বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

খাকি উর্দির আড়ালে মাফিয়া-রাজ ? কাঠগড়ায় পুলিশ কর্তা

22 August, 2026 6:17 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

ভোপাল : আকাশছোঁয়া স্বপ্ন নিয়ে বিমান সেবিকার কাজ দিয়ে শুরু করেছিলেন কর্মজীবন।

এরপর রাজ্য সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় নজরকাড়া সাফল্যের পর গায়ে ওঠে পুলিশের খাকি উর্দি। কিন্তু সেই উর্দির আড়ালেই যে এমন ভয়ংকর এক অপরাধের জাল বোনা হচ্ছিল, তা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি কেউ। জেলের কুঠুরিতে বন্দি থাকা এক অভিযুক্তের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে তাঁর পরিবারের কাছ থেকে জলের দরে কোটি টাকার সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠল খোদ এক সিএসপি (CSP) পদমর্যাদার পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে তোলাবাজির মতো মারাত্মক অভিযোগও। এই জোড়া কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে পুলিশ প্রশাসনে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। মূল অভিযুক্ত পুলিশ আধিকারিকের নাম পচিসিয়া।

জলের দরে বহুমূল্য সম্পত্তি ও ক্ষমতার অপব্যবহার

পুরো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রমেশ লোধি নামের এক ব্যক্তির একটি বহুমূল্য সম্পত্তি এবং সরকারি মূল্যায়নের সঙ্গে তার বিক্রি হওয়া দামের আকাশপাতাল তফাৎ। সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, যে সম্পত্তির বাজারদর প্রায় ৮২ লক্ষ ৮৬ হাজার টাকা, তা মাত্র ১৮ লক্ষ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। আর এই সম্পত্তি কিনেছিলেন মারুফ আহমেদ হানাফি নামের এক ব্যক্তি। অর্থাৎ, প্রায় ৮৩ লক্ষ টাকার সম্পত্তি বিক্রি হয়েছে তার প্রকৃত মূল্যের চার ভাগের এক ভাগেরও কম দামে!

কী ভাবে সম্ভব হল এই অসাধ্য সাধন?

এখানেই উঠে এসেছে পুলিশের ক্ষমতার চরম অপব্যবহারের অভিযোগ। পুলিশি তদন্তে জানা গিয়েছে, রমেশ লোধি সেই সময় একটি ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হয়ে জেলে বন্দি ছিলেন। তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, জেলের ভিতরে থাকা রমেশের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে তাঁর পরিবারের উপর প্রবল মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়। এই নামমাত্র মূল্যে জমি বিক্রির চুক্তিতে সই করানোর জন্য পুলিশি প্রভাব ও প্রশাসনিক ক্ষমতাকে নগ্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।

রহস্যময় আর্থিক লেনদেন ও প্যান কার্ডের সূত্র

এই মামলার পরতে পরতে লুকিয়ে রয়েছে রহস্য, বিশেষ করে টাকার লেনদেনের ক্ষেত্রে। জমির দাম হিসেবে ধার্য হওয়া ১৮ লক্ষ ২০ হাজার টাকার মধ্যে ১৫ লক্ষ টাকা চেকে এবং ৩ লক্ষ ২০ হাজার টাকা নগদে মেটানো হয়েছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু ক্রেতা মারুফ আহমেদ হানাফির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের লেনদেন খতিয়ে দেখতেই চোখ কপালে ওঠে তদন্তকারীদের। ২০২৫ সালের ১১ জুলাই হানাফির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ব্যালেন্স ছিল মাত্র ৩,০৩৬ টাকা। অথচ, আশ্চর্যের বিষয় হল, ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল—যেদিন ওই সম্পত্তির রেজিস্ট্রেশন হয়—ঠিক সেদিনই তাঁর অ্যাকাউন্টে কোথা থেকে যেন ১৫ লক্ষ টাকা এসে জমা হয়!

তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, এই টাকার মধ্যে ১০ লক্ষ টাকা এসেছিল ‘শাইন পার্টনার্স’ (Shine Partners) নামের একটি সংস্থার অ্যাকাউন্ট থেকে। বাকি ৫ লক্ষ টাকা ট্রান্সফার করা হয়েছিল ক্ষিতিজ রাজ বড়পাত্রে নামের এক ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট থেকে, যাকে এই মামলায় ইতিমধ্যেই অভিযুক্ত হিসেবে নামাঙ্কিত করা হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, তদন্তে আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। শাইন পার্টনার্স এবং ক্ষিতিজ রাজ বড়পাত্রের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলি একই প্যান (PAN) নম্বরের সঙ্গে যুক্ত। তদন্ত রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে, এই বড়পাত্রে হলেন মূল অভিযুক্ত পুলিশ আধিকারিক পচিসিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী, আত্মীয় অথবা ব্যবসায়িক অংশীদার।

মামলা রুজু ও আইনি পদক্ষেপ

ভোপাল ভিজিল্যান্স ব্রাঞ্চের অভিযোগ এবং জবলপুর জ়োনের ইনস্পেক্টর জেনারেল (IG) প্রমোদ ভার্মার নির্দেশের পর গত বুধবার এই ঘটনায় একটি এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়েছে। ফৌজদারি মামলা রুজু হওয়ার আগে আইপিএস (IPS) অনু বেনিওয়ালের নেতৃত্বে এই জমি কেলেঙ্কারি এবং আনুষঙ্গিক অভিযোগগুলি নিয়ে একটি বিস্তারিত তদন্ত করা হয়েছিল। কাটনির পুলিশ সুপার (SP) অভিনব বিশ্বকর্মা জানিয়েছেন, সিএসপি এবং অন্যান্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে জালিয়াতি, বলপ্রয়োগ এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মতো একাধিক জামিন অযোগ্য ধারায় গুরুতর মামলা রুজু করা হয়েছে।

পরিবারের অভিযোগ অবশ্য শুধুমাত্র জমি রেজিস্ট্রেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। রমেশ লোধির ছেলে আকাশ অভিযোগ করেছেন, তাঁর বাবা যখন এই বিতর্কিত রেজিস্ট্রেশন এবং হস্তান্তর বাতিল করার আইনি চেষ্টা করেন, তখন তাঁদের গোটা পরিবারকে ক্রমাগত হুমকি দেওয়া হতে থাকে। এই হুমকি কে বা কারা দিয়েছিল, তার সঙ্গে জমি কেলেঙ্কারির সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না এবং এর নেপথ্যে কর্তব্যরত কোনও পুলিশ কর্মী বা প্রশাসনের কোনও রিসোর্স ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা এখন তদন্ত করে দেখছে পুলিশ। ইতিমধ্যে অভিযুক্ত পচিসিয়া মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টে রক্ষাকবচ চেয়ে আবেদন করেছিলেন, কিন্তু আদালত তাঁকে কোনওরকম অন্তর্বর্তীকালীন স্বস্তি দিতে অস্বীকার করেছে, যার ফলে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পথ আরও প্রশস্ত হয়েছে।

আগের তোলাবাজির অভিযোগ

এই ঘটনার ঠিক এক মাস আগে, ২১ জুলাই রাতে গাড়ি চেকিংয়ের সময় মহেন্দ্র জৈন নামের এক পরিবহণ ব্যবসায়ীর ট্রাক আটকে তাঁর কাছে ৩০ হাজার টাকা তোলা চাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল এই পচিসিয়ার বিরুদ্ধেই। জৈনের অভিযোগ ছিল, ঘটনাস্থলেই তাঁকে নগদ ২৫ হাজার টাকা দিতে বাধ্য করা হয় এবং বাকি ৫ হাজার টাকা পরের দিন চালকের হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। টাকা না দিলে ট্রাক বাজেয়াপ্ত করে থানায় নিয়ে যাওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। বালি ও ডলোমাইট পরিবহণের ব্যবসা করা জৈন উপযুক্ত প্রমাণ-সহ অভিযোগ দায়ের করার পর প্রশাসন তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কনস্টেবল-চালক কেশব সিংকে সাসপেন্ড করা হয় এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কমল মৌর্যের হাতে তদন্তভার তুলে দেওয়া হয়। এর পরই পচিসিয়ার তত্ত্বাবধান থেকে তিনটি থানাকে সরিয়ে অন্য এক আধিকারিকের অধীনে দেওয়া হয়েছিল।

উত্থান ও পতন: এক অনুপ্রেরণামূলক কেরিয়ারের মর্মান্তিক পরিণতি

পচিসিয়ার এই পতন অত্যন্ত নাটকীয়। কারণ, তাঁর পুলিশে যোগদানের গল্পটি একসময় অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণা ছিল। রাজগড় জেলার পাচোর তেহসিলের বাসিন্দা পচিসিয়া দ্বাদশ শ্রেণির পর এভিয়েশন সেক্টরে পা রাখেন এবং এয়ার ইন্ডিয়ায় কেবিন ক্রু হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পেশা বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং রাজ্য সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি শুরু করেন। ২০১২ সালে মধ্যপ্রদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (MPPSC) পরীক্ষায় বসেন তিনি। ২০১৬ সালে যখন চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়, তখন দেখা যায় পচিসিয়া গোটা মধ্যপ্রদেশে ২০তম স্থান অধিকার করেছেন। এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে ডিএসপি (DSP) হিসেবে পুলিশ সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ক্ষমতার মোহ আজ তাঁর সেই উজ্জ্বল কেরিয়ারকে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে।

প্রতিবেদনটির ভাষা ও খবরের কাগজের আদলে তৈরি বিন্যাস কি আপনার পছন্দ হয়েছে, নাকি এর মধ্যে আরও কোনও নির্দিষ্ট তথ্য যোগ করতে চান?

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee