অকালবোধনের পুরাণকথা, কেন ঘুম ভাঙানো হয় দেবীর?
কঙ্কণা লাহিড়ী
ষষ্ঠীতে শারদোৎসবের সূচনা। ঢাকের আওয়াজ, ধূপের গন্ধ আর মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যেই আজ দেবী দুর্গার বোধন। কিন্তু বোধন কী? কেনই বা দুর্গাপুজোর আগে দেবীকে জাগিয়ে তোলার প্রয়োজন হয়? এর পিছনে রয়েছে পুরাণের এক কাহিনি, যেখানে জড়িয়ে আছে রামায়ণের যুদ্ধ, রাবণবধ এবং দেবী দুর্গার আরাধনার এক বিশেষ অধ্যায়।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসে বোধন শব্দের অর্থ ‘জাগরণ’ বা জাগিয়ে তোলা। দুর্গাপুজোর বোধন বলতে দেবী দুর্গাকে আনুষ্ঠানিকভাবে আবাহন ও জাগ্রত করার ধর্মীয় আচারকে বোঝায়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবতাদের ছয় মাস উত্তরায়ণ এবং ছয় মাস দক্ষিণায়ন— এই দুই পর্বের সঙ্গে জাগরণ ও নিদ্রার ধারণা যুক্ত। দক্ষিণায়নকে দেবতাদের নিদ্রাকাল হিসেবে কল্পনা করা হয়। শরৎকালে দুর্গাপুজোর সময়টি এই দক্ষিণায়নের অন্তর্গত বলেই দেবীর বোধনের প্রয়োজন হয়। এমনই রয়েছে ধর্মীয় ব্যাখ্যায়। তবে এই ধারণা সব শাস্ত্রে একইভাবে বর্ণিত নয়। এটি মূলত প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচারপরম্পরার অংশ।
বোধনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রামায়ণের অকালবোধনের কাহিনি। প্রচলিত কৃত্তিবাসী রামায়ণ এবং বাংলার দুর্গাপুজোর লোকপ্রচলিত ঐতিহ্যে এই কাহিনির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কথিত আছে, রাবণের সঙ্গে চূড়ান্ত যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার আগে শ্রীরামচন্দ্র দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। কিন্তু দেবী দুর্গার পূজার প্রচলিত সময় ছিল বসন্তকাল। শরৎকালে সেই পূজা হওয়ার কথা নয়। তাই অসময়ে দেবীর আরাধনাকে বলা হয় ‘অকালবোধন’।
কাহিনি অনুসারে, রাবণকে পরাজিত করার জন্য শ্রীরামচন্দ্র দেবীর আশীর্বাদ লাভ করতে চেয়েছিলেন। তাঁকে মহামায়ার পুজো করার পরামর্শ দেন ব্রহ্মা। সেই সময় ব্রহ্মা সেখানকার সাগরের তীরে এক কুমারী বালিকাকে প্রত্যক্ষ করেন। দেখেন সেই বালিকা কাছেই একটি বেলগাছের মধ্যে বিলীন হয়ে গেল। ধ্যানযোগে তিনি জানতে পারেন, সেই বালিকা আর কেউ নন, স্বয়ং মহামায়া। সেখানে সেই বিল্ববৃক্ষের নীচে ব্রহ্মা দেবীর বোধন করেছিলেন এই ষষ্ঠীর দিনেই। তারপর রামচন্দ্র নিজে দেবীর পুজো করেন। তিনি একশো আটটি নীলপদ্ম দিয়ে দেবীর পূজা করার সংকল্প করেন। কিন্তু পূজার সময় দেখা গেল, পদ্মের সংখ্যা একটি কম। রামচন্দ্রের আরাধনা যাতে অসম্পূর্ণ না থাকে, তার জন্য তিনি নিজের পদ্মের মতো চোখটি উৎসর্গ করতে উদ্যত হন। তাঁর এই ভক্তি ও আত্মত্যাগে সন্তুষ্ট হয়ে দেবী দুর্গা আবির্ভূত হন এবং তাঁকে আশীর্বাদ করেন। এরপর রামচন্দ্র রাবণকে বধ করতে সক্ষম হন।
এই কাহিনির সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। বাল্মীকি রামায়ণে রাবণবধের আগে রামের দুর্গাপূজা ও অকালবোধনের এই বিস্তারিত বিবরণ নেই। এটি মূলত বাংলার কৃত্তিবাসী রামায়ণ এবং পরবর্তী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরম্পরায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠা আখ্যান।
বাংলার প্রচলিত দুর্গাপুজোর আচার অনুযায়ী, আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথিতে দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্য দিয়ে দেবীকে পূজার জন্য আহ্বান জানানো হয়। বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস— এই তিনটি পরস্পর সম্পর্কিত হলেও পৃথক ধর্মীয় আচার। বোধনে দেবীকে জাগ্রত ও আহ্বান করা হয়, আমন্ত্রণে তাঁকে পূজায় অংশগ্রহণের অনুরোধ জানানো হয় এবং অধিবাসে পূজার উপকরণ ও সংশ্লিষ্ট স্থানে পবিত্রতার প্রতিষ্ঠা করা হয়।
বোধনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি তাৎপর্য। দেবী দুর্গা কেবল অসুরবিনাশিনী নন, তিনি শক্তির প্রতীক। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধ অশুভের বিরুদ্ধে শুভের সংগ্রামকে প্রকাশ করে। রামায়ণের অকালবোধনের কাহিনিতেও সেই একই ভাবনার প্রতিফলন দেখা যায়— অন্যায় ও অশুভ শক্তিকে পরাস্ত করার জন্য মানুষের প্রয়োজন শক্তি, সাহস, ভক্তি এবং আত্মবিশ্বাস।
তাই ষষ্ঠীর বোধন শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়; এটি যেন শক্তির আবাহন। শরতের স্নিগ্ধ প্রকৃতির মধ্যে দেবীর জাগরণ মানুষকে মনে করিয়ে দেয়, অন্ধকার যত গভীরই হোক, শুভশক্তির জাগরণেই তার বিনাশ সম্ভব। সেই বিশ্বাসকে সঙ্গী করেই বাঙালি অপেক্ষা করে দুর্গাপুজোর— মা আসছেন, অশুভের বিনাশ হবে, শুভের জয় ঘটবে।
ষষ্ঠীর সন্ধ্যায় যখন বোধনের মন্ত্র উচ্চারিত হয়, তখন তাই শুধু প্রতিমার সামনে পূজার সূচনা হয় না, বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনাতেও যেন জেগে ওঠে এক প্রাচীন বিশ্বাস— শক্তির জাগরণেই অশুভের বিনাশ, আর সেই জাগরণেরই নাম বোধন। ‘রাবণস্য বধার্থায় রামস্যানুগ্রহায় চ। / অকালে ব্রহ্মণা বোধো দেব্যাস্তয়ি কৃতঃ পুরা।। / অহমপ্যাশ্বিনে তদ্ববোধয়ামি সুরেশ্বরীম্। / শক্রেনাশি চ সংবোধ্য প্রাপ্তং রাজ্যং সুরালয়ে।।’
