সাত কর্মী সংগঠনের ডাকে দেশজুড়ে ব্যাংক ধর্মঘট
সংবাদদাতা: সাতটি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক কর্মী ও অফিসার সংগঠনের যৌথ মঞ্চের আহ্বানে শুক্রবার দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে ২৪ ঘণ্টার পূর্ণাঙ্গ ব্যাংক ধর্মঘট। কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যাংক-সংক্রান্ত বিভিন্ন নীতি, বকেয়া দাবিদাওয়া পূরণ না হওয়া এবং কর্মীদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপের প্রতিবাদে এই আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। জলপাইগুড়ি জেলা জুড়েও এই ধর্মঘটের সর্বাত্মক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। সকাল থেকেই জেলার সরকারি, রাষ্ট্রায়ত্ত ও কিছু বেসরকারি ব্যাংকের মূল ফটকে ঝুলছে তালা। স্তব্ধ হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক লেনদেন ও প্রশাসনিক কাজ, যার সরাসরি মাশুল গুনতে হচ্ছে হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে। জলপাইগুড়ি শহরের দিনবাজার, কদমতলা, ডিবিসি রোডসহ মহকুমা ও গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাগুলির ব্যাংক শাখাগুলিতে সকাল থেকেই ছবিটা ছিল একই রকম। জরুরি দরকারে, চিকিৎসার টাকা তুলতে কিংবা ব্যবসায়ী লেনদেনের কাজে ব্যাংকে এসে গ্রাহকদের খালি হাতে ফিরে যেতে হচ্ছে। অনেক জায়গায় ব্যাংকের দরজায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে ধর্মঘটের ব্যানার ও পোস্টার। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন বয়স্ক নাগরিক, পেনশনভোগী এবং দূরদূরান্ত থেকে আসা গ্রামীণ এলাকার মানুষেরা। ব্যাংকের পাশাপাশ অধিকাংশ এটিএম কেন্দ্রগুলিতেও টাকা না থাকায় বা পরিষেবা স্তব্ধ থাকায় ক্যাশ উত্তোলনের কোনো বিকল্প উপায় পাচ্ছেন না গ্রাহকেরা। ডিজিটাল ব্যাঙ্কিং ব্যবহারে যারা অভ্যস্ত নন, তাদের ভোগান্তি চরম রূপ নিয়েছে। ধর্মঘটকারী সাতটি কর্মী সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে তারা যৌথভাবে কতগুলি মৌলিক দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বারবার দরকষাকষি ও আলোচনার পরেও কর্তৃপক্ষের ইতিবাচক সাড়া না মেলাতেই এই চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছেন তারা। তাদের মূল দাবি রয়েছে, অবিলম্বে সপ্তাহে ৫ দিন কাজের দিন ঘোষণা করা। ব্যাঙ্কিং এর ক্ষেত্রে দ্রুত স্থায়ী কর্মীদের শূন্যপদ পূরণ করা, যাতে কাজের অতিরিক্ত চাপ কমে। নতুন পেনশন প্রকল্পের বদলে পুরোনো পেনশন ব্যবস্থা (OPS) পুনঃপ্রবর্তন এবং পেনশনভোগীদের জন্য ‘আপডেশন’ চালু করা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক গুলির বেসরকারীকরণ ও সংযুক্তিকরণ প্রক্রিয়া অবিলম্বে বন্ধ করা। চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের স্থায়ী করা এবং গ্রাহক পরিষেবা উন্নত করতে পরিকাঠামোগত সংস্কার। জলপাইগুড়িতে আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা ব্যাংক ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা জানান, “আমরা সাধারণ মানুষকে কষ্টে ফেলতে চাইনি। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার ও ব্যাঙ্ক পরিচালনা পর্ষদ আমাদের যুক্তিসংগত দাবিগুলি বছরের পর বছর ধরে উপেক্ষা করে আসছে। ব্যাঙ্ককে কর্মীসংকট চরমে পৌঁছানোয় সাধারণ গ্রাহকদেরও সঠিক পরিষেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। নিজেদের অধিকার এবং ব্যাংক ব্যবস্থার সুরক্ষার্থেই এই প্রতিবাদ।” দিনভর শহরের বিভিন্ন ব্যাংক শাখার সামনে পিকেটিং ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন আন্দোলনকারী কর্মীরা।একদিনের এই ধর্মঘটের ফলে জলপাইগুড়ি জেলা জুড়ে কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন আটকে পড়েছে। চা-বাগান অধ্যুষিত এই জেলায় সাপ্তাহিক মজুরি প্রদান এবং চা-পাতার কেনাবেচা সংক্রান্ত চেকে ছাড়পত্র মেলার কাজ পুরোপুরি থমকে গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ধর্মঘটের কারণে ক্লিয়ারিং হাউসের কাজ বন্ধ থাকায় চেক জমা বা নগদ জমা নেওয়ার উপায় নেই, যার প্রভাব পড়েছে পাইকারি ও খুচরো বাজারে।শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ধর্মঘটের প্রভাব বজায় থাকবে বলে জানা গেছে। আন্দোলনকারী সংগঠনগুলির হুঁশিয়ারি, আজকের ধর্মঘটের পরও যদি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বা সরকার দাবি না মানে, তবে আগামী দিনে আরও বড়সড় ও দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলনের পথে হাঁটবেন তারা।
