বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
বেলুড় মঠে মহাসাড়ম্বরে হয়ে গেল কুমারী পুজো পাঁজরে হাড় ভেঙে ফুসফুসে, চোরবাগানের ময়নাতদন্তের ভয়াবহ রিপোর্ট টাইগার শ্রফের উপর গুলি, হামলা, গ্রেপ্তার ৩ টাইগার শ্রফকে হামলায় দায়স্বীকার বিষ্ণোই গ্যাংয়ের

বিজয়ার মিষ্টিমুখ: প্রীতির পরশে বদলে যাওয়া বাংলার মিষ্টির জগৎ

21 October, 2026 10:57 AM Lopa Bhowmik
শেয়ার করুন

লোপামুদ্রা ভৌমিক

বিজয়া দশমী মানেই বিদায়ের বিষাদে মেশানো আনন্দ, শুভেচ্ছা বিনিময়, কোলাকুলি আর মিষ্টিমুখ। পুজোর চার দিনের উন্মাদনা শেষে দেবী যখন কৈলাসের পথে, তখন বাঙালির ঘরে ঘরে শুরু হয় অন্য এক উৎসব। ছোট-বড়, আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী—সকলের সঙ্গে হয় শুভ বিজয়ার প্রীতি বিনিময়। আর সেই আন্তরিকতার অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ মিষ্টি। মুখে মিষ্টি তুলে দিয়ে সম্পর্কের মাধুর্য আরও একবার ঝালিয়ে নেওয়া। তাই বিজয়া দশমীর সকালে কলকাতার অলিগলি থেকে শহরতলির বাজার, মফস্‌সলের দোকান থেকে গ্রামের হাট—সর্বত্রই মিষ্টির দোকানে উপচে পড়ে ভিড়।
দোকানের কাচের শোকেসে থরে থরে সাজানো রঙিন মিষ্টি। কোথাও সদ্য তৈরি রসগোল্লার সাদা গোলক রসে ডুবে রয়েছে, কোথাও পান্তুয়ার গাঢ় বাদামি রং চোখ টানছে। ছানার মিষ্টি, ক্ষীরের মিষ্টি, গুড়ের মিষ্টি, শুকনো মিষ্টি—কত যে বাহার! ভীম নাগ হোক কিংবা দ্বারিক, সেন মহাশয়, বলরাম মল্লিক, ভিয়েন, ফেলু মোদক বা বাঞ্ছারাম—বিখ্যাত মিষ্টির দোকানগুলির পাশাপাশি পাড়ার সত্যনারায়ণ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারেও আজ ক্রেতাদের ভিড়। কারও হাতে বড় বাক্স, কারও হাতে ছোট প্যাকেট। কেউ নিয়ে যাচ্ছেন বাড়ির জন্য, কেউ অফিসের সহকর্মীদের দিতে, কেউ আবার বহুদিনের পরিচিত মানুষটির বাড়িতে সৌজন্য সাক্ষাতে যাচ্ছেন।
রসগোল্লা, পান্তুয়া, সন্দেশের মতো চেনা মিষ্টির সঙ্গে আজ বিশেষ আকর্ষণ রসকদম্ব, বালুসাই, অমৃতকুম্ভ, লবঙ্গলতিকা, ক্ষীরমোহন, অমৃতভোগ-সহ নানা ধরনের মিষ্টি। কোথাও আবার আধুনিক নকশার সন্দেশ, চকোলেটের স্বাদের মিষ্টি, ফলের স্বাদে তৈরি নতুন পদ কিংবা চিনির বিকল্পে তৈরি মিষ্টির চাহিদাও বাড়ছে। বিজয়ার মিষ্টির বাক্স তাই শুধু খাবারের প্যাকেট নয়, বাংলার রসনাসংস্কৃতির একটি ছোট্ট প্রদর্শনী।

বিজয়া দশমীতে মিষ্টিমুখ করার রীতির মধ্যে রয়েছে বাঙালির সামাজিক জীবনের এক গভীর তাৎপর্য। দুর্গাপুজো কেবল দেবীর আরাধনা নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ পুনর্নবীকরণেরও উপলক্ষ্য। পুজোর আগে কাজের ব্যস্ততা, দূরত্ব কিংবা অভিমানের কারণে যাঁদের সঙ্গে দেখা হয়নি, বিজয়ার দিনে তাঁদের কাছে যাওয়া হয়। বড়দের প্রণাম, ছোটদের আশীর্বাদ, সমবয়সিদের কোলাকুলি আর সঙ্গে মিষ্টি—এই সামান্য আচারেই তৈরি হয় সামাজিক সম্প্রীতির আবহ।
মিষ্টি এখানে নিছক খাদ্য নয়, শুভকামনার প্রতীক। কোনও সুখবর পেলে যেমন মিষ্টিমুখ করানো হয়, তেমনই নতুন সম্পর্কের সূচনা, বিয়ে, সন্তানের জন্ম কিংবা ব্যবসায় সাফল্যের মতো নানা উপলক্ষ্যেও মিষ্টি বিলোনোর রীতি রয়েছে। বিজয়ার ক্ষেত্রেও সেই একই ভাবনা কাজ করে। বিদায়ের দুঃখকে মিষ্টির স্বাদে কিছুটা লঘু করে নতুন বছরের মতো করে আবার সম্পর্কের পথচলা শুরু করা।
তবে মনে রাখতে হবে, বিজয়া দশমীতে মিষ্টি খাওয়ার রীতি ঠিক কোন সময়ে, কীভাবে সর্বজনীন হয়ে উঠেছিল, তার নির্দিষ্ট কোনও একক ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। বাংলার পারিবারিক আচার, শাক্ত সংস্কৃতি, সামাজিক সৌজন্য এবং মিষ্টি তৈরির সমৃদ্ধ পরম্পরা মিলিয়েই এই রীতি দীর্ঘ সময়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।

বাংলার মিষ্টির ইতিহাস বহু পুরনো। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলায় গুড়, নারকেল, চাল, দুধ, ক্ষীর এবং নানা ধরনের পিঠে-পায়েসের ব্যবহার ছিল। উৎসব ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে মিষ্টি খাবারের গুরুত্বও ছিল যথেষ্ট। তবে আজকের পরিচিত ছানার মিষ্টির জগৎ গড়ে উঠেছে দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে।
বাংলার মিষ্টির ইতিহাসে ছানার ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। দুধ থেকে তৈরি ছানা থেকে সন্দেশ ও রসগোল্লার মতো মিষ্টির বিকাশ বাংলা মিষ্টান্নশিল্পকে নতুন মাত্রা দেয়। উনিশ শতকের কলকাতায় মিষ্টির দোকান, কারিগর এবং শহুরে ক্রেতাসমাজের বিকাশ এই ধারাকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। নবীনচন্দ্র দাসের নাম রসগোল্লার ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে তাঁর তৈরি রসগোল্লা কলকাতার মিষ্টির জগতে নতুন পরিচিতি পায়।
অন্যদিকে সন্দেশের ঐতিহ্য আরও বিস্তৃত। ছানা ও ক্ষীরের নানা রূপ, চিনির ব্যবহার, ছাঁচে ফেলে নকশা তৈরি এবং কারিগরদের দক্ষতা—সব মিলিয়ে সন্দেশ হয়ে ওঠে বাঙালির রসনাবিলাসের অন্যতম পরিচয়। ভীম নাগ, দ্বারিক ঘোষের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলি কলকাতার মিষ্টির ইতিহাসে নিজস্ব জায়গা করে নিয়েছে। পরবর্তী সময়ে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান এই ধারাকে সমৃদ্ধ করেছে।
বিজয়ার মিষ্টির বাক্সে তাই ইতিহাসেরও ছোঁয়া থাকে। একদিকে বহু পুরনো রেসিপি, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের পরীক্ষানিরীক্ষা। কোনও দোকান তার ঐতিহ্যবাহী রসগোল্লা নিয়ে গর্বিত, কোনও দোকানের বিশেষত্ব পান্তুয়া বা ক্ষীরের মিষ্টি, আবার কোনও প্রতিষ্ঠান নতুন স্বাদ ও নকশার মাধ্যমে ক্রেতাদের আকর্ষণ করছে।

বিজয়ার দিনে দোকানে এত মিষ্টি দেখে বোঝার উপায় নেই, এর পিছনে কতটা পরিশ্রম জমে থাকে। পুজোর কয়েক দিন আগে থেকেই মিষ্টির দোকানগুলিতে কাজের চাপ বাড়তে শুরু করে। বিজয়ার আগে সেই চাপ পৌঁছয় চূড়ান্ত পর্যায়ে। ভোর থেকে রাত, কখনও রাত পেরিয়ে পরদিন সকাল পর্যন্ত চলে ছানা কাটা, ক্ষীর জ্বাল দেওয়া, মণ্ড তৈরি, মিষ্টি গড়া, ভাজা, রসে ডোবানো এবং প্যাকেটজাত করার কাজ।
একটি ভালো রসগোল্লা তৈরি করতে যেমন ছানার গুণমান ও মণ্ডের মসৃণতা গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই পান্তুয়া বা লবঙ্গলতিকার ক্ষেত্রে প্রয়োজন আলাদা দক্ষতা। ক্ষীরের মিষ্টিতে জ্বাল দেওয়ার সময়, মণ্ডের আর্দ্রতা এবং উপাদানের অনুপাত ঠিক না হলে স্বাদ ও গঠন বদলে যায়। অভিজ্ঞ কারিগররা হাতের আন্দাজে অনেক কিছু বুঝে নেন। সেই দক্ষতা তৈরি হয় বছরের পর বছর কাজ করতে করতে।
বড় দোকানে উৎপাদনের পরিমাণ বেশি, কিন্তু পাড়ার ছোট দোকানেও চাপ কম নয়। অনেক দোকান আগাম অর্ডার নেয়। কেউ চান আত্মীয়দের জন্য বিশেষ বাক্স, কেউ চান অফিসের জন্য একাধিক কিলোগ্রাম মিষ্টি। ফলে কারিগরদের পাশাপাশি প্যাকেট তৈরি, বিক্রি, সরবরাহ এবং দোকান সামলানোর কর্মীদেরও ব্যস্ততা বাড়ে।

সময়ের সঙ্গে বদলেছে মিষ্টির উপকরণ, পরিবেশন এবং বিপণন। এক সময় মিষ্টি কেনার প্রধান মাপকাঠি ছিল স্বাদ, তাজা থাকা এবং পরিচিত দোকানের সুনাম। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্যাকেজিং, স্বাস্থ্যসচেতনতা, উপহারের নান্দনিকতা এবং সামাজিক মাধ্যমে ছবি ভাগ করে নেওয়ার প্রবণতা।
আগে বিজয়ার মিষ্টি বলতে অনেকের মনে ভেসে উঠত রসগোল্লা, সন্দেশ, পান্তুয়া কিংবা বাড়িতে তৈরি নারকেলের নাড়ুর ছবি। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন স্বাদের চকলেট সন্দেশ, বেকড মিষ্টি, ফলের স্বাদের মিষ্টি, ক্ষীরভিত্তিক নতুন পদ এবং আধুনিক উপস্থাপনার নানা রকমের মিষ্টান্ন। কেউ খুঁজছেন কম চিনির মিষ্টি, কেউ আবার উপহার দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে সাজানো বাক্স বেছে নিচ্ছেন।
তবে নতুনত্বের এই ঢেউয়ের মধ্যেও পুরনো মিষ্টির আকর্ষণ কমেনি। বরং অনেক ক্রেতার কাছে বিজয়ার দিন পরিচিত দোকানের রসগোল্লা বা সন্দেশ কেনা এক ধরনের স্মৃতিচারণ। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে মিষ্টি কিনতে যাওয়া, আত্মীয়ের বাড়িতে বড় বাক্স হাতে হাজির হওয়া কিংবা পাড়ার পরিচিত দোকান থেকে মিষ্টি নিয়ে বাড়ি ফেরা—এই অভিজ্ঞতাগুলিই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখে।
বাঙালির মিষ্টি খাওয়ার অভ্যাসের সঙ্গে স্মৃতি এমনভাবে মিশে রয়েছে যে, স্বাদের সঙ্গে ফিরে আসে সময়ের ছবিও। একটি লবঙ্গলতিকা কিংবা একটি ক্ষীরমোহন কখনও কখনও শৈশবের পুজো, পুরনো বাড়ি কিংবা হারিয়ে যাওয়া কোনও প্রিয় মানুষের কথা মনে করিয়ে দেয়।

দুর্গাপুজোর চার দিন শেষ হয়ে গেলেও বিজয়ার মাধ্যমে বাঙালির সামাজিক উৎসব আরও কয়েক দিন ধরে চলে। এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যাওয়া, ফোনে শুভেচ্ছা জানানো, দূরে থাকা আত্মীয়কে মিষ্টি পাঠানো—সবকিছুর মধ্যেই থাকে কাছে আসার চেষ্টা। সেই চেষ্টাকে দৃশ্যমান করে তোলে ছোট্ট একটি মিষ্টির বাক্স।
সময়ের সঙ্গে বদলেছে মিষ্টির রূপ, দোকানের সাজসজ্জা, কেনাকাটার পদ্ধতি এবং ক্রেতাদের পছন্দ। কিন্তু বদলায়নি মিষ্টিমুখের মূল অর্থ—সুখ ভাগ করে নেওয়া, অভিমান ভুলে কাছে আসা এবং সম্পর্কের মধ্যে মাধুর্য ফিরিয়ে আনা।
তাই বিজয়া দশমীর মিষ্টির দোকানে এই ভিড় শুধু বিক্রিবাটার ছবি নয়। এর মধ্যে রয়েছে বাংলার খাদ্যঐতিহ্য, কারিগরদের শ্রম, ব্যবসার ব্যস্ততা এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস। রসগোল্লার রস, সন্দেশের কোমলতা কিংবা পান্তুয়ার গাঢ় স্বাদের আড়ালে লুকিয়ে থাকে একটি সহজ বার্তা—উৎসবের প্রকৃত মাধুর্য মিষ্টির বাক্সে নয়, মানুষের হৃদয়ে।
শুভ বিজয়া। পাঠক এবং আমাদের ফলোয়ারদের জানাই বিজয়ার প্রীতি ও শুভেচ্ছা।

প্রতিবেদন

Lopa Bhowmik