পুজো কি শুধু কলকাতার? জেলার মাটিতে আজও জেগে সাবেক পুজোর ঐতিহ্য
শহরের থিমের আলোর বাইরে, জেলায় জেলায় আজও টিকে আছে এমন কিছু দুর্গাপুজো, যার বয়স তিন-চারশো বছর ছুঁয়েছে। কোথাও মাটি খুঁড়ে পাওয়া পাথরই দেবী, কোথাও বর্গি হামলার স্মৃতি জড়িয়ে আছে পুজোর সঙ্গে, আবার কোথাও দেবীর হাতের গড়নেই লুকিয়ে আছে অদ্ভুত এক নাম। সেরকমই পাঁচটি প্রাচীন পুজোর গল্প রইল।
বনগাঁর বন্দ্যোপাধ্যায় বাড়ি
ছয়ঘড়িয়ার এই পুজো প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মামাবাড়ির পুজো নামেও পরিচিত। শুরু করেছিলেন গৌড়হরি বন্দ্যোপাধ্যায়। অবিভক্ত বাংলার যশোর জেলার ছয়ঘড়িয়ায় এর সূচনা, বয়স প্রায় সাড়ে তিনশো বছর। এখানকার প্রতিমার বিশেষত্ব হাতের গড়নে। দুটি হাতে দেবী অসুর বধ করছেন, বাকি হাতগুলি খুবই ছোট। সেই কারণে ভক্তদের কাছে ইনি পরিচিত বিড়ালহাতি দুর্গা নামে।
বর্ধমানের আমাদপুরের চৌধুরী বাড়ি
সাড়ে তিনশো বছর আগে এই পুজো শুরু করেন অনাদিরাম সেন। ঔরঙ্গজেবের আমলে তিনি মুর্শিদাবাদে জমিদারি পেয়েছিলেন। পরে বর্গি হামলার জেরে পরিবার মুর্শিদাবাদ ছেড়ে বর্ধমানের আমাদপুর গ্রামে চলে আসে। পুজোর পনেরো দিন আগে থেকেই বাড়িতে বোধনের চণ্ডীপাঠ শুরু হয়। আরেকটি অভিনব রীতি হল, পুজোর আগে বাড়ি বাড়ি ঘুরে চাল-ডাল সংগ্রহ করা হয়। সেই চাল-ডাল বেটে মন্দির প্রাঙ্গণে আল্পনা দেওয়া হয়।
বর্ধমানের কোলসাড়া ঘোষাল বাড়ি
এই পুজোর বয়সও প্রায় চারশো ছুঁইছুঁই। ঘোষাল পরিবারের একাদশ বংশধর দিগম্বর ঘোষাল ছিলেন সম্রাট শেরশাহের বিশ্বস্ত কর্মচারী। কথিত আছে, স্বপ্নাদেশ পেয়েই পরিবারে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়। প্রতিমা একচালার। নয় দিন ধরে চলে পুজো, আর দশমীতে হয় কুমারী পুজো। প্রতিপদ থেকেই এ বাড়িতে ভোগের অন্ন তৈরি শুরু হয়ে যায়।
বাঁকুড়ার সাহারজোড়ার বাউরি পরিবার
বাঁকুড়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে থাকা বাউরি সম্প্রদায়ের উদ্যোগে প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে সাহারজোড়া গ্রামে এই পুজো শুরু হয়। কথিত আছে, মাঠে হলকর্ষণের সময় এক বাউরি মাটির নিচে পান দুর্গার তিনটি চোখের আদলে তিনটি শিলাখণ্ড। সেই পাথরকেই মহামায়ার রূপে পুজো করা শুরু করেন তাঁরা। সেই রীতি মেনে আজও এখানে প্রতিমা গড়া হয় না, মন্দিরে রাখা ওই তিনটি শিলাখণ্ডই দেবী রূপে পূজিত হন।
আসানসোলের ধাদকা গ্রাম
তিনশো বছরের পুরনো এই পুজোর প্রতিমা একচালার, গড়া হয় শাল কাঠের একটি পাটাতনের ওপর। পুজোর চার দিন গোটা গ্রাম নিরামিষ খায়, দশমীর পর আমিষ খাওয়ার চল। পুজোর ছোঁয়ায় রুক্ষ-শুকনো ধাদকা গ্রামেও লেগে যায় উৎসবের রং।
