বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
বেলুড় মঠে মহাসাড়ম্বরে হয়ে গেল কুমারী পুজো পাঁজরে হাড় ভেঙে ফুসফুসে, চোরবাগানের ময়নাতদন্তের ভয়াবহ রিপোর্ট টাইগার শ্রফের উপর গুলি, হামলা, গ্রেপ্তার ৩ টাইগার শ্রফকে হামলায় দায়স্বীকার বিষ্ণোই গ্যাংয়ের

গান্ধীজির হাঁটার মধ্যে ছিল প্রতিবাদের ভাষা, হিংসার ভিতরে মানবিকতার সন্ধান

02 October, 2026 10:24 AM Sandipan Saha
শেয়ার করুন

২ অক্টোবর দিনটি শুধু মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিন নয়। এই দিনটিতে প্রশ্ন জাগে সত্য, অহিংসা, সহিষ্ণুতা এবং নৈতিক রাজনীতির জায়গা আজ কোথায়? লিখেছেন সন্দীপন বিশ্বাস

মহাত্মা গান্ধীকে কেবল স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন বিশিষ্ট নেতা হিসেবে দেখলে তাঁর দর্শনের বড় অংশকেই অস্বীকার করা হয়। তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রে ছিল সত্য। কিন্তু গান্ধীর কাছে সত্য শব্দের গভীরতা ছিল অনেক বেশি। সত্য ছিল তার কাছে একট নৈতিক অনুসন্ধান। তাঁর কাছে সত্য ছিল জীবনের অনুশীলন। সেই সত্যের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য ছিল অহিংসা। গান্ধীর অহিংসা দুর্বল মানুষের আত্মসমর্পণ ছিল না। অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করে, প্রতিপক্ষকে ধ্বংস না করেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তিই ছিল তাঁর অহিংসা। তাঁর সত্যাগ্রহ তাই নিছক প্রতিবাদের কৌশল ছিল না, ছিল নৈতিক  প্রতিরোধের এক দর্শন।

আজ সেই সূত্রটিকে ধরেই মহাত্মা গান্ধীকে নতুন করে আবিষ্কার করা প্রয়োজন। তিনি হাঁটছেন ডান্ডিতে। তিনি হাঁটছেন নোয়াখালিতে। তাঁর সেই হাঁটা ছিল শুধু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়া নয়। সেই হাঁটার মধ্যে ছিল প্রতিবাদের ভাষা, মানুষের কাছে পৌঁছনোর রাজনীতি এবং হিংসার ভিতরেও মানবিকতার সন্ধান।

আমরা কি সেই হাঁটার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি? সম্ভবত অনেকটাই। আমরা প্রতিবাদ করতে শিখেছি, কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা ক্রমশ কঠোর হয়েছে। রাজনৈতিক মতভেদ অনেক সময় ব্যক্তিগত বিদ্বেষে পরিণত হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে যুক্তির জায়গা নিয়েছে অপমান, কুৎসা। তথ্যের বদলে চলছে ভুল তথ্য প্রয়োগ আর বিরোধীতার অর্থ এখন ‘শত্রুতা’। এই ভুল পথে হেঁটে চলার মানসিকতার সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় গান্ধীর অহিংস নীতি।

অহিংসাকে দুর্বলতার প্রতীক হিসেবে দেখার ভুল আমরা যত বেশি করব, তত বেশি প্রয়োজন হবে গান্ধীকে। কারণ অহিংসা মানে নিষ্ক্রিয়তা নয়। অহিংসা মানে অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও নিজের ভিতরের হিংসাকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন না করে তার সঙ্গে নৈতিক সংঘাতে যাওয়ার সাহস। ‘লগে রহো মুন্নাভাই’ ছবির মতো গান্ধীজি প্রতিদিন আমাদের পাশে এসে দাঁড়ান। সত্যের পথে, অহিংসার পথে, গণতন্ত্রের পথে চলার কথা বলেন। আমরা শুনতে পাই না। আমাদের মানসিক উন্মত্ততার ভিতরে তিনি হারিয়ে যান। যেদিন তাঁকে আমরা খুঁজে পাব, সেদিন থেকে আবার আমরা সঠিক পথে হাঁটতে শুরু করব।

তাই গান্ধীর প্রাসঙ্গিকতাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তাঁর প্রতিটি বক্তব্যকে প্রশ্নাতীত বলে মেনে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং তাঁর সত্যের অনুসন্ধান, আত্মসমালোচনা এবং নৈতিক সাহসকে আজকের সময়ে প্রয়োগ করতে হবে। তাই আজ আমাদের আবার হাঁটতে হবে। সারা দেশের মানুষকে হাঁটতে হবে। হাঁটতে হবে অহিংসার দিকে। হাঁটতে হবে মনুষ্যত্বের দিকে। হাঁটতে হবে সত্যের লক্ষ্যে। হাঁটতে হবে গণতন্ত্রের দিকে। হাঁটতে হবে দুর্নীতির বিপরীত দিকে। হাঁটতে হবে প্রকৃত শিক্ষার দিকে।

এই হাঁটার পথ একটিমাত্র নয়। মানুষের প্রয়োজনের মতোই তার পথ অজস্র। কোথাও পথ যাবে ন্যায়বিচারের দিকে, কোথাও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দিকে, কোথাও দরিদ্র মানুষের মর্যাদার দিকে, কোথাও যুক্তিবোধ ও শিক্ষার দিকে। কিন্তু প্রতিটি পথের কেন্দ্রে যদি মানুষ থাকে, তাহলে সেই পথের সঙ্গে গান্ধীর দর্শনের একটি যোগসূত্র তৈরি হয়।

আজকের পৃথিবীতে যখন তথ্যের সঙ্গে অপতথ্য মিশে যায়, যখন রাজনৈতিক পরিচয় মানুষের মানবিক পরিচয়কে ছাপিয়ে যেতে চায়, যখন গণতন্ত্রকে শুধু ভোটের অঙ্কে সীমাবদ্ধ করার প্রবণতা দেখা যায়, তখন গান্ধী আমাদের মনে করিয়ে দেন, গণতন্ত্র শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নয়। গণতন্ত্রের নৈতিকতা নির্ভর করে দুর্বলতম মানুষের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার উপরও। তাই গান্ধীকে ফিরিয়ে আনা মানে কোনও রাজনৈতিক স্লোগান ফিরিয়ে আনা নয়। তাঁকে ফিরিয়ে আনা মানে সত্যকে ফিরিয়ে আনা, প্রশ্ন করার সাহসকে ফিরিয়ে আনা, বিরোধী কণ্ঠস্বরকে স্বীকার করা এবং মানুষের প্রতি মানুষের দায়বদ্ধতাকে পুনরুদ্ধার করা।

গান্ধীকে নিয়ে তাই অন্ধ বন্দনা নয়, অন্ধ প্রত্যাখ্যানও নয়। তাঁকে পড়তে হবে, প্রশ্ন করতে হবে, তাঁর সঙ্গে বিতর্ক করতে হবে। কারণ গান্ধী মানে একটি নৈতিক প্রশ্ন। যে সমাজে সত্যের চেয়ে প্রচার শক্তিশালী হয়ে ওঠে, গান্ধী সেখানে প্রশ্ন করেন, সত্য কোথায়? যে রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে শত্রু বানানো একটা কৌশল, সেখানে তিনি প্রশ্ন করেন, অহিংসার জায়গা কোথায়? যে গণতন্ত্রে সংখ্যাই সবকিছু হয়ে ওঠে, সেখানে তিনি প্রশ্ন করেন, তাহলে দুর্বল মানুষের অধিকার কোথায়?

তাই আজ তাঁর জন্মদিনে হয়তো আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাঁকে স্মরণ করা নয়, তাঁর মতো করে হাঁটা। ডান্ডির সেই হাঁটা থেকে নোয়াখালির হাঁটা পর্যন্ত যে পথ মানুষকে মানুষের কাছে নিয়ে গিয়েছিল, সেই পথ আজও শেষ হয়ে যায়নি। সেই দীর্ঘ মানবিক যাত্রাপথে গান্ধী হয়ে উঠুন কোনও মূর্তি নয়, কোনও রাজনৈতিক প্রতীকের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়, তিনি হয়ে উঠুন সভ্যতার ধ্রুবতারা।

 

প্রতিবেদন

Sandipan Saha