বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
টাইগার শ্রফের উপর হামলায় ধৃত আরও ৪ আজ বিজয়া দশমী, ঘাটে ঘাটে চলছে প্রতিমা নিরঞ্জন ভারতের সঙ্গে চুক্তি অন্যরকম, জানালেন ট্রাম্প দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে দশেরা

এই দুর্গাপুজো বাঙালির অন্তরের, নাকি দেখনদারির?

21 October, 2026 11:33 AM UTSAB RC
শেয়ার করুন

উৎসব রায় চৌধুরী

দুর্গাপুজো মূলত অশুভের বিনাশ আর শুভ শক্তির আরাধনা। মহিষাসুরের অন্ধকারকে দশভুজার আলো যেখানে পরাস্ত করে, সেখানেই এই উৎসবের মর্মকথা। অথচ আজ প্রশ্ন না তুলে উপায় নেই: সেই আলোর উৎসবে কোন আলো জ্বেলেছি, আর কোন অন্ধকারকে ঘরে ডেকে এনেছি?

কয়েক বছর ধরে থিমের মণ্ডপে ঢুকলে অনেক সময় মনে হয়, কোনও গুহায় ঢুকছে মানুষ। স্যাঁতসেঁতে আবহ, আলো-আঁধারির খেলা, গা-ছমছমে সাজসজ্জা। শিল্প হিসেবে এর কারিগরি তারিফযোগ্য, শিল্পীর মেধা আর পরিশ্রম অস্বীকার করার নয়। কিন্তু আলো-আঁধারির যে রহস্য ছবি বা সিনেমার পর্দায় মানায়, মায়ের আরাধনার মণ্ডপে তা কতটা মানায়? যে উৎসবের কেন্দ্রে অন্ধকারের পরাজয়, সেখানে অন্ধকারকেই নান্দনিক করে তোলাটা বিদ্রূপ বই কী। বাঙালি বরাবরই অন্য শিল্পকে আপন করে নিতে জানে। সিনেমা, গান, স্থাপত্য, সবকিছুকে মিলিয়ে সে নিজের উৎসবকে সাজিয়েছে। সেটা তার গুণ। কিন্তু একটা সময় এল, যখন সেই সাজ ক্রমশ মূল বিগ্রহকে ছাপিয়ে যেতে শুরু করল। মণ্ডপ বড় হল, মায়ের শৈল্পিক রূপ বড় হলেন। কিন্তু আরাধনা যেন গৌণ হল। শিল্পের চমকে দর্শকের চোখ ধাঁধাল, আর প্রতিমা হয়ে দাঁড়াল সেই চমকের একটা উপকরণ। বনেদিয়ানা তাই পিছু হটল থিমের কাছে। এই পথের এক নিষ্ঠুর পরিণতি আমরা দেখলাম চোরবাগানে। সপ্তমীর সন্ধ্যায় ঠাকুর দেখতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারালেন ১৯ জন। উৎসবের মরশুমে এমন মৃত্যুমিছিল কোনও বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা বলে সরিয়ে রাখা সহজ, কিন্তু সৎ হলে আমাদের ভাবতে হবে, ভিড়ের এই উন্মাদনা তৈরি হল কীভাবে। একটি নির্দিষ্ট মণ্ডপ দেখতেই হবে, এই তাড়না মানুষের মনে কে বুনে দিল?

মজার, এবং একই সঙ্গে ভাবার বিষয় হল, থিমের এই দৌড়ের বিপরীতে যে বনেদিবাড়ির পুজো একসময় নিজের নিয়মে, নিজের নিস্তব্ধতায় চলত, সেও আজ বাজারের নিয়মে ঢুকে পড়েছে। গত কয়েক বছর ধরে, এ বছর বিশেষ করে, বনেদিবাড়ির পুজোও ট্রেন্ডিং। তারাও নিজেদের মতো করে মার্কেটিং করেছে। শোভাবাজার রাজবাড়ি, পাথুরিয়াঘাটা রাজবাড়িতে এবার যে লাইন পড়েছে, তা অনেকের চোখেই অস্বাভাবিক। ঐতিহ্যের প্রতি টান থাকা ভাল, কিন্তু সেই টান কি সত্যিই ভক্তির, নাকি ‘এটাও দেখে ফেলা চাই’ গোছের তালিকা মেলানোর?

এখানেই আসে সোশ্যাল মিডিয়ার কথা। আজ কোন পুজো দেখতে যাব, তা অনেকেরই ঠিক করে দেয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটারের ভিডিও। ‘এই ঠাকুর না দেখলে পুজোই বৃথা’, এমন ঘোষণায় মানুষ প্রভাবিত হয়, কারণ এই যুগের মনস্তত্ত্বই হল ট্রেন্ড থেকে বাদ পড়ার ভয়। যা সবাই দেখছে, তা আমাকেও দেখতে হবে। ফলে আসল পুজো আর ভিডিওর পুজোর মধ্যে ফাঁক তৈরি হচ্ছে। আর এই চাহিদাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে গোটা এক অর্থনীতি। অভিযোগ, সাবস্ক্রাইবার বেশি থাকলে পুজো কমিটি টাকা দিয়ে ক্রিয়েটারদের দিয়ে প্রচার করায়। ভিআইপি পাসের টিকিট, প্রিভিউ শো, আরও হাজারটা উপায়ে বাড়ে আকর্ষণ আর মুনাফার পথ। ভক্তি আর বাণিজ্যের সীমারেখা এখানে এতটাই ঝাপসা, যে বোঝা কঠিন কোথায় আরাধনা শেষ, আর কোথায় বিজ্ঞাপন শুরু। তার উপর আছে শারদ সম্মান। বিভিন্ন টিভি চ্যানেল যে সম্মান দেয়, তা কি শিল্পীদের আরও নতুন, আরও ‘অন্যরকম’ থিম তৈরিতে প্ররোচিত করে না? সেরার তকমা পেতে হলে চমক চাই, চমক মানেই বাড়তি আয়োজন, বাড়তি প্রচার, বাড়তি ভিড়। প্রশ্নটা তাই সহজ: এই সম্মান কি সত্যিই প্রয়োজন?  মায়ের কাছে সবাই সমান, তাঁর আরাধনায় প্রতিযোগিতা কেন? মা তো সবার। কোনও বিশেষ ক্লাবের মা-কে দেখার জন্য কেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন, কেন এত উত্তেজনা আর উৎকণ্ঠা? পাড়ার ছোট মণ্ডপে বসে থাকা প্রতিমাও তো সেই একই দেবী। তাঁর কাছে পৌঁছনোর জন্য পদপিষ্ট হওয়ার ঝুঁকি নিতে হবে, এমন উৎসবের কথা আমাদের পূর্বপুরুষ ভাবেননি।

শিল্পকে বাদ দিতে কেউ বলেনি। শিল্প উৎসবকে সমৃদ্ধ করে, যদি সে মায়ের সেবায় থাকে, মায়ের জায়গা দখল না করে। বনেদিবাড়ির ঐতিহ্যকেও অন্ধ পুজো করছি না। কথা শুধু এটুকু, যে উৎসবের কেন্দ্রে আবার দেবীকে ফিরিয়ে আনতে হবে, চমককে নয়। প্রতিযোগিতা, ট্রেন্ড আর প্রচারের কোলাহলের মাঝখানে যদি মা-ই হারিয়ে যান, তবে এই বিপুল আয়োজন কার জন্য? চোরবাগানের ১৯টি প্রাণ আমাদের সেই প্রশ্নের সামনেই দাঁড় করিয়েছে। বিসর্জনের বাজনা বাজছে আজ। মাকে বিদায় জানাতে জানাতে নিজেদের কাছে একবার জিজ্ঞেস করা যাক, আমরা কি সত্যিই মায়ের পুজো করছি, নাকি শুধু আয়োজনের?

প্রতিবেদন

UTSAB RC