বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
বেলুড় মঠে মহাসাড়ম্বরে হয়ে গেল কুমারী পুজো পাঁজরে হাড় ভেঙে ফুসফুসে, চোরবাগানের ময়নাতদন্তের ভয়াবহ রিপোর্ট টাইগার শ্রফের উপর গুলি, হামলা, গ্রেপ্তার ৩ টাইগার শ্রফকে হামলায় দায়স্বীকার বিষ্ণোই গ্যাংয়ের

ছোটদের মধ্যে কেন বাড়ছে হিংসা? কী করণীয়?

02 October, 2026 7:20 PM Lopa Bhowmik
শেয়ার করুন

অদিতি গাঙ্গুলি

বিশিষ্ট মনোবিদ

সাম্প্রতিক সময়ে সারা বিশ্বেই শিশুদের মধ্যে রাগ, জেদ এবং আক্রমণাত্মক আচরণ বেড়ে চলেছে। ভারতও এর ব্যতিক্রম নয়।
বিভিন্ন বয়সের শিশুদের মধ্যেই এই ধরনের আচরণ দেখা যাচ্ছে। খুব ছোটখাটো এবং হয়তো নগন্য বিষয়েও অনেক শিশু রেগে যাচ্ছে, চিৎকার করছে, জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলছে, এমনকি বাবা-মা বা অন্যদের আঘাতও করে ফেলছে।
যেমন—বাবা-মা  তার চাহিদা অনুযায়ী মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে না দিলে, পছন্দের খাতা-পেনসিল বা তার চাহিদা মতো জিনিস যখনই বলবে তখনই কিনে না দিলে, বাইরে খেলতে যেতে বললে বা কোনও শারীরিক কসরত হয় এমন খেলাধুলা করতে বললে অনেক শিশুই অস্বাভাবিকভাবে রেগে যাচ্ছে। এরকম উদাহরণ এখন ভুরি ভুরি।
কানাডিয়ান মনোবিজ্ঞানী রিচার্ড ই ট্রেম্বলে বলেছেন, কিছু শিশুর মধ্যে একেবারে ছোট বয়স থেকেই শারীরিকভাবে আক্রমণাত্মক আচরণ দেখা দিতে পারে। তাই ছোটবেলা থেকেই শিশুদের নিজেদের রাগ, দুঃখ, হতাশা ও অন্যান্য আবেগ সামলাতে শেখানো খুব জরুরি।
যে শিশুরা ছোটবেলা থেকে নিজেদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে না, তাদের মধ্যে পরবর্তী জীবনে আচরণগত সমস্যা এবং গুরুতর হিংসাত্মক আচরণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

কেন শিশুরা আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে?
শিশুর আক্রমণাত্মক আচরণের পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। তাই কোনও একটি কারণকে এর জন্য দায়ী করা ঠিক নয়।

১. শারীরিক ও বংশগত কারণ
শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ, শরীরের বিভিন্ন হরমোন ও রাসায়নিক পরিবর্তন এবং বংশগত বৈশিষ্ট্য তার আচরণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
মস্তিষ্কের একটি অংশ, যাকে অ্যামিগডালা বলা হয়,  তা রাগ ও ভয়ের মতো তীব্র আবেগের সঙ্গে যুক্ত। আবার মস্তিষ্কের আরেকটি অংশ যেমন, প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স— আমাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং হঠাৎ কিছু করে ফেলা থেকে বিরত থাকতে সাহায্য করে।
এই অংশগুলির কাজের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে কোনও কোনও শিশুর পক্ষে নিজের রাগ বা আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।
এ ছাড়া বংশগত বৈশিষ্ট্যও কিছু ক্ষেত্রে শিশুর আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কিছু বৈশিষ্ট্য বা জেনেটিক কারণেও শিশুর মধ্যে আক্রমণাত্মক মনোভাব আসতে পারে।

২. মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা

অনেক সময় কোনও কিছু পাওয়ার বা করার ইচ্ছা পূরণ না হলে শিশুর মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। সেই হতাশা থেকে রাগ এবং রাগ থেকে আক্রমণাত্মক আচরণ হতে পারে।  যেমন, কোনও শিশু খেলতে যেতে চায় কিন্তু বাবা-মা যেতে দিলেন না। অথবা সে মোবাইল ফোনে খেলতে চায়, কিন্তু সময় হয়ে যাওয়ায় ফোনটি সরিয়ে নেওয়া হল। তখন তার মনে হতাশা তৈরি হতে পারে এবং সে চিৎকার, কান্না, জিনিস ছোড়া বা মারধরের মতো আচরণ করতে পারে। আবার অনেক সময় যার ওপর রাগ হয়েছে, তার উপর সরাসরি রাগ দেখানো সম্ভব হয় না। তখন সেই রাগ অন্য কারও ওপর গিয়ে পড়তে পারে। অতীতের কোনও আঘাতও এক্ষেত্রে কারণ হয়ে উঠতে পারে। এখানে একটা কথা বলে রাখা জরুরি যে, অটিজম আক্রান্ত কোনও শিশু বা ব্যক্তি আচমকাই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে এমন কোনও প্রমাণ নেই। এরকমও বলা যায় না যে, অটিজমে আক্রান্ত শিশু পূর্ব পরিকল্পনা করে অন্য কারও ক্ষতি ঘটিয়ে তার প্রতিশোধ নিতে পারে। আসলে সমাজে কোনও একটি অপরাধ ঘটলেই সেখানে কোনও বিশেষ অসুখকে লেবেল হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা রয়েছে।

৩. মানসিক আঘাত ও অন্যান্য সমস্যা
শিশুর জীবনে কোনও খারাপ অভিজ্ঞতা বা গভীর মানসিক আঘাত থাকলেও তার আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে কোনও শিশু আক্রমণাত্মক আচরণ করলেই তাকে ‘মানসিক রোগী’ বলে দাগিয়ে দেওয়া উচিত নয়। এতে শিশুটির প্রতি অন্যদের ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে এবং মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে আজও সমাজে যে ভয় ও লজ্জা রয়েছে, তা আরও বাড়তে পারে।
তাই শিশুর আচরণের পিছনে আসল কারণটি বোঝা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
৪. বাড়ির পরিবেশ
শিশুরা শুধু কথা শুনে শেখে না, তারা দেখে দেখেও শেখে। যদি কোনও শিশু নিয়মিত বাড়িতে বাবা-মায়ের ঝগড়া, মারামারি, চিৎকার বা হিংসাত্মক আচরণ দেখতে থাকে, তাহলে সেই আচরণ তার কাছে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক বলে মনে হতে পারে। পরবর্তীকালে সে নিজেও রাগ বা সমস্যার সময় একই ধরনের আচরণ করতে পারে।
৫. চারপাশের পরিবেশ ও মানসিক চাপ
বাড়িতে অশান্তি, পারিবারিক হিংসা, অতিরিক্ত চিৎকার-চেঁচামেচি, সব সময়ের উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ—এসবও শিশুর মনে চাপ তৈরি করতে পারে। শিশুর আচরণ বুঝতে গেলে তাই শুধু শিশুটিকে নয়, তার চারপাশের পরিবেশকেও দেখতে হবে।
৬. মোবাইল, ভিডিও গেম ও সামাজিক মাধ্যম
বর্তমান সময়ে শিশুদের জীবনে মোবাইল ফোন, ভিডিও গেম এবং সামাজিক মাধ্যমের প্রভাব খুব বেশি। অনেক গেমে মারামারি, প্রতিযোগিতা, জয়-পরাজয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বিষয় থাকে। অতিরিক্ত সময় ধরে গেমগুলি নিয়ে খেলা করা বা দীর্ঘক্ষণ মোবাইল ব্যবহারের সঙ্গেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে অস্থিরতা, হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং আক্রমণাত্মক আচরণের সম্পর্ক দেখা গেছে।
তবে শুধু মোবাইল বা ভিডিও গেমকেই শিশুর আগ্রাসী আচরণের একমাত্র কারণ বলা ঠিক নয়। শিশুর পারিবারিক পরিবেশ, মানসিক অবস্থা, স্বভাব এবং অন্যান্য অভিজ্ঞতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুর আগ্রাসী আচরণকে কীভাবে দেখব?
কোনও শিশু যখন আক্রমণাত্মক আচরণ করে, তখন শুধু তাকে দোষ না দিয়ে আমাদের বোঝার চেষ্টা করতে হবে—কেন সে এমন করছে?
তার মনে কি কোনও কষ্ট আছে?
সে কি কোনও বিষয় নিয়ে হতাশ?
বাড়িতে কি কোনও সমস্যা চলছে?
সে কি কোনও মানসিক আঘাতের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে?
নাকি সে নিজের রাগ ও আবেগ কীভাবে সামলাতে হয়, সেটাই এখনও শেখেনি?
এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজে দেখা অত্যন্ত  জরুরি।
মনে রাখতে হবে, শিশুকে ‘খারাপ’, ‘জেদি’ বা ‘মানসিক রোগী’ বলে দাগিয়ে দেওয়া সমস্যার সমাধান নয়। বরং এতে শিশুটি আরও একা হয়ে যেতে পারে।

শাস্তি নয়, দরকার বোঝাপড়া ও সঠিক সাহায্য
আপনার সন্তানের মধ্যে যদি বারবার বা অস্বাভাবিক মাত্রায় রাগ ও আক্রমণাত্মক আচরণ দেখা যায়, তাহলে প্রয়োজনে শিশু মনোবিজ্ঞানী বা উপযুক্ত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।
কঠোর শাস্তি, ভয় দেখানো বা মারধর করে শিশুর আচরণ ঠিক করার চেষ্টা করবেন না। এতে অনেক সময় শিশুর রাগ ও ক্ষোভ আরও বেড়ে যেতে পারে। বরং শিশুর কথা শুনুন, তার অনুভূতিকে বোঝার চেষ্টা করুন এবং তাকে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখান।
একটি শিশুর আচরণ পরিবর্তন করা সম্ভব। তার জন্য দরকার বাবা-মায়ের সময়, ধৈর্য, ভালোবাসা, সঠিক দিকনির্দেশ এবং প্রয়োজনে সময়মতো বিশেষজ্ঞের সাহায্য।

আমরা কী করতে পারি?

শিশু কী বলছে শুনুন। আপনার সন্তানের সঙ্গে সময় কাটান। পারিবারের মধ্যে খোলামেলা পরিবেশ বজায় রাখুন। ছোটদের ভালো কাজে উৎসাহিত করুন।

স্ক্রিন টাইম কম করার চেষ্টা করুন। মানে শিশু কতক্ষণ মোবাইল ফোন বা ভিডিও গেমে সময় কাটাবে তার নির্দিষ্ট সময় তৈরি করুন। বিশেষ করে খাবার সময় এবং ঘুমের আগে এই দুটি জিনিস একেবারে নিষিদ্ধ করুন।

নজর রাখুন বাড়িতে বা স্কুলে আপনার সন্তান সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে কিনা। এই ধরণের একাকীত্ব কিন্তু বিষন্নতার ঝুঁকি বয়ে আনে। আর এরপরই সে অন লাইন গেমে আসক্ত হয়ে পড়ে।

আপনার সন্তানের ভালোলাগাকে মর্যাদা দিন। খুঁজে দেখুন সে কোন খেলা ভালোবাসে। বা কোন সৃষ্টিমূলক কাজে তার উৎসাহ সবচেয়ে বেশি। বাড়ির বাইরে ছোটাছুটি করে খেলাধুলো করলে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত হবে।

কখন চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেবেন?

শিশুর মেজাজে পরিবর্তন বা অতিরিক্ত রাগ, আগ্রাসী মনোভাব।

সব কিছুতেই বিরক্তি বা উদ্বেগ।

সামাজিকভাবে নিজেকে গুটিয়ে রাখার প্রবণতা বা অন্যের সঙ্গে মিশতে না চাওয়া।

লেখাপড়ার মান ক্রমশ খারাপ হওয়া ।

মনোযোগে ঘাটতি।

আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা।

ঘুমের সমস্যা বা অনেক রাত পর্যন্ত মোবাইল ফোন, টিভি ইত্যাদিতে জুড়ে থাকা।

মনে রাখা জরুরি

শিশুর আগ্রাসী আচরণ অনেক সময় শুধুই ‘দুষ্টুমি’ নয়। সেটি তার মনের ভেতরে থাকা কোনও সমস্যা বা কষ্টের সংকেতও হতে পারে।
তাই শিশুকে শাস্তি দেওয়ার আগে তাকে বোঝার চেষ্টা করুন।
এরকম ক্ষেত্রে অভিভাবকদের কী কী করণীয় তার একটি তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন।
শিশুর আগ্রাসী আচরণের লক্ষণগুলি আলাদা করে লিখে রাখতে হবে।

প্রতিবেদন

Lopa Bhowmik