যুদ্ধ আবহেই কিরগিজস্তানে মুখোমুখি মোদী-পেজেশকিয়ান
নয়াদিল্লি : মধ্যপ্রাচ্যে ঘনীভূত হওয়া তীব্র যুদ্ধাবস্থা এবং চরম ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ করল ভারত। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে আয়োজিত সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দুই রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে এটাই প্রথম মুখোমুখি আলোচনা।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ‘তাসনিম’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। একই সঙ্গে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে যৌথ সহযোগিতা জোরদার ও সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ জোর দেন দুই নেতাই। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাঘচিসহ সেদেশের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের প্রেক্ষাপট ও কৌশলগত গুরুত্ব:
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে এই মোলাকাত অত্যন্ত সংবেদনশীল ও অর্থবহ। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দীর্ঘকাল ধরেই ইরান ভারতের অন্যতম শীর্ষ দশ বাণিজ্য সহযোগীর একটি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং স্ট্রেইট অব হরমুজ (Hormuz Strait) বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে দুই দেশের মধ্যকার স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দুই শীর্ষ নেতার সশরীরে মুখোমুখি বসা ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্য ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিশেষ বার্তা বহন করছে।
এর আগে গত জুনে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। সে সময় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির সর্বশেষ তথ্য মোদীকে জানান পেজেশকিয়ান। মোদীও সংঘাত নিরসনে পৌঁছানো সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়ে ওই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার আহ্বান জানান।
বিশকেকের বৈঠকে পেজেশকিয়ান পুনরায় স্পষ্ট করেছেন যে ইরান কোনোভাবেই যুদ্ধ চায় না, তবে বহিরাগত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তারা কঠোর জবাব দেবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি ইরানি দ্বীপে নতুন করে সামরিক হামলা চালানোর পরই পেজেশকিয়ানের এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা বিশ্ব অর্থনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য চরম ক্ষতিকারক।
এসসিও সম্মেলনের গুরুত্ব তুলে ধরে ইরানি প্রেসিডেন্ট বলেন, “বিশ্বে যখন কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছে, তখন এই ধরনের সম্মেলন বৈশ্বিক মঞ্চে বৈচিত্র্যময় ও স্বাধীন কণ্ঠস্বরের উপস্থিতির এক বলিষ্ঠ প্রতীক।”
আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা ও পুতিনের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠক:
এসসিও সম্মেলনের মঞ্চকে কাজে লাগিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ানের সঙ্গেও এক পৃথক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেন। প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, ফার্মাসিউটিক্যালস, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, সংস্কৃতি এবং শিক্ষার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভারত-আর্মেনিয়া সম্পর্ককে কীভাবে আরও সুদৃঢ় করা যায়, তা নিয়ে বিশদ আলোচনা হয় দুই নেতার মধ্যে। পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি সহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংকট নিয়ে উভয় নেতা মতবিনিময় করেন।
বিশকেক সফরকালেই প্রধানমন্ত্রী মোদীর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করার কথা রয়েছে। এছাড়া কিরগিজস্তানের প্রেসিডেন্ট সাদির জাপারোভের আমন্ত্রণে ষষ্ঠ ‘ওয়ার্ল্ড নোম্যাড গেমস’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন পর্বেও যোগ দেবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। সব মিলিয়ে উত্তপ্ত বিশ্ব রাজনীতির আবহে বিশকেকের এই শীর্ষ সম্মেলন কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
