ঝুঁকি মাথায় নিয়ে ৪,০০০ কিমি পথ পাড়ি, সঙ্গিনীর খোঁজে অসম্ভবকে সম্ভব করল তিন বুনো কুকুর
সঙ্গিনীর খোঁজে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রেকর্ড তিন আফ্রিকান বুনো কুকুরের। সম্প্রতি তিনটি পুরুষ বুনো কুকুরের যাত্রা প্রত্যক্ষ করেছেন বিজ্ঞানী ও গবেষকরা। প্রজনন সঙ্গী ও নতুন এলাকার খোঁজে জাম্বিয়ার বুক চিরে প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটার (২,৪৮৫ মাইল) পথ অতিক্রম করেছে তারা। এখনও পর্যন্ত কোনও আফ্রিকান স্থলচর স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রজনন সঙ্গীর খোঁজে পাড়ি দেওয়া দীর্ঘতম দূরত্ব এই তিন বুনো কুকুরের যাত্রা।
এই ঘটনা একদিকে যেমন বিজ্ঞানীদের আশার আলো দেখাচ্ছে, তেমনি উন্মোচন করছে বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণীদের জীবনধারণের কঠিন বাস্তবও।
প্রজনন সঙ্গীর খোঁজে দীর্ঘ অভিযান
আফ্রিকান বুনো কুকুর অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী হলেও প্রজননের ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব কিছু প্রাকৃতিক নিয়ম রয়েছে। যে দলে বা ‘প্যাকে’ এরা জন্মায়, সেখানে প্রজনন করা তাদের জন্য সম্ভব নয়। ফলে দুই বা তিন বছর বয়সে পৌঁছলে তাদের সামনে দুটি পথ খোলা থাকে। নিজের দলে অপেক্ষায় থেকে ভবিষ্যতে দলের দায়িত্ব নেওয়া, অথবা দল ছেড়ে সম্পূর্ণ নতুন এলাকায় প্রজনন সঙ্গী ও নতুন ভূখণ্ডের খোঁজে বেরিয়ে পড়া।
প্রকৃতিবিজ্ঞানের ভাষায় এই একমুখী যাত্রাকে বলা হয় ‘ডিপারচার’, যা ঋতুভিত্তিক স্থানান্তরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। পরিযায়ী প্রাণীরা খাদ্য বা বাসস্থানের খোঁজে নির্দিষ্ট সময় অন্তর একই পথে আসা-যাওয়া করে, কিন্তু ‘ডিপারচার’-এর ক্ষেত্রে প্রাণীরা চিরতরে নতুন জীবনের সন্ধানে নতুন ভূখণ্ডের দিকে যাত্রা করে।
জাম্বিয়ায় তিন বুুনোকুকুরের যাত্রাকে সরলরেখায় হিসেব করলে তারা মাত্র ২৬০ মাইলের মতো পথ অতিক্রম করেছিল। কিন্তু চারপাশের বদলে যাওয়া পরিবেশ, বন উজাড় এবং বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে আঁকাবাঁকা পথে চলতে গিয়ে আট মাসে তারা প্রায় ৪,০০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে বাধ্য হয়।
প্রতিকূল ভূখণ্ড ও নগরায়ণ এড়ানোর অসাধারণ দক্ষতা
অভিযানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক বুনো কুকুরগুলির পথ খোঁজার কৌশল। জাম্বিয়ার দ্রুত বদলে যাওয়া ভূদৃশ্যে, যেখানে মানুষের উপস্থিতি দিনে দিনে বাড়ছে, সেখানেই নিজেদের বাঁচিয়ে এগিয়ে গিয়েছে তারা।
জিপিএস ট্র্যাকিং কলার পরানো ছিল এই এই তিনটি কুকুরের। দেশের প্রধান প্রধান বনাঞ্চলগুলির মধ্যে নিপুনভাবে এগিয়ে যায় তাঁরা। পথে খুবই সুচারুভাবে তারা এড়িয়ে যায় বড় বড় শহরের সীমানা, এমনকী জাম্বিয়ার রাজধানী লুসাকা এবং বড় শিল্পাঞ্চলের মতো মানুষের তীব্র ব্যস্ততা ও কোলাহলপূর্ণ এলাকাগুলিকেও সযত্নে পাশ কাটিয়ে যায় তারা। তাদের এই আচরণ প্রমাণ করে, প্রতিকূল পরিবেশ সত্ত্বেও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এরা চরম বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিচ্ছে।
চোরাশিকার ও ফাঁদের মারাত্মক হুমকি
যাত্রাপথ অতিক্রমের দিক থেকে এটি সাফল্য। তবে গবেষণায় লুকিয়ে থাকা করুণ চিত্রটিও প্রকাশ্যে এসেছে। বুনো কুকুরদের এই দীর্ঘ অভিযান মোটেও বিপদমুক্ত ছিল না—মানুষের তৈরি অবৈধ তারের ফাঁদই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই গবেষণায় নজরে রাখা হয়েছিল তিনটি নারী বুনো কুকুরের ওপরও। তারাও প্রায় একই ধরনের একটি মহাকাব্যিক যাত্রা সম্পূর্ণ করার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাদের একজন তারের ফাঁদে আটকে পড়ে।
গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, কোনও সঙ্গী ফাঁদে আটকে মারা গেলে বেঁচে থাকা অন্য সদস্যরা বারবার সেই একই স্থানে ফিরে আসে। জিপিএস ট্র্যাকিংয়ে এই আচরণ পর্যবেক্ষণ করেই গবেষকরা তাদের সঙ্গীর মর্মান্তিক মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হন। তিনটি নারী কুকুরের মধ্যে দু’জনই শেষ পর্যন্ত এই অবৈধ ফাঁদে পড়ে প্রাণ হারায়—যা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেয়, এই বিপন্ন প্রজাতির চলাচলের পথে মানুষ কতটা বড় বাধা ও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে এই যাত্রার গুরুত্ব
বিশ্বজুড়ে অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর পরিভ্রমণের তুলনায় আফ্রিকান বুনো কুকুরের এই ‘ডিপারচার’ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। জাতিসংঘের কনভেনশন অন মাইগ্রেটরি স্পিসিজ-এর তথ্য অনুযায়ী, আফ্রিকার দীর্ঘতম স্থানান্তর ঘটে ওয়াইল্ডবিস্ট বা হরিণজাতীয় প্রাণীদের ক্ষেত্রে, যারা খাদ্য ও জলের খোঁজে তানজানিয়া ও কেনিয়ার মধ্যে ৪০০ মাইলেরও বেশি পথ যাতায়াত করে। আর বিশ্বে একক স্থলচর প্রাণী হিসেবে দীর্ঘতম পরিযায়ী পথ পাড়ি দেয় ‘ক্যারিবু’ (এক ধরনের রেইনডিয়ার), যারা বছরে ৮৩৯ মাইলের বৃত্তাকার ভ্রমণ সম্পন্ন করে। অন্যদিকে ধূসর নেকড়ে এক বছরে ৪,৩৫০ মাইলেরও বেশি পথ অতিক্রম করেছে এমন রেকর্ড আছে।
তবে আফ্রিকান বুনো কুকুরের এই ৪,০০০ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রমের ঘটনা কোনও ঋতুভিত্তিক স্থানান্তর নয়। এটি নিছক বংশবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে একমুখী যাত্রার এক নতুন বিশ্বরেকর্ড।
সংরক্ষণে নতুন আশা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ইকোলজি’-তে প্রকাশিত এই গবেষণা আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিদদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। ১৯৯১ সাল থেকে আফ্রিকান বুনো কুকুর নিয়ে গবেষণা করছেন মন্টানা স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক স্কট ক্রিল। তাঁর মতে, সংরক্ষিত ও ঘেরা এলাকা বাদ দিলে পূর্ব ও দক্ষিণ আফ্রিকার সমস্ত প্রধান বুনো কুকুরের দলগুলি এখনও একে অপরের সঙ্গে দূর থেকে হলেও সংযুক্ত থাকতে পারে—এই যাত্রা তারই একটি প্রমাণ। তবে তিনি এও সতর্ক করেছেন, সংরক্ষণ বিজ্ঞানে পরিস্থিতি একই সঙ্গে আশাব্যঞ্জক এবং উদ্বেগজনক—একদিকে প্রাণীদের বেঁচে থাকার লড়াই, অন্যদিকে চোরাশিকারিদের ফাঁদের আতঙ্ক, এই দুইয়ের সংমিশ্রণে বন্যপ্রাণ এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বর্তমানে গোটা আফ্রিকা জুড়ে মাত্র প্রায় ৬,০০০টি আফ্রিকান বুনো কুকুর অবশিষ্ট রয়েছে, যা তাদের আফ্রিকার অন্যতম বিরল শিকারি প্রাণীতে পরিণত করেছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য গবেষণায় ‘ওয়াইল্ডলাইফ করিডোর’ বা বন্যপ্রাণী চলাচলের প্রাকৃতিক পথ তৈরির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ সংক্রান্ত সংগঠন ‘দ্য নেচার কনজারভেন্সি’-র সংরক্ষণ বিভাগের পরিচালক এবং গবেষণাপত্রের অন্যতম লেখক ব্রুস সোয়ান্ডারের মতে, বুনো কুকুর বা হাতির মতো প্রাণী, যারা বিশাল এলাকাজুড়ে ঘুরে বেড়ায়, তাদের ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখতে হলে সংযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশের কোনও বিকল্প নেই। সংরক্ষিত বনাঞ্চলগুলিকে বিচ্ছিন্ন ‘দ্বীপ’ হিসেবে দেখে দীর্ঘমেয়াদে সুফল আশা করা যায় না বলেই মনে করেন তিনি।
মানুষের বসতি, শিল্পায়ন এবং কৃষিকাজের কারণে বনাঞ্চলগুলি ক্রমশ আলাদা টুকরোয় ভাগ হয়ে পড়ছে। এই বিচ্ছিন্ন বনগুলির মধ্যে সুরক্ষিত প্রাকৃতিক করিডোর তৈরি করা গেলে বুনো কুকুর-সহ অন্যান্য বিপন্ন প্রজাতিগুলি নিরাপদে প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির সুযোগ পেতে পারে। জাম্বিয়ার বুনো কুকুরদের এই যাত্রা যেন সেটাই প্রমাণ করে দিয়েছে। প্রকৃতিকে সামান্য সুযোগ ও সুরক্ষা দিলে বিপন্ন প্রাণীরাও নিজেদের অস্তিত্বের লড়াইয়ে জিতে যেতে পারে।
