বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
টাইগার শ্রফের উপর হামলায় ধৃত আরও ৪ আজ বিজয়া দশমী, ঘাটে ঘাটে চলছে প্রতিমা নিরঞ্জন ভারতের সঙ্গে চুক্তি অন্যরকম, জানালেন ট্রাম্প দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে দশেরা

বিপর্যয় কি শুধু প্রকৃতিতে, সামাজিক ভাবনায় নয়?

31 August, 2026 3:35 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

গত কয়েকদিন সংবাদের শিরোনামে ছিল নেপাল। সেখানকার হড়পা বানের বিপর্যয় কেড়ে নিয়েছে বহু মানুষের প্রাণ। এখনও নিখোঁজ হাজার হাজার মানুষ। বেশ কয়েকদিন ধরে সংবাদের শিরোনামে উঠে এসেছিল একটি বিপর্যয়ের একের পর এক ব্রেকিং নিউজ। ছবি, ভিডিও দেখতে মানুষ আকুল হয়ে উঠেছিলেন। সংবাদমাধ্যমের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ‘ব্রেকিং নিউজ’, সামাজিক মাধ্যমে উদ্বেগ, ক্ষোভ, সহানুভূতির ঢল দেখা গিয়েছিল। সব মিলিয়ে মনে হয়, গোটা পৃথিবী যেন সেই দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।

তারপর? সাধারণত দেখা যায়, যেকোনও বিপর্যয়ের পর কয়েক দিন কেটে গেলে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে থাকলে মানুষের মনে সেই স্মৃতি ধীরে ধীরে হালকা হতে থাকে। হয় নতুন কোনও রাজনৈতিক বিতর্ক উঠে আসে। কিংবা কোনও তারকার মন্তব্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। নতুন কোনও অপরাধের খবর শিরোনাম দখল করে। আর যে বিপর্যয় কয়েক দিন আগে পর্যন্ত আমাদের চোখে জল এনে দিয়েছিল, তা ধীরে ধীরে সরে যায় খবরের প্রথম পাতা থেকে। কমতে থাকে মানুষের আগ্রহ। তখন যেন লড়াইটা হয়ে দাঁড়ায় একক, সেই বিপর্যস্ত মানুষটির।

কিন্তু বিপর্যয় কি সত্যিই শেষ হয়ে যায়? নেপালের সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো ঘটনাগুলি আমাদের আবার সেই পুরনো প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। পাহাড়ে ধস, নদীর জলস্ফীতি, উদ্ধার অভিযান হয়তো একসময় থেমে যায়। মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থামিয়ে প্রকাশিত হয় সরকারি রিপোর্ট। কিন্তু যে মানুষটি নিজের বাড়ি হারিয়েছে কিংবা যে পরিবারের নিকটজন আজও নিখোঁজ, যার সন্ধান দিতে পারল না কোনও সরকারি রিপোর্ট, তার পারিবারিক বিপর্যয় কি শেষ হয়ে গেল? যে শিশুটি পরিবার হারিয়েছে, তার কাছে কি উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার অর্থ জীবন স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া? যে কৃষক জমি হারিয়েছে, যে ছোট ব্যবসায়ী তার দোকান হারিয়েছে, যে পরিবারটি রাতারাতি ত্রাণশিবিরের বাসিন্দা হয়ে উঠেছে, তাদের জন্য বিপর্যয় আসলে শুরু হয় খবরের ক্যামেরা চলে যাওয়ার পর। কোনও ক্ষতিপূরণই আর তাকে আগের জীবনে ফিরিয়ে দিতে পারে না। অথচ সেই সময়টুকুতে তাদের প্রতি আমাদের আর কোনও আগ্রহ থাকে না। এটা কি সত্যিই একজন সামাজিক জীব হিসাবে আমাদের উচিত?

আসলে আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত স্মৃতি-স্বল্পতা। আমরা দ্রুত উত্তেজিত হই, দ্রুত আবেগপ্রবণ হই এবং আর তার থেকেও দ্রুত ভুলে যাই। ডিজিটাল যুগ আমাদের কাছে তথ্যের গতি বাড়িয়েছে, কিন্তু সেই সঙ্গে কমিয়ে দিয়েছে মনোযোগের স্থায়িত্ব। একটি বিপর্যয়ের ছবি খুব সহজে ভাইরাল হয়, কিন্তু পুনর্বাসনের দীর্ঘ লড়াই নিয়ে আমাদের আগ্রহ কমে যায়। কারণ সেখানে নেই নাটকীয় দৃশ্য, নেই প্রতিদিনের নতুন উত্তেজনা। আছে শুধু ধৈর্য, প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং মানুষের দীর্ঘ অপেক্ষা।

আজ নেপালের ঘটনা সমগ্র সংবাদ মাধ্যম এবং সমাজের কাছে একটা বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে। সে প্রশ্ন আত্মসমালোচনার প্রশ্ন। সংবাদ কি শুধু কোনও ক্ষণিক মুহূর্তের? যখন আগুন জ্বলছে, নদী উপচে পড়ছে অথবা একটি বাড়ি ভেঙে পড়ছে? নাকি সংবাদ সেই দীর্ঘ সময়ের, যখন দুর্গত মানুষটি সরকারি সাহায্যের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে? প্রথম দিনের ছবি আমাদের আকর্ষণ করে, কিন্তু ষষ্ঠ মাসের পুনর্বাসন রিপোর্ট হয়তো ততটা পাঠক টানে না। তবুও সেই খবরটিই হয়তো মানুষের জীবনের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটা ভেঙে পড়া মানুষের জীবনে যেন আলো জ্বালানোর কোনও প্রাক মুহূর্ত। অথচ খবরের বিচারে তার কোনও গুরুত্বই থাকে না। কী সংবাদ মাধ্যমের কাছে, কী সাধারণ মানুষের কাছে!

বিপর্যয়কে আমরা প্রায়শই একটি সংখ্যা দিয়ে বিচার করি। কতজন মারা গেল, কতজন নিখোঁজ, কত কোটি টাকার ক্ষতি, এসবই হয়ে ওঠে বিচার্য বিষয়। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পিছনে রয়েছে একটি সম্পূর্ণ জীবন, একটি পরিবার এবং তাকে কেন্দ্র করে ওই পরিবারের সকলের ভবিষ্যৎ। সুতরাং একটি মৃত্য ও একটি নিখোঁজের অর্থ একটি স্বপ্নের সমাপ্তি।

আরও একটি বিষয় আজ বিশেষভাবে ভাবার সময় এসেছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে আমরা যত সহজে ‘প্রকৃতির রোষ’ বলে দায় এড়িয়ে যাই, বাস্তব ঘটনা কিন্তু ততটা সহজ নয়। পাহাড়ে অপরিকল্পিত নির্মাণ, নদীর স্বাভাবিক গতিপথে হস্তক্ষেপ, অরণ্য ধ্বংস, জলবায়ু পরিবর্তন, এসব মানুষের উন্নয়নের ধারণার সঙ্গে প্রকৃতির সংঘাত আজ বহু বিপর্যয়কে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। বিপর্যয় শেষ হলে তাই শুধু ক্ষতিপূরণের হিসাব করলেই চলবে না। প্রশ্ন করতে হবে, এই বিপর্যয় থেকে আমরা কী শিখলাম? সত্যিই কি কিছু শিখলাম, আবার আমাদের কোনও ভুল এমন একটা বিপর্যয় ডেকে আনবে না তো?

আজ নেপালে হয়েছে, কাল হয়তো অন্য কোনও দেশেও এমন বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটতে পারে। আজ পাহাড়ি অঞ্চলে হয়েছে, কাল হতে পারে কোনও নদী এলাকায়। আসলে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কোনও রাজনৈতিক সীমানা নেই। একটি অঞ্চলের বা একটি দেশের পরিবেশগত বিপর্যয় ক্রমশ অন্য অঞ্চলের বা অন্যান্য দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং জনজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।

তাই আজ সবক্ষেত্র নতুন করে ভাবার সময় এসেছ। বিপর্যয়ের সংবাদকে শুধু একটি দিনের ‘ব্রেকিং নিউজ’ হিসেবে দেখার সময় শেষ। সেই ভাবনাটুকুকে বড় করে দেখার যে ভাবনা, সেটাকে এবার ভুলে যাওয়ার সময় সমুপস্থিত। প্রশাসনের দায়িত্ব শুধু উদ্ধার অভিযান চালানো নয়, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। আর সমাজের দায়িত্ব শুধু মুহূর্তের আবেগে সহানুভূতি দেখানো নয়, দুর্গতদের আলোর পথে, সামাজিক স্থিতাবস্থার পথে ফিরিয়ে আনাটাও অত্যন্ত জরুরি। সুতরাং একটি বিপর্যয় তখনই প্রকৃত অর্থে শেষ হয়, যখন মানুষ আবার নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারে, যখন একটি শিশু আবার স্কুলে যেতে পারে, কিংবা যখন হারিয়ে যাওয়া জীবিকার পথে আবার কেউ ফিরে যেতে পারে। এর দায়িত্ব বর্তায় পুরো সমাজের ওপর। সেটা মনে রাখলে তবেই আমরা সকলে একসঙ্গে হাত মিলিয়ে বিপর্যয়ের মোকাবিলা করতে পারব।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee