স্বাধীনতার দিনে সত্যের পথে এক নতুন যাত্রা

আজ ১৫ই আগস্ট ।
এটা কি শুধুই একটি তারিখ। না, এই দিনটির সঙ্গে মিশে আছে একটি জাতির দীর্ঘ সংগ্রাম, অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ, স্বপ্ন, প্রত্যাশা। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত শুধু স্বাধীনই হয়নি, সেটা ছিল সামগ্রিক অধিকার ফিরে পাওয়ার একটা স্মরণীয় দিন। স্বাধীনতার ৭৯ বছর পরে সেই দিনেই আমাদের যাত্রা শুরু হচ্ছে। পথ চলা শুরু হচ্ছে The Anchor Bengal-এর।
এই দিনটিকে বেছে নেওয়া নিছক কাকতালীয় নয়। কারণ আমরা বিশ্বাস করি, স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় শর্ত শুধু স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকা নয় — স্বাধীন ভাবে সত্যকে জানা। আর সেই সত্যকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই সাংবাদিকদের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার। আজ কিন্তু চারিদিকে তথ্যের অভাব নেই। বরং তথ্যের বিস্ফোরণ ঘটেছে। একটি ঘটনা ঘটার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তা হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যম, ইউটিউব, রিল, পোস্ট, লাইভ — সব মিলিয়ে আমরা যেন প্রতিদিন অসংখ্য খবরের মধ্যে বসবাস করছি। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। আমরা কি সত্যিই খবর পাচ্ছি? নাকি শুধু এমন কিছু দেখছি, যা আমাদের দেখানো হচ্ছে? কোন খবর দেখানো হবে, কোন খবর চাপা দেওয়া হবে, কোন ঘটনাকে কতটুকু দেখানো হবে — এই সিদ্ধান্তগুলো আজ সাংবাদিকতার বাইরেও অনেক শক্তির দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। এই সময়েই The Anchor Bengal-এর প্রয়োজন।
আমরা শুধু খবর পৌঁছে দিতে চাই না। আমরা খবরের পিছনের খবরটি খুঁজতে চাই। প্রশ্ন জাগতে পারে, কেন এই নাম? আসলে জাহাজ যখন উত্তাল সমুদ্রে ভাসে, তখন তার Anchor (নোঙর) তাকে স্থির থাকতে সাহায্য করে। সাংবাদিকতাও আজ এক অর্থে তেমনই এক উত্তাল সমুদ্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে গুজব আছে, প্রচার আছে, পক্ষপাত আছে, অর্ধসত্য আছে, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্যও আছে। আবার তার পাশাপাশি আছে মানুষের প্রকৃত জীবন, প্রকৃত সমস্যা এবং বহু অনুচ্চারিত সত্য। The Anchor Bengal হতে চায় সেই নোঙর। যে নোঙর উত্তেজনার সময়ও যুক্তিকে ধরে রাখবে। যে নোঙর জনপ্রিয়তার চাপে প্রশ্ন করতে ভুলবে না। যে নোঙর ক্ষমতার সামনে মাথা নত করবে না। একইসঙ্গে যে নোঙর মনে করিয়ে দেবে — সাংবাদিকতার প্রথম পরিচয় কোনও পক্ষের সঙ্গে নয়, সত্যের সঙ্গে।
আবার প্রশ্ন জাগতে পারে, কোন সত্যের উন্মোচন চাই আমরা ? উত্তর হল, আমরা এমন সত্য খুঁজতে চাই, যা অনেক সময় শিরোনাম হয় না। একজন সাধারণ মানুষের জীবনের সত্য। কৃষকের ক্ষেতের সত্য। শ্রমিকের শ্রম ও মজুরির সত্য। ছাত্রের ভবিষ্যতের সত্য। শিক্ষাব্যবস্থায় অন্ধকারে চাপা পড়া সত্য। স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিতরে ঘুণপোকার সত্য। নারীর নিরাপত্তার সত্য। প্রশাসনের সাফল্য এবং ব্যর্থতা দুটোই সত্য। রাজনীতির প্রতিশ্রুতি যেমন আছে,, প্রতিশ্রুতি পূরণের দায়ও আছে।
আমরা যে উন্নয়নের কথা বলি, দেখতে হবে তার সুফল কোথায় পৌঁছেছে? যে প্রতিশ্রুতির কথা বলা হয়, তার কতটা বাস্তব সম্মত! যে মানুষটির কথা কেউ বলছে না, তার কথাও আমরা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। তাই আমরা কারও বিরুদ্ধে নই, কিন্তু প্রশ্নের পক্ষে।
The Anchor Bengal কোনও রাজনৈতিক দলের মুখপত্র হতে চায় না। কোনও ক্ষমতাকেন্দ্রের প্রচারমাধ্যমও নয়। আমরা বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা করব না। আবার প্রশংসা করার জন্য প্রশংসাও করব না। ক্ষমতা যদি ভালো কাজ করে, আমরা তা বলব। ক্ষমতা যদি ভুল করে, আমরা প্রশ্ন করব। কোনও বিরোধী দল যুক্তিসঙ্গত কথা বললে আমরা তা তুলে ধরব। আবার বিরোধিতার নামে যদি অসত্য তথ্য ছড়ানো হয়, তার বিরুদ্ধেও প্রশ্ন থাকবে। কারণ আমরা সবসময় সত্যের পক্ষে। সত্য কখনও একরঙা নয়। আমরা জানি, সত্য অনেক সময় অস্বস্তিকর। সত্য সবসময় সুন্দর নয়। সত্য কখনও জনপ্রিয় নয়। কখনও সত্য ক্ষমতাবানকে অস্বস্তিতে ফেলবে, কখনও বিরোধীকে, কখনও সমাজকে, কখনও আমাদের নিজেদেরও।
বাংলা একটি দীর্ঘ ইতিহাসের নাম। সংস্কৃতি, সাহিত্য, রাজনীতি, আন্দোলন, যুক্তিবাদ, প্রতিবাদ এবং মানবিকতার এক দীর্ঘ ঐতিহ্যের নাম। সেই বাংলার সাংবাদিকতারও একটি ঐতিহ্য আছে। The Anchor Bengal সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার দাবি করতে নয়, তার কাছে নিজেদের দায়বদ্ধ করতে এসেছে।
৭৯ বছর আগে দেশ স্বাধীন হয়েছিল। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি, স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ প্রতিদিন নতুন করে অর্জন করতে হয়। যেখানে মানুষ প্রশ্ন করতে পারে না, সেখানে স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ। যেখানে তথ্য গোপন থাকে, সেখানে স্বাধীনতা দুর্বল। যেখানে সত্য বলা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, সেখানে স্বাধীনতার মূল্য নতুন করে ভাবতে হয়। তাই ১৫ আগস্টে, আমাদের যাত্রা শুরু করার অর্থ আমাদের কাছে খুব স্পষ্ট — স্বাধীনতার দিনে আমরা স্বাধীন সাংবাদিকতার অঙ্গীকার করতে চাই। ভয়কে অতিক্রম করে। লোভকে দূরে রেখে। চাপকে উপেক্ষা করে এবং সত্যকে সামনে রেখে।
আমরা দাবি করছি না যে, The Anchor Bengal ভুল করবে না। সাংবাদিকতা মানুষ করে। মানুষ ভুল করে। আমরাও ভুল করতে পারি। কিন্তু আমাদের চেষ্টা থাকবে ভুল হলে সংশোধন করার। কারণ বিশ্বাসযোগ্যতা কোনও একদিনে তৈরি হয় না। বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হয় প্রতিদিন। প্রতিটি প্রতিবেদনে। প্রতিটি প্রশ্নে। প্রতিটি অনুসন্ধানে।
আজ আমাদের প্রথম দিন। আজ আমরা শুধু একটি ডিজিটাল নিউজ পোর্টালের সূচনা করছি না। মানুষের প্রশ্ন করার অধিকারকে আরও শক্তিশালী করতে চাই আমরা। সামনে দীর্ঘ পথ, অনেক প্রশ্ন, অনেক অন্ধকার, অনেক অস্বস্তিকর সত্য! তবু আমরা এগবো। কারণ আমাদের কাছে সাংবাদিকতা শুধু পেশা নয়। এটি একটি দায়িত্ব, একটি বিশ্বাস, একটি প্রতিশ্রুতি। সেটা সত্যের প্রতি, মানুষের প্রতি, দেশের প্রতি। The Anchor Bengal থাকবে সত্যের পথে। এই পুণ্যদিনে স্মরণ করি স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা প্রতিটি মানুষকে।
জয়তু নেতাজি।
