বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

‘বন্দেমাতরম্’ বন্দনা সমস্ত ধর্মের ঊর্ধ্বে

15 August, 2026 5:35 AM admin
শেয়ার করুন

সায়ন্তন মজুমদার : জননী এবং জন্মভূমি, উভয়কেই বরাবর স্বর্গাদপি গরীয়সী মনে করেছে এই ভারত। বন্দেমাতরম্ গানের অভিযাত্রা মাতৃবন্দনার উৎস হতে, বঙ্গবন্দনার প্রবাহ ধরে, রাষ্ট্রবন্দনার মোহনায় মিলিত হয়েছে। আমাদের গর্ব যে, এর রূপকার একজন বাঙালি — সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র।
সম্প্রতি সম্পূর্ণ গানটির উপস্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু প্রথম থেকেই নানা বিতর্ক এই গানের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। রবীন্দ্রনাথও সেই বিতর্কের উত্থাপনে,অনিচ্ছাকৃত ভাবেই হয়তো জড়িয়ে গিয়েছিলেন।
‘বন্দেমাতরম্’-এ পৌত্তলিকতার চিহ্ন থাকার অভিযোগে সকলের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। এই বিষয়ে স্বয়ং একজন উদারনৈতিক,সম্প্রীতির মূর্ত প্রতীক, স্বাধীনতা সংগ্রামী-প্রাবন্ধিক-শিক্ষাবিদ রেজাউল করিমের কথা প্রণিধানযোগ্য হতে পারে।
১৯৩৮ সালের ২৮ জুন ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-য় ‘অহিন্দুর দৃষ্টিতে বঙ্কিম-প্রতিভা’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন,‘বন্দেমাতরম্ সঙ্গীত যে বঙ্কিমের অমর অবদান। আজ যে সঙ্গীত ভারতের পল্লীতে পল্লীতে, নগরে নগরে, কাননে-প্রান্তরে নিত্য ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হইতেছে, মূকের মুখে যাহা ভাষা ফুটাইতেছে,ভীত প্রাণে যাহা সাহস যোগাইতেছে, সেই বঙ্কিম ইহার জন্য চির অমর হইয়া রহিবেন।’ মনে রাখতে হবে বাংলায় তখন ‘আনন্দমঠ’-র বহ্নি-উৎসব অর্থাৎ দহনযজ্ঞ চলছিল।
ফরাসি বিপ্লবের পরে বিপ্লবীদের পুনর্জীবিত করার জন্য সহায়ক হয়েছিল ক্লদ রজে-দ্য লিলের ‘লা-মারসেইয়েজ’ গান। ‘আনন্দমঠ’-এর ‘অমৃতময় ফল’ স্বরূপ বন্দেমাতরম্ গানটিকে করিম সাহেব সেই পর্যায়ভুক্ত করেছিলেন। মুসলমানদের মধ্যে বন্দেমাতরম্ নিষিদ্ধকরণের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন। একে তিনি মুসলিম লিগের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমূলক ফতোয়া ও তার জন্য জিন্না, নাজিমুদ্দিন, মৌলানা আকরাম খাঁকে দায়ী করেছেন।
অন্তিমজন ১৯০৬-১১ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে যোগ দিয়ে যখন বন্দেমাতরম্ গাইতেন তখন কেন তিনি ইসলাম বিরোধিতার ধুয়ো তোলেননি ? সমকালে ধর্ম বা ধর্মগ্রন্থের দোহাই দিয়ে বন্দেমাতরমের প্রতি বিষোদগার মেনে নিতে পারেননি করিম সাহেব। এই গান যদি ইসলাম বিরোধীই হতো তাহলে খিলাফৎ আন্দোলনের নেতারা তখন কেন তাতে যোগ দিতেন ? ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদীদের গুপ্তচর হয়ে, জাতীয় কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিরোধিতার ব্রত উদযাপনের অঙ্গরূপেই এই বন্দেমাতরম্-বিরোধিতা বলে তিনি ঠাওরেছিলেন।
পৌত্তলিকতা প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, বন্দেমাতরমে হিন্দু দেবদেবীর নাম থাকলেই যে তা একেশ্বরবাদী মুসলিমদের কাছে বর্জনীয় হবে, এমন যুক্তির সারবত্তা নেই। তুলনায়নের জন্য শক্তির ক্ষেত্রে হারকিউলিস, সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে ভেনাস, জ্ঞানের ক্ষেত্রে মিনার্ভার নাম উচ্চারণের প্রসঙ্গ তিনি এনেছিলেন। ঠিক সে ভাবেই উক্ত গানে দেশমাতৃকাকে হিন্দু দেবদেবীর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। করিমের মতে,‘কোনো মুসলমান পরিপূর্ণ ঈমান লইয়া ও আল্লাহ্তালায় প্রগাঢ় বিশ্বাস রাখিয়া, বন্দেমাতরম্ সংগীত গাহিতে পারে, এইরূপ করিলে তাহার ঈমানের একটুও ব্যাঘাত উৎপাদন হইবে না।’
এ প্রসঙ্গে করিম আরও একটি কুযুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। গানটি ‘আনন্দমঠ’ থেকে নেওয়া হয়েছে বলে মুসলমানদের কাছে তা নাকি নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। এ প্রসঙ্গে তাঁর যুক্তি পারস্যের কবি হাফেজ নিজ গ্রন্থের একটি লাইন এজিদের কবিতা থেকে নিয়েছিলেন বলে সমালোচিত হয়েছিলেন। তখন হাফেজ বলেছিলেন, মুক্তো কুড়াতে গেলে স্থান বিচার অনাবশ্যক।
বন্দেমাতরম্ ধ্বনি যেহেতু ‘জাতীয়তার বীজমন্ত্র’, গানটিতে যেহেতু ‘দেশের সৌন্দর্য’ বর্ণনা করা হয়েছে, তাই এই গানকে কখনওই, কোনও প্রকার চাপের মুখে পরিত্যাগ করা যাবে না বলে অভিমত দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর মতে ‘সুখে-দুঃখে,সম্পদে-বিপদে এই বন্দেমাতরম্ সঙ্গীত জাতির মাথা উঁচু করিয়া তুলিয়া রাখিয়াছে।’ গানটি শুনে তাঁর রবীন্দ্রনাথের শরৎকালীন বঙ্গজননীর কথা মনে পড়েছে।
‘ইসলাম ও বন্দেমাতরম্’ শীর্ষক নিবন্ধে সংস্কারাচ্ছন্নদের ‘বন্দনা’ এবং ‘মা’ শব্দ নিয়ে আপত্তি নস্যাৎ করেছিলেন করিম সাহেব। বন্দেমাতরম্-বিরোধী মৌলানা আকরাম খাঁ স্বরচিত ‘মোস্তফা চরিত’-এ যে আরবকে ‘মাগো’ বলে সম্বোধন করেছেন, তা তিনি উদ্ধৃত করেছিলেন। অর্থাৎ কাঁটা দিয়ে অন্যায় অভিযোগের কাঁটা তুলেছিলেন করিম সাহেব। দেশভক্তি, দেশপূজা, দেশবন্দনা, দেশমাতৃকা শব্দগুলি ইসলামিক দৃষ্টিতে নিন্দনীয় নয়। তাই বন্দেমাতরম্ গান ইসলাম বিগর্হিত কাজ নয় বলে রায় দিয়েছেন তিনি।
গানটির দ্বিতীয় অংশ, যা নিয়ে সর্বাপেক্ষা বিতর্ক হয়েছিল, তা নিয়েও ক্ষুরধার লেখনী চালিয়েছিলেন তিনি। মুসলমান সাহিত্যিকদের লেখায় প্রেমের দেবতা কিউপিডকে, সঙ্গীতের দেবী জোহরা, মৃত্যুদূত আজরাইলের উল্লেখ থাকলে পৌত্তলিক হয় না। তাই করিমের মতে,‘তবে দুর্গা, কমলা, বাণী শব্দ উপমার স্থলে ব্যবহার করিলে পৌত্তলিক হইবার কোনরূপ আশঙ্কা নাই।’
এর মধ্যে তিনি পৌত্তলিকতার জয়বাণী, হিন্দু দেবদেবীদের স্তুতিবাদ খুঁজে পাননি। বরং তিনি যা পেয়েছেন তা হলো, ‘দেবদেবী অপেক্ষা আমার কাছে বড়ো দেশ, দেশই আমার দুর্গা, দেশই আমার লক্ষ্মী, দেশই আমার সরস্বতী। প্রমাণরূপে মহেন্দ্রর কথাকে এনেছেন—‘এ ত দেশ,এ ত মা নয়।’ তুলে এনেছেন ভবানন্দের সেই কথা, ‘দেশমাতাই আমার সব,তাহার চেয়ে বড় দেবতা আমার নাই।’

প্রতিবেদন

admin