তি চায়।
দেমোস্থেনিস নিকিয়াসের কাছে গিয়ে প্রায় মিনতির সুরে বলেন, ‘এখনই আমাদের জাহাজে চড়ে ফিরে যাওয়া
উচিত, আর একটা দিনও অপচয় করা ঠিক নয়। বড় বিপদ ঘটতে পারে।’ নিকিয়াস সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।
অবশেষে চাপে পড়ে রাজি হন। জাহাজ প্রস্তুত হয়, সৈন্যরা গুছিয়ে নেয় জিনিসপত্র, ঘরে ফেরার স্বপ্নে
চোখ চকচক করে ওঠে সবার।
আর ঠিক সেই রাতেই, যাত্রার ঠিক প্রাক্মুহূর্তে, আকাশে ঘটে চন্দ্রগ্রহণ। আড়াই হাজার বছর আগে এই
জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা সম্পর্কে কারও ধারণা ছিল না। তাই সেই রাতে, সেই শিবিরে সেনারা আতঙ্কে
দিশাহারা হয়ে পড়েছিলেন। ইতিহাসবিদ থুকিডিডিস তাঁর History of the Peloponnesian War বইতে
লিখেছেন, সেনাপতি নিকিয়াস এবং সৈন্যরা ধরে নিয়েছিলেন, এটা কোনও দেবতার অভিশাপ। ধর্মভীরু
নিকিয়াস গণকদের ডেকে পাঠালেন। তাঁরা শাস্ত্র মিলিয়ে মত দিলেন, ‘এখনই যাত্রা করা ঠিক হবে না।
কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে হবে।’
কতদিন? গণৎকার বললেন, ‘তিনবার নয়’। এর অর্থ তিনের নয় গুণিতক বা সাতাশ দিন। কেন? কারণ এই
রোষ কাটানোর জন্য প্রয়োজন শুদ্ধিকরণের। গণৎকারের সেই নিদানে দমে গেলেন সেনারা। একদিকে
জাহাজ প্রস্তুত, বাতাস অনুকূল, পালানোর পথ খোলা। অথচ শুধু গেরো কাটানোর বিধানে আটকে গেল সব।
কিন্তু গেরো কাটানোর বদলে সেই সিদ্ধান্ত আরও বেশি করে বিপদ ডেকে আনল। সেই সাতাশ দিনের মধ্যেই
সিরাকিউজের সেনারা বন্দর অবরুদ্ধ করে ফেলে। তারা প্রতিটি বেরনোর রাস্তা অবরুদ্ধ করে দিতে করে
দিতে সক্ষম হয়। অর্থাৎ যে সময়টা বাঁচার একমাত্র সুযোগ ছিল, সেই সময়টাই হয়ে উঠল মৃত্যু-ফাঁদ। যেন
ইঁদুর কলে স্বেচ্ছাবন্দি হয়ে গেল এথেনীয় সেনারা।
এভাবে থাকা অসম্ভব। চুপ করে বসে থেকে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার মধ্যে কোনও বীরত্ব প্রকাশ পায় না।
জাহাজপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এথেনীয় বাহিনীর সামনে একটাই পথ খোলা ছিল। শত্রুর নজরদারি এড়িয়ে
রাতের অন্ধকারে স্থলপথ দিয়ে পালানো। সেইমতো হাজার হাজার সৈন্য আহত ও অসুস্থ সঙ্গীদের নিয়ে
রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে পড়ে। কিন্তু পথ অজানা। সেই মুহূর্তে তাদের পেছনে তাড়া করে সিরাকিউজ ও
স্পার্টার অশ্বারোহী বাহিনী। আক্রমণে প্রতি পদক্ষেপে ছিন্নভিন্ন করে দেয় পলায়নরত সেনাদের।
তবুও প্রাণের মায়ায় পালাতে পালাতে অনেকেই এসে পৌঁছায় আসিনারুস নদীর তীরে। ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কাতর
তারা। কয়েকদিন জল পর্যন্ত পান করতে পারেনি তারা। থুকিডিডিস লিখেছেন, সেনাদের তৃষ্ণা এতটাই তীব্র
ছিল যে, তারা একে অপরকে ধাক্কা মেরে নদীতে নেমে পড়ে। চারিদিকে শত্রু-সেনারা তাদের ঘিরে ফেলেছে।
চতুর্দকে তীর-বর্শার সারি। মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে তারা যেন বলতে চাইছিল, ‘হে মৃত্যু, আগে আমাদের একটু
জলপান করতে দাও। তারপর আমাকে তুমি স্পর্শ কোরো।’ কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল, জল ক্রমশ
লাল হয়ে উঠছে। আর সেই জলের মধ্যেই এক একজন করে সেনার দেহ ডুবে যাচ্ছে। যারা তখনও বেঁচে ছিল,
তারা সেই রক্তাক্ত জলই পান করতে লাগল।
বেঁচে থাকা সৈন্যদের বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হল সিরাকিউজের পাথরের খনিতে। খনি মানে অন্ধকার,তপ্ত
এক গহ্বর। সেখানে খাবার নেই, পর্যাপ্ত জলও নেই। দ্রুত রোগ ছড়িয়ে পড়তে থাকে। মাসের পর মাস
সেখানে বন্দি থাকায় অধিকাংশ সৈন্যেরই মৃত্যু হয়। নিকিয়াস আর দেমোস্থেনিস, দুই সেনাপতিকেই বন্দি
অবস্থায় হত্যা করা হয়।
এথেন্সের কাছে এই পরাজয় ছিল শুধু একটা যুদ্ধে হারের চেয়েও বেশি কিছু। তাদের ছিল সেরা নৌবহর,
প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী, বিপুল সম্পদ। তবুও শুধু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে পরাজয় ঠেকানো সম্ভব হল না।
ইতিহাসবিদরা মনে করেন, এই বিপর্যয়ই এথেন্সের পতনের প্রাথমিক ইঙ্গিত। এর ঠিক নয় বছর পর, ৪০৪
খ্রিস্টপূর্বাব্দে, পেলোপনেসীয় যুদ্ধে এথেন্স চূড়ান্তভাবে হার মানে স্পার্টার কাছে।
দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। আমরা এখন জানি চন্দ্রগ্রহণ ঠিক কোন নিয়মে ঘটে, কবে
হবে তাও বহু বছর আগে থেকে হিসেব কষে বলে দিতে পারি। অথচ প্রশ্নটা থেকেই যায়। আমরা কি সত্যিই
কুসংস্কারমুক্ত হয়েছি? আজও বহু ক্ষেত্রে যুক্তির বদলে অন্ধবিশ্বাস আমাদের পথ দেখায়। নিকিয়াসের
সেই রাতের ভুল আসলে একা তাঁর নয়, তা মানুষের চিরকালীন প্রবণতার এক জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি। প্রায়
আড়াই হাজার বছর আগে জ্যোতির্বিজ্ঞানের একটা ঘটনা বদলে দিয়েছিল একটা গোটা বাহিনীর ভাগ্য,
একটা সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ।
