অনলাইন গেমের ঋণ শোধ করতে দাদুকে খুন ! পুলিশের জালে নাতি ও তার বন্ধু
মালদহ : বিয়েথা করেননি, সংসার বলতে ছিল বোন, ভাগ্নে আর নাতি-নাতনিরা।
কলকাতায় হলুদের ব্যবসা সামলে সুযোগ পেলেই মালদহের পৈতৃক বাড়িতে ছুটে আসতেন প্রৌঢ় ব্যবসায়ী অর্ণব সেন (৬০)। তবে এবার আর প্রিয়জনদের মাঝে কাটানো দিনগুলো আনন্দে ভরা রইল না। বৃহস্পতিবার বাড়িতে এসে নাতি-নাতনিদের হাত থেকে আদরের রাখি পরার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নৃশংসভাবে খুন হতে হলো তাঁকে। আর এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পেছনে যার হাত ছিল, সে আর কেউ নয়—খোদ নিহতেরই দূর সম্পর্কের ২২ বছরের নাতি! অনলাইন গেম খেলে ঘাড়ে চেপে বসা লাখ লাখ টাকার ঋণ মোতেই দাদুকে খুনের ছক কষেছিল সে। ঘটনার মাত্র ১২ ঘণ্টার মধ্যেই ঘটনার রফা করে অভিযুক্ত নাতি ও তার বন্ধুকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে খবর, ধৃতদের নাম শুভজিৎ ঘোষ এবং তার বন্ধু কৌশিক ঘোষ ওরফে পচা। শুভজিৎ নিহতের দূর সম্পর্কের নাতি। শুক্রবার সকালে মালদহ শহরের ২ নম্বর গভর্নমেন্ট কলোনি এলাকার একটি ত্রিতল বাড়ির একতলার ঘর থেকে অর্ণববাবুর ক্ষতবিক্ষত দেহ উদ্ধার হয়। গলায় ছিল ধারালো অস্ত্রের গভীর ক্ষত। ঘর জোড়া লন্ডভন্ড পরিস্থিতি এবং খোলা আলমারি দেখে শুরুতেই ডাকাতি ও খুনের সন্দেহ জোরদার হয়।
তবে তদন্তে নেমে ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেয় ঘরের ভেতরের কয়েকটি সূক্ষ্ম প্রমাণ। ঘরে ঢুকে পুলিশ দেখে, তখনও ইন্ডাকশন ওভেনটি ‘অন’ হয়ে রয়েছে এবং টেবিলে পড়ে রয়েছে চায়ের কষ লেগে থাকা দুটো খালি কাপ। ঘর গোছানো থাকলেও অতিথির পরিচর্যায় কোনো ত্রুটি রাখেননি প্রৌঢ়। সেই চায়ের কাপই পুলিশকে নিশ্চিত করে তোলে যে, আততায়ী একজন নয়, একাধিক; এবং তারা অর্ণববাবুর অত্যন্ত পরিচিত লোক।
তদন্তে নেমে সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখার পাশাপাশি নিহতের খোয়া যাওয়া মোবাইল ফোনটির লোকেশন ট্র্যাক করতে শুরু করে পুলিশ। দেখা যায়, মোবাইলটি ঘটনাস্থল থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে রয়েছে। সেই সূত্রের জের ধরেই পুলিশের জাল গিয়ে পড়ে শুভজিৎ ও কৌশিকের ওপর। জেরা করতেই বেরিয়ে আসে আঁতকে ওঠার মতো সত্য।
পুলিশের কাছে অপরাধ স্বীকার করে অভিযুক্তরা জানায়, তারা দু’জনেই অনলাইন গেমে প্রবলভাবে আসক্ত ছিল। খেলায় হেরে শুভজিতের দেনা হয়েছিল প্রায় তিন লক্ষ টাকা এবং কৌশিকের প্রায় এক লক্ষ টাকা। দেনার টাকা শোধ করার জন্য তারা বিত্তশালী ব্যবসায়ী দাদুকে নিশানা করে। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ দুই যুবক গল্প করার বাহানায় অর্ণববাবুর বাড়িতে আসে। দাদু সস্নেহে ইন্ডাকশনে চা বসিয়ে তাদের আপ্যায়ন করেন। চা খাওয়া শেষ হলে প্রৌঢ় যখন বলেন, “তোরা এবার যা, আমি ঘুমোতে যাব,” ঠিক তখনই নাতি দাদুর কাছে কয়েক লক্ষ টাকা দাবি করে বসে। অর্ণববাবু সেই টাকা দিতে অস্বীকার করতেই শুরু হয় হামলা।
প্রথমে অর্ণববাবুর মুখে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা চালানো হয়। এরপর সঙ্গে আনা ধারালো অস্ত্র দিয়ে সজোরে কোপ মারা হয় তাঁর গলায়। রক্তভেজা দেহে তিনি লুটিয়ে পড়ার পর প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে দাদুর ঘরের আলমারি ও জিনিসপত্র তছনছ করে টাকা ও গয়না খোঁজে দুই যুবক। খুনের পর নিহতের ফোনটি নিয়ে তারা চম্পট দেয়।
মালদহের পুলিশ সুপার অনুপম সিংহ জানান, “দুই অভিযুক্তই অনলাইন গেম খেলে বাজারে প্রচুর দেনা করে ফেলেছিল। সেই ঋণ শোধ করতেই প্রৌঢ়কে খুনের ছক কষা হয়। ১২ ঘণ্টার মধ্যে দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, খোয়া যাওয়া ফোন উদ্ধার হয়েছে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে আর কী কী চুরি হয়েছে তা জানার চেষ্টা চলছে।” স্বজনের হাতে নিঃসঙ্গ প্রৌঢ়ের এই করুণ পরিণতিতে থমথমে গোটা এলাকা।
