প্রস্তুতিতে ‘অসুর’ বৃষ্টি, নষ্ট হচ্ছে মুনাফা, পুজোর আগে উদ্বিগ্ন শিল্পীরা
সংবাদদাতা, কলকাতা: পুজোর বাকি আর মাত্র ২১ দিন। তাই পুজোর প্রস্তুতি জোর কদমে শুরু হয়ে গিয়েছে সর্বত্র। বনেদি বাড়ি থেকে বারোয়ারি পুজো, কোথাও দম ফেলার ফুরসৎ নেই। হাতে মাত্র কয়েকটা দিন, তার পরেই বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো। তাই উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যবাহী কুমোরটুলিতে এখন চরম ব্যস্ততা। শিল্পীদের এখন নাওয়া খাওয়ার সময় নেই। একে একে প্রতিমা রওনা হতে শুরু করেছে বিভিন্ন মণ্ডপ তথা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। কিন্তু উৎসবের এই অন্তিম লগ্নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রকৃতির খামখেয়ালি মেজাজ।
টানা বৃষ্টি ও মেঘলা আকাশের জেরে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে মৃৎশিল্পীদের কপালে। গত কয়েক দিন ধরেই কলকাতার আকাশ মেঘলা। দফায় দফায় নামছে বৃষ্টি, মাঝেমধ্যেই মুষলধারে ভাসছে রাস্তাঘাট। এই বৃষ্টির হাত থেকে সবেমাত্র তৈরি হওয়া উমার মূর্তিগুলোকে বাঁচাতে শেষ মুহূর্তের কাজ ফেলেই ছুটতে হচ্ছে শিল্পীদের। রং বা সাজসজ্জার কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে তড়িঘড়ি প্রতিমা ঢেকে ফেলতে হচ্ছে মোটা প্লাস্টিকে। ফলে স্বাভাবিক কাজের গতি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। মহালয়ার মধ্যেই সিংহভাগ প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করে সেগুলি বিভিন্ন মণ্ডপের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা। বর্তমানে প্রতিমার শেষ পর্যায়ের কাজ যেমন রং করা, দেবীর চোখ আঁকা, শাড়ি পরানো ও অলঙ্কার পরানোর মতো সূক্ষ্ম কাজগুলো চলছিল। কিন্তু আর্দ্র আবহাওয়া ও বৃষ্টির কারণে রং ও মাটি ঠিকমতো শুকোচ্ছে না। ফলে আটকে যাচ্ছে সমস্ত সূক্ষ্ম কারুকাজ। শুধু তাই নয়, কাজ শেষ হওয়ার পর প্রতিমা ট্রাকে বা গাড়িতে তোলার সময়ও তৈরি হচ্ছে নতুন বিপদ। বৃষ্টির জমা জলে ভিজে প্রতিমা নষ্ট হওয়ার প্রবল ঝুঁকি থাকছে। ফলে বাড়তি সতর্কতা হিসেবে প্রতিমাকে আপাদমস্তক প্লাস্টিকে মুড়ে তবেই গাড়িতে তোলা হচ্ছে। এর ফলে প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে, যা শিল্পীদের ভোগান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আবহাওয়া দপ্তর সূত্রে খবর, আপাতত এই বৃষ্টি থামার কোনও পূর্বাভাস নেই। এমনকী পূজার দিনগুলোতে আকাশ পুরোপুরি পরিষ্কার থাকবে কি না, সে বিষয়েও আবহাওয়া অফিস কোনও আশ্বাস দিতে পারছে না। ফলে শহর কলকাতার পুজো কমিটিগুলোও মণ্ডপসজ্জার কাজ নিয়ে ঘোর দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে। এবার গণেশ ও বিশ্বকর্মা পুজো একই সপ্তাহে পড়ায় চাপ বেশি ছিল। ফলে দুর্গা তৈরির কাজ কিছুটা কম গতিতে হয়েছে। শুক্রবার থেকে জোরকদমে কাজ করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু দুপুরের পর ঝেঁপে বৃষ্টি আসায় কাজকর্ম শিকেয় ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়া নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন শিল্পীরা। বৃষ্টিতে কিছু প্রতিমা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাটি গড়িয়ে পড়েছে। না হলে সঠিক সময়ের মধ্যে কাজ সম্পূর্ণ করা সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন: আদানি গোষ্ঠীর ‘শারদ সম্মান’! আটটি পুজো পাবে এন্ট্রি, শুক্রবারই আবেদনের শেষ দিন
পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে কুমোরটুলির প্রতিমা শিল্পী রাজা পাল বলেন,অসুবিধা তো হবেই। সব ধরনের কাজ আটকে যাচ্ছে। টানা কিছুদিন রোদ ছিল, তাই প্রতিমার মাটির প্রাথমিক কাজগুলো সময়মতো করতে কোনও অসুবিধা হয়নি। কিন্তু মহালয়ার ঠিক আগের এই ব্যস্ততম সময়ে আবহাওয়া এমন বিগড়ে যাওয়ায় সমস্যা ভয়ানক আকার ধারণ করেছে। এটাকে বাড়তি ভোগান্তি ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। এরকম বৃষ্টি হলে সমস্যা বাড়বে। যাঁরা ইতিমধ্যেই প্রতিমার বায়না দিয়ে গিয়েছেন তাঁরা নির্দিষ্ট সময় প্রতিমা নিতে চাইবেন। সেটাই এখন সব থেকে বড়ো চিন্তার বিষয়। সঠিক সময় উদোক্তাদের হাতে মূর্তি তুলে দেওয়া নিয়ে চিন্তা বাড়ছে। মৃৎশিল্পীরা বলেন, বৃষ্টির জেরে কিছু প্রতিমার মুখ আগুনে জ্বালিয়ে শোকাতে হয়েছে। বিকালে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর শুরু হয় প্রতিমা তৈরির কাজ। যেহেতু পুজো এগিয়ে আসছে তাই এখন গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, অপর এক শিল্পী মন্টি পাল তাঁর আক্ষেপ ব্যক্ত করে জানান, আমাদের ভোগান্তি অনেক বেশি বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ঠাকুর মণ্ডপে নিয়ে যেতে গিয়ে বড়সড় সমস্যায় পড়তে হয়। জলের ছাট লেগে বা আর্দ্রতায় মাটির কিছু অংশ গলে যায়, পরে আবার নতুন করে মেরামত করতে হয়। পুরো কাজ এখান থেকে নিখুঁতভাবে করে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না, অনেক কাজ মণ্ডপে গিয়ে করতে হচ্ছে। এখন একটাই প্রার্থনা, দ্রুত বৃষ্টি বন্ধ হোক এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হোক। তবে এই বিষয়ে বিশিষ্ট থিম শিল্পী সুশান্ত পাল জানিয়েছেন, থিমের পুজো করতে গেলে আগে থেকেই পরিকল্পনা করে তবেই কাজ শুরু হয়। তবে বৃষ্টিতে রং ও মাটির কাজ করতে কিছুটা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। কিন্তু বৃষ্টির মধ্যেও সময়ের কাজ সময়ে শেষ করতে সেইভাবেই আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছে। তাই মহালয়ার আগেই কাজ শেষ করা হবে বলে জানান তিনি। উৎসবের আলোয় চারপাশ মেতে ওঠার আগে কুমোরটুলির এই আঁধার ও অনিশ্চয়তা শিল্পীদের রাতে ঘুম কড়ে নিয়েছে। এখন শুধু এক চিলতে কড়া রোদের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছেন মণ্ডপের রূপকারেরা।
