বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
বেলুড় মঠে মহাসাড়ম্বরে হয়ে গেল কুমারী পুজো পাঁজরে হাড় ভেঙে ফুসফুসে, চোরবাগানের ময়নাতদন্তের ভয়াবহ রিপোর্ট টাইগার শ্রফের উপর গুলি, হামলা, গ্রেপ্তার ৩ টাইগার শ্রফকে হামলায় দায়স্বীকার বিষ্ণোই গ্যাংয়ের

কন্দর্প-কুসুমের পুজোর বাজারে ঝামেলার সাতকাহন

10 October, 2026 4:51 PM Sandipan Saha
শেয়ার করুন

পুজোর বাজার নিয়ে রম্যরচনা লিখেছেন সন্দীপন বিশ্বাস

পুজোর বাজারে যাওয়ার আগে কুসুম তার স্বামী কন্দর্পকে একটা কথা বলে দিয়েছিল, দ্যাখো বাজারে গিয়ে আজ কিন্তু আমার সঙ্গে ঝগড়া করবে না।

কন্দর্প অবাক। চোখ বড় বড় করে বলল, যা, বাবা! আমি আবার কখন ঝগড়া করলাম?

তার থেকেও বড় চোখ পাকিয়ে কুসুম বলল, তুমি ঝগড়া করো না? কিন্তু একটা কোনও জিনিস কিনলেই পাশ থেকে ফুট কাটো। হ্যানা নয় ত্যানা বলতে থাকো। তারপরই গজগজ করে ঝগড়া করতে থাকো।

কন্দর্প চুপ করে রইল। তবে পুজোর বাজারে যাওয়ার সময় সে পকেট থেকে একটা ছোট্ট নোটবুক বের করে প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে নিয়েছিল। দেখতে পেয়ে কুসুম জিজ্ঞেস করেছিল, ওটা কী?

—হিসেবের খাতা।

—কিসের হিসেব?

—আজ কত টাকা খরচ হবে।

কুসুম মুচকি হেসে বলেছিল, পুজোর বাজারে গিয়ে খরচের হিসেব করবে? তাহলে আজ আর শপিংয়ে যেতে হবে না। শুয়ে পড়ো। আমি একটু ঘুরে আসি।

কন্দর্প বুঝতে পারল, ব্যাপার সুবিধের হবে না। তাই সে বলল, ঠিক আছে চলো।

শাড়ির দোকানে ঢুকে গোটা চল্লিশ শাড়ি দেখে কুসুম একটা শাড়ি পছন্দ করল। যতক্ষণ  শাড়ি পছন্দ করছিল, ততক্ষণ কন্দর্প পকেটে রাখা মা কালীর ছবিতে প্রণাম করছিল আর বলছিল, মাগো এক হাজার টাকার বেশি দামের শাড়ি যেন বউ পছন্দ না করে। তাহলে কাল তোমায় গুঁজিয়া দিয়ে পুজো দেব।

—এই দ্যাখো তো এটা কেমন হবে?

কন্দর্প শাড়িটা হাতে নিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে দামের স্টিকারটা দেখে বলল, উঁহু।

কুসুম তাকাল। বলল, কেন? খারাপ কী?

কন্দর্প আমতা আমতা করে বলল, মানে জমিটা ভালো নয়। কেমন যেন হালকা হালকা।

কুসুম বলল, শাড়ির জমি খারাপ কী করে বুঝলে? আর হালকা মানে? তাহলে তো চটের বস্তা পরতে হয়। অনেকটা ভারী হবে।

চুপি চুপি কুসুমের কানের কাছে মুখ নিয়ে সে বলল, আর একটু কম দামের কিছু দ্যাখো না গো!

—ও তাই বলো। সস্তার শাড়ি খুঁজছো। তাহলে চলো ফুটপাত থেকে একটা তিনশো টাকার ছাপা শাড়ি কিনে বাড়ি যাই।

—না না, আমি কি তাই বলেছি?

—তাহলে আমি এটাই কিনব।

কন্দর্প বলল, রংটা তেমন খোলতাই নয়। ধোয়ার পর উঠবে মনে হচ্ছে।

কুসুম এবার একটু গলা চড়াল। তুমি কি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করেছ?

—না, অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।

—তোমার অভিজ্ঞতা এত বেশি কী করে?

কন্দর্প বলল, টাকা বাঁচাতে গেলে নানা রকমের অভিজ্ঞতার দরকার হয়।

কুসুম বলল, ধুস আমি কিনবই না। বাড়ি চলো।

কন্দর্প কাচুমাচু মুখে বলল, ঠিক আছে তাহলে নাও।

কুসুম খুশি। বলল, সস্তা দেখে করে দিলাম। বেশি ঠোঁট ফোলাবে তো আরও একটা নেব। কন্দর্প ততক্ষণে দাম মিটিয়ে বিল নিয়ে সোজা রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

বাইরে বেরিয়ে কুসুম জিজ্ঞাসা করল, পেট ব্যথা করছে নাকি? কন্দর্প ঘাড় নাড়ল। কুসুম বলল, তাহলে অমন মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে আছো কেন?

ব্লাউজের দোকানে গিয়ে আরও বিপদ। কুসুম একটা ব্লাউজ পছন্দ করল। কন্দর্প বলল, এটা নিও না।

—কেন?

কানের কাছে মুখ এনে কন্দর্প বলল, ক্লিভেজ দেখা যাবে।

কুসুম ঝাঁঝিয়ে বলল, ধ্যাৎ, বাজে কথা বোলো না তো। এর কাটিংটা দেখো। ফাটাফাটি। আর আমার নতুন শাড়ির সঙ্গে ভালো ম্যাচও করবে।

কোনওভাবেই কুসুমকে দমানো যাচ্ছে না। কন্দর্প ভাবে, কুসুম কি শপিংয়ে এসেছে টাকা হরির লুট করবে বলে!

এরপর জুতোর দোকান। কুসুম একটা সুন্দর জুতো পছন্দ করেছে।

—এইটা নিচ্ছি।

—নিও না। এই ধরনের জুতোয় পায়ে ফোস্কা পড়বে, পায়ে একজিমা হবে। পুজোয় ঘুরতেই পারবে না।

—বাজে কথা বোলো না! আসলে তোমার পকেটে ফোস্কা পড়বে।

—তা কেন হবে। আসলে জুতোটার চেহারা ভালো না। আমার মনে হয়, এবার পুজোয় বর্ষার জুতো খুব কাজে লাগবে। বৃষ্টি হতে পারে। তুমি কিনে দেখতে পারো।

কুসুম বলল, তুমি ওইদিকের শোকেসে গিয়ে জুতোগুলো দেখো। আমার পছন্দ হলে তুমি পেমেন্ট করে দিও।

তারপর লিপস্টিক। পারফিউম। কুসুম একটা লিপস্টিক হাতে নিতেই কন্দর্প বলল, এটা কিনো না!

—কেন?

—ঠোঁটে শ্বেতী হবে।

দোকানদার সেকথা শুনে মুখ ঘুরিয়ে হাসল।

কুসুম বলল, শ্বেতী হবে কেন? তুমি কি ডাক্তার?

—না।

—চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ?

—না।

—তাহলে?

কন্দর্প বলল, না মানে কাগজে পড়ছিলাম।

কুসুম পাউডার হাতে নিল।

—এইটা?

কন্দর্প বলল,  না। নিও না। এই ধরনের পাউডার মাখলে বগলে চুলকুনি হয়। আমি পড়েছিলাম। পারফিউম নিলেও নাকি সেই গন্ধ থেকে শ্বাসকষ্ট হয়। তাতে লাঙ্গসের ক্ষতি হয়।  ।

কুসুম বলল, বাবা অনেককিছু জেনে গেছো দেখছি। এখন চুপ করে পেমেন্ট করে দাও।

কন্দর্প বলল, টাকা প্রায় শেষ।

কুসুম বলল, শেষ মানে? তুমি পকেটে তিনশো টাকা নিয়ে সবজি বাজার করতে বেরিয়েছো নাকি! কার্ড বের কর। ডেবিট, ক্রেডিট যা আছে। আমাকে চটিও না। মনে রেখো দেবীপক্ষ পড়ে গিয়েছে।

দাম মিটিয়ে দোকানের বাইরে এসে কন্দর্প বলল, এবার বাড়ি চল। আমার পেটটা কেমন গুড়গুড় করছে।

কুসুম চেঁচিয়ে বলল, চোপ একদম কোনও কথা বলবে না। তোমার বকবকানিতে আমার মাথা ধরে গেছে।

বাজারের মধ্যে কুসুমের সেই চিৎকার শুনে  দৌড়ে এলো বেশ কয়েকজন। তাদের ঘিরে ধরল।  একজন বলল, কী হয়েছে বউদি?

আর একজন কন্দর্পের দিকে তাকিয়ে বলল, এই লোকটা বুঝি আপনাকে টিজ করছে?

অন্যজন বলল, পকেটমারও হতে পারে। দেখছেন না গাঁটকাটার মতো দেখতে।

আর একজন জামার হাতা গোটাতো গোটাতে বলল, আপনি একবার কনফার্ম করুন বউদি। দিই দু-ঘা! পুজোর আগে একটু মালিশ করে দিই রদ্দিটাকে।

কন্দর্পের বুকের ভিতর তখন পুজোর ঢাক বাজছে। এইরে বুঝি দু-ঘা এসে পড়ল। সে কুসুমের দিকে তাকাল। কুসুমও তার দিকে তাকাল। এক সেকেন্ডের চোখাচোখি। তারপর কুসুমের চোখে একটা মৃদু হাসি। কন্দর্প বুঝে গেল। সে বুঝিয়ে দিল সে বশ্যতা মানতে রাজি।  যা খুশি কেনো। শুধু আমাকে এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচাও।

কুসুম তখন জমে যাওয়া লোকজনদের বলল, না, না, আপনারা কিছু মনে করবেন না। এটা ফ্যামিলি কেস।

একজন বলল, ফ্যামিলি কেস?

আর একজন বলল, যা কেলো, হাটের মাঝে ফ্যামিলি কেস! দু-ঘা দিতে না পারার ব্যথা নিয়ে সরে গেল সকলে। এরপর বাজারের যেটুকু বাকি ছিল সব হয়ে গেল। কন্দর্প বুঝল, বশ্যতা হি কেবলম।

বাজার শেষে কুসুম বলল, চলো, খাওয়া যাক। রেস্টুরেন্টে বসে কন্দর্প মেনুকার্ড খুলে প্রথমেই বলল, মোগলাই পরোটা না নিলেই হয়। অনেক তেল।

কুসুম বলল, আবার শুরু করেছ?

—না, না। আমি কিছু বলছি না।

—তাহলে?

—তুমি যা খুশি খাও।

কুসুম দুটো মোগলাই পরোটা, চিকেন কষা, কাবাব আর ঠান্ডা পানীয় অর্ডার করল।

কন্দর্প মেনুকার্ডের দিকে তাকিয়ে হিসেব করতে লাগল।

কুসুম বলল, কী হল?

—কিছু না।

—হিসেব করছ?

—না।

—তোমার খাতাটা বের করো।

কন্দর্প খাতা বের করল।

কুসুম বলল, আজকের মোট বাজার বারো হাজারের মতো। কন্দর্প গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুঝিয়ে দিল তারই বারোটা বেজে গেছে।  কুসুম মোগলাই পরোটা ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলল, তোমার লাখখানেক টাকা কেমন বাঁচিয়ে দিলাম!

কন্দর্প থমকে গেল। কীভাবে?

কুসুম এক কুচি মোগলাই পরোটা তুলে তার মুখের সামনে ধরে বলল, মুখ খোলো। কন্দর্প মুখ খুলল। পরোটা ঢুকে গেল। কুসুম বলল, আজ যদি বাজারের সামনে আমি লোকগুলোকে বলতাম, হ্যাঁ, এই লোকটা আমাকে টিজ করছে?

কন্দর্প চিবোতে চিবোতে থেমে গেল। কুসুম আবার শুরু করল, তারপর কী হতো? তোমার গণধোলাই হতো। তারপর নার্সিং হোম।

কন্দর্পের চোখ কপালে। কুসুম এবার আঙুল গুনতে শুরু করল। অ্যাম্বুলেন্স, ডাক্তার, এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, ওষুধ, কেবিন, নার্স। তারপর আত্মীয়স্বজনকে ফোন। সবাই এসে চা-বিস্কুট খাবে। তারপর অফিস কামাই। বেতন কাটবে। বাড়িতে রান্নার লোক লাগবে। আমাকে হাসপাতালে দৌড়তে হবে। তোমার ফোন ভেঙে যাবে। কত খরচ বলো তো?

কন্দর্প অসহায়ভাবে বলল, লাখখানেকের বেশিই হবে। কুসুম হাসল। তাই তো বলছি। আজ বারো হাজার খরচ করে তোমার লাখখানেক টাকা বাঁচিয়ে দিলাম। কন্দর্পের মুখে তখন মোগলাই পরোটার একটা টুকরো। সে কিছু বলতে গিয়ে কাশল।

কুসুম সঙ্গে সঙ্গে জল এগিয়ে দিল। জল খাও বৎস।

কন্দর্প জল খেল। কুসুম সহানুভূতির গলায় বলল, টাকা নিমিত্ত মাত্র। অযথা শোক করিও না। তবে যে লাখখানেক টাকা তোমার বাঁচিয়ে দিলাম তার টোয়েন্টি পার্সেন্ট আমার। ওটা দিয়ে পুজোর পর বেড়াতে যাব।

দর্পহীন কন্দর্প মাথা নিচু করে অসুর বধের মতো কাঁটাচামচটা দিয়ে মোগলাই পরোটাকে বিদ্ধ করল।

 

প্রতিবেদন

Sandipan Saha