বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ফারাক্কায় ধস, বাতিল উত্তরবঙ্গগামী সব ট্রেন নিউটাউনে উত্তম কুমার ফিল্ম সেন্টারের শিলান্য়াস মুখ্য়মন্ত্রীর নেপালে ৯ দিন পর সুড়ঙ্গ থেকে উদ্ধার ২ শ্রমিক অভিষেকের ক্য়ামাক স্ট্রিটের অফিস খালির নির্দেশ

জলপ্রলয়েও মাথা উঁচু করে খাড়া সবুজ বাড়ি, কীভাবে? উত্তর দিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিজ্ঞান

31 August, 2026 3:12 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

কাঠমান্ডু : চারদিকে শুধু হাহাকার আর ধ্বংসলীলা।

পাহাড়ি নদীর দাপটে ভেসে যাচ্ছে একের পর এক বহুতল। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড পাথর, কাদা আর উপড়ে আসা বিশাল গাছের গুঁড়ি মেশানো কাদা-জলের স্রোত যে পথ দিয়েই যাচ্ছে, নিমেষের মধ্যে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে আস্ত জনপদকে। অথচ সেই সর্বগ্রাসী প্রলয়ের মাঝখানেই অলৌকিকভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রইল একটি সাধারণ সবুজ রঙের দোতলা বাড়ি। চতুর্দিক থেকে যখন মৃত্যুর হাতছানি, তখন সেই ছোট্ট বাড়িটির ব্যালকনিতে জড়ো হয়ে কোনওক্রমে প্রাণ আঁকড়ে ধরেছিলেন একটি পরিবারের সদস্যরা। চারপাশের সবকিছু ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলেও অক্ষত থেকে গেল বাড়িটি, বেঁচে গেলেন বাসিন্দারাও।

নেপালের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘটে যাওয়া এই রোমহর্ষক ঘটনার একটি ভিডিও সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) ভীষণভাবে ভাইরাল হয়েছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের নজিরবিহীন তাণ্ডবের মধ্যেও এই নির্দিষ্ট বাড়িটি কীভাবে সশব্দে ভেঙে না পড়ে টিকে রইল, তা নিয়েই এখন বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক চর্চা। নিছক ভাগ্য, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে বিজ্ঞানের কোনো চমৎকার কৌশল? বিতর্ক ও কৌতুহলের জবাব দিতে এগিয়ে এসেছেন স্থাপত্য ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, এই অলৌকিক আত্মরক্ষার পেছনে ভাগ্য নয়, বরং কাজ করেছে নিখুঁত পরিকাঠামোগত বিজ্ঞান ও সঠিক নির্মাণশৈলী।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, পাশপাশের সব শক্তিশালী আধুনিক ভবন কাদার তোড়ে এক নিমেষে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়লেও এই ছোট বাড়িটি কোন জাদুতে দাঁড়িয়ে রইল? ‘আর্কিটেকচার প্রেজেন্টেশন’ নামক একটি বিশেষজ্ঞ সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের তরফ থেকে বিষয়টি বিশদভাবে বিশ্লেষণ করে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ তুলে ধরা হয়েছে।

১. রিইনফোর্সড কনক্রিট ফ্রেমের শক্তি (RCC Frame Structure):

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, নেপালের হিমালয় সংলগ্ন পার্বত্য উপত্যকাগুলিতে তৈরি হওয়া অধিকাংশ সাধারণ বাড়িই ঐতিহ্যবাহী পাথর ও সুরকি-সিমেন্টের গাঁথুনি (Stone Masonry) দিয়ে নির্মিত হয়। এই ঘরগুলিতে কোনো শক্তপোক্ত রিইনফোর্সড কনক্রিট ফ্রেম বা আরসিসি কাঠামো থাকে না। সাধারণ স্থাপত্য নকশা যেকোনো ভবনের ওপর থেকে আসা লম্বালম্বি চাপ বা ওজন (Vertical Load) সহ্য করতে সক্ষম। কিন্তু যখন বন্যা বা হড়পা বানের মতো ভয়াবহ বিপর্যয় আসে, তখন কাদা ও জলের প্রচণ্ড একটি দেওয়াল এসে পাশ থেকে ধাক্কা মারে, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ল্যাটেরাল প্রেশার’ (Lateral Pressure)। সাধারণ পাথরের তৈরি দেওয়াল এই পার্শ্বীয় চাপ সহ্য করতে না পেরে ভেতরের দিকে দুমড়ে-মুচড়ে ভেঙে পড়ে।

ভাইরাল হওয়া সবুজ বাড়িটির ক্ষেত্রে প্রধান পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল এর মজবুত কঙ্কাল। এটি তৈরি করা হয়েছিল রিইনফোর্সড কনক্রিট ফ্রেম দিয়ে। বাড়িটির ভিত (Foundation), স্তম্ভ (Columns) এবং বিমগুলো (Beams) একটানা শক্ত লোহার রড (Steel Rebar) দিয়ে পরস্পরের সঙ্গে শক্তভাবে বাঁধা ছিল। ফলে পুরো বাড়িটি আলাদা আলাদা কোনো দেওয়াল না হয়ে একটি মাত্র অখণ্ড ও অত্যন্ত দৃঢ় কাঠামো বা ‘রিজিড স্কেলেটন’-এর মতো কাজ করছিল। প্রবল কাদা ও জলের ধাক্কা যখন বাড়িটির ওপর আছড়ে পড়ে, তখন তার শক্তিশালী কঙ্কালটি সেই বিশাল পার্শ্বীয় শক্তিকে সম্পূর্ণ শুষে নেয় এবং নিরাপদে তা মাটির গভীরে স্থানান্তরিত (Transfer) করে দেয়। ফলে বাড়িটি ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা পায়।

২. ভৌগোলিক অবস্থান ও স্রোতের গতিপথ:

কাঠামোগত শক্তি ছাড়াও বাড়িটি বেঁচে যাওয়ার পেছনে আরও একটি বড় ভৌগোলিক কারণ কাজ করেছে। বাড়িটি একেবারে নদীর মূল বা গভীরতম গতিপথের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত ছিল না। হড়পা বানের জল যখন বিশাল প্রকাণ্ড পাথর আর কাদা নিয়ে বয়ে আসছিল, তখন তা উপত্যকার সবচেয়ে গভীর খাদ বা কেন্দ্রীয় চ্যানেল ধরেই ধেয়ে আসছিল। সবুজ বাড়িটি মূল পথ থেকে সামান্য উঁচুতে এবং একটু পাশে অবস্থান করছিল।

৩. কমপ্যাক্ট গঠন ও প্রাকৃতিক ঢাল (Natural Deflection):

বাড়িটির আয়তন ও আকৃতি ছিল অত্যন্ত সুসংহত বা কমপ্যাক্ট। এর সুষম গঠনের কারণে জলের প্রচণ্ড তোড় সামনে ধাক্কা খেয়ে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায় এবং বাড়িটির দুই পাশ দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে। প্রথম ধাক্কায় বাড়িটির চারপাশে যে কাদা জমা হতে শুরু করেছিল, তা কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি কৃত্রিম বা প্রাকৃতিক র‌্যাম্পের (Natural Ramp) রূপ নেয়। এর ফলে পরবর্তী সময়ে আসা জলের বিশাল বিশাল ঢেউ ও ধ্বংসাবশেষ সরাসরি বাড়িতে আঘাত না করে ওই কাদামাটির ঢাল বেয়ে ধাক্কা না মেরেই পাশে সরে যায়।

উল্লেখ্য, নেপালের এই সাম্প্রতিক ভয়াবহ প্লাবন ও হড়পা বানে ইতিমধ্যেই ৭০০-র বেশি মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৩,০০০-এরও বেশি মানুষ। স্বজনহারা আর গৃহহীন মানুষের হাহাকারে বাতাস যখন ভারী, তখন এই সবুজ বাড়িটির বেঁচে থাকার গল্প কেবল একটি অলৌকিক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং পাহাড়ি অঞ্চলে সঠিক স্থাপত্যবিজ্ঞান মেনে ঘরবাড়ি তৈরির প্রয়োজনীয়তাকেও নতুন করে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee