বাংলা ভাষার বিশ্বনাগরিক কেতকী কুশারী ডাইসন প্রয়াত
সংবাদদাতা, কলকাতা: প্রয়াত বিশিষ্ট কবি, লেখিকা, অনুবাদক ও গবেষক কেতকী কুশারী ডাইসন। বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ১১ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সাহিত্য হারাল এমন এক সৃষ্টিশীল মানুষকে, যিনি ভৌগোলিক দূরত্বকে কখনও মাতৃভাষার সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করতে দেননি।
১৯৪০ সালের ২৬ জুন তৎকালীন পূর্ববঙ্গে জন্ম কেতকী কুশারীর। পরে কলকাতায় এসে বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনার পর উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি দেন অক্সফোর্ডে। জীবনের বড় একটা সময় ব্রিটেনে কাটালেও বাংলা ভাষা ও বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনও ছিন্ন হয়নি। বাংলা ও ইংরেজি, দুই ভাষাতেই তিনি লিখেছেন।
তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় বহুমাত্রিক। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, অনুবাদ এবং গবেষণার প্রতিটি ক্ষেত্রেই ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। তাঁর লেখায় যেমন ছিল বাংলা সমাজ ও সংস্কৃতির স্মৃতি, তেমনই ছিল প্রবাসী জীবনের অভিজ্ঞতা, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংকট এবং দুই ভিন্ন জগতের মধ্যে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা।
বুদ্ধদেব বসুকে তিনি কথা দিয়েছিলেন, বাংলা ভাষায় লিখবেন। সেই প্রতিশ্রুতি তিনি পালন করেছিলেন আজীবন। ব্রিটেনে বসবাস করেও বাংলা সাহিত্যকে নিজের সৃষ্টির প্রধান আশ্রয়গুলির একটি করে রেখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর সাহিত্য ও গবেষণার অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং আর্জেন্তিনার লেখিকা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সম্পর্ক নিয়ে তাঁর গবেষণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
কেতকী কুশারীর জীবন আসলে দুই ভূগোলের মধ্যে এক দীর্ঘ সেতুবন্ধনের গল্প। একদিকে কলকাতা, বাংলা ভাষা, রবীন্দ্রনাথ ও বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতি; অন্যদিকে অক্সফোর্ড, ব্রিটেন এবং প্রবাসী জীবনের বহুস্বর। তাঁর লেখায় এই দুই পৃথিবী মুখোমুখি হয়েছে, কখনও সংঘাতে, কখনও মেলবন্ধনে। তাঁর বইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘বল্কল’,’সজীব পৃথিবী’, ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সন্ধানে’, ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’, ‘কাছে-দূরের কক্ষপথে’ ইত্যাদি।
পিতৃদত্ত পদবি ছিল বসু। বিবাহ করেছিলেন পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র রবার্ট ডাইসনকে। জীবনের শেষ কয়েকটি বছর তাঁর জন্য ছিল কঠিন। দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরও লেখালেখি ও স্মৃতিচারণের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হয়নি। নিজের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা এবং সাহিত্যিক জীবন নিয়ে তিনি লিখে গিয়েছেন। তাঁর আত্মস্মৃতির লেখাগুলিতে বয়স, সময় ও ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসা দৃষ্টির সঙ্গে তাঁর নিজের লড়াইয়ের কথাও উঠে এসেছে। তাঁর প্রয়াণে দুই ভাষায় সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে একটা তার ছিন্ন হল।
