বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়: মর্যাদা হারাচ্ছে শিক্ষা ও সংস্কৃতি

22 August, 2026 6:24 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

আবার খবরের শিরোনামে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। বারবার এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গায়ে পড়েছে রাজনৈতিক আঁচড়। কিন্তু মনে রাখা দরকার এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বাংলার উচ্চশিক্ষা, মুক্তচিন্তা, প্রতিবাদ এবং গণতান্ত্রিক চেতনার ইতিহাসে তার একটি স্বতন্ত্র অবস্থান রয়েছে। সেই যাদবপুর যখন বারবার রাজনৈতিক সংঘাত, ক্ষমতার টানাপোড়েন এবং দখলের রাজনীতির শিরোনামে উঠে আসে, তখন প্রশ্নটা শুধু রাজনীতির থাকে না, প্রশ্নটা ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও।

ছাত্র রাজনীতি থাকবে। প্রতিবাদ থাকবে। মতের অমিলও থাকবে। এগুলো গণতন্ত্রের স্বাভাবিক লক্ষণ। কিন্তু বাম রাজনীতি হোক বা রাম রাজনীতি, কোনও ক্ষেত্রেই উগ্রতা কাম্য নয়। রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেই পার্থক্য যদি শিক্ষার পরিবেশকে বিষিয়ে তোলে, তাহলে তার মাশুল দিতে হয় ছাত্রসমাজকেই।

একসময় যাদবপুরে শোনা গিয়েছিল ‘হোক কলরব’। ২০১৪ সালের সেই হোক কলরবের মধ্যে ছিল প্রতিবাদের ভাষা। কিন্তু সেই প্রতিবাদের ভাষা সেদিন সংস্কৃতি মনস্ক নাগরিকরা পছন্দ করেননি। তার মধ্যেও সেদিন একধরনের উগ্রতা দেখা গিয়েছিল। সাধারণ মানুষ তার নিন্দা করে বলেছিলেন, ‘এ কোন ধরনের আন্দোলন, ছাত্রদের মুখে এ কেমনতর ভাষা। ছিঃ!’ আজও সেই প্রশ্ন উঠছে। তাহলে কি প্রতিবাদের সংস্কৃতি দখলের সংস্কৃতিতে পরিণত হচ্ছে? সংঘাতের এই সংস্কৃতিতে মানুষ বিশ্বাস করে না। আবার তার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় যদি ক্যাম্পাসে গেরুয়া তাণ্ডবের আবহ তৈরি হয়, সেটিও কোনওভাবেই কাম্য নয়। রং বদলালেই রাজনীতির চরিত্র বদলে যায় না। উগ্রতা উগ্রতাই। সবসময় তা নিন্দাযোগ্য।

এই সব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যাদবপুরের ছাত্র সংস্কৃতিতে পচন ধরেছে কি না, সেই প্রশ্নটি এসেই যায়। তবে এবার মুখ ফেরাতেই হবে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় কোনও রাজনৈতিক পতাকার রঙে নয়; তার পরিচয় তার মেধা, গবেষণা, শিক্ষার মান এবং মুক্তচিন্তার পরিসরে। ক্ষমতা, সংগঠন, প্রভাব— এই প্রশ্নগুলো যখন বড় হয়ে ওঠে, তখন মার খেতে থাকে ছাত্রের পড়াশোনা, গবেষণা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতার লড়াই থাকতেই পারে। কিন্তু সেই লড়াইয়ের কারণে যদি ক্লাস ব্যাহত হয়, শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়, ছাত্রদের মধ্যে বিভাজন বাড়ে, হিংসা বাড়ে, তাহলে শেষ পর্যন্ত লাভ কার? রাজনৈতিক সংগঠনগুলি তাদের শক্তি প্রদর্শন করলে তারই অঙ্গ হিসাবে মিছিল হবে, পাল্টা মিছিল হবে। অভিযোগ উঠবে, পাল্টা অভিযোগও আসবে। কিন্তু যে ছাত্রটি ক্লাস করতে চায়, গবেষণা করতে চায়, পরীক্ষায় বসতে চায়, নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে চায়, তার কথা কে বলবে?

ছাত্রসমাজকে খেপিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার রাজনীতি বন্ধ হোক। ছাত্ররা কোনও রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার নয়। তারা কারও ক্ষমতা দখলের সিঁড়ি নয়। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনীতি করার অধিকার কোনও পক্ষেরই নেই। আর এখানেই সরকারের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। সুস্থ শিক্ষার হাল না ফিরলে মেধাবী ছাত্রদের ভবিষ্যৎ সরকার নিজের হাতেই নষ্ট করবে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে ভেঙে দেওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ, একটি প্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামো দুর্বল করা যায়, তার পরিবেশকে বিষিয়ে দেওয়া যায়, তার ঐতিহ্যকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো যায়। কিন্তু শুধু বক্তৃতা, ঘোষণা আর রাজনৈতিক বিবৃতি দিয়ে আদর্শ শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা যায় না। শিক্ষাঙ্গনে সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্য জন্য চাই প্রশাসনিক দৃঢ়তা, রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। সেই সঙ্গে দরকার শিক্ষকদের মর্যাদা, ছাত্রদের নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা।

ক্ষমতা বদলাবে, সংগঠনের নেতৃত্ব বদলাবে, রাজনৈতিক সমীকরণও বদলাবে। কিন্তু একজন ছাত্রের নষ্ট হয়ে যাওয়া একটি শিক্ষাবর্ষ আর ফিরে আসবে না। গবেষণার নষ্ট হয়ে যাওয়া সময় ফিরবে না। একটি পরিবারের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন নষ্ট হবে। তাই আজ যাদবপুরের লড়াইয়ে কে জিতল, সেটা বড় কথা নয়। কিন্তু শিক্ষা যে হেরে গেল, সেটা অনায়াসে বলা যায়। আমরা ‘হোক কলরব’ চাই না, গেরুয়া আধিপত্যবাদও চাই না। আমরা চাই অতীতের যাদবপুর ফিরুক স্বমহিমায়। সেখানে লড়াই জারি থাকুক। সে লড়াই হোক যুক্তির, জ্ঞানের এবং মেধার।

 

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee