বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
টাইগার শ্রফের উপর হামলায় ধৃত আরও ৪ আজ বিজয়া দশমী, ঘাটে ঘাটে চলছে প্রতিমা নিরঞ্জন ভারতের সঙ্গে চুক্তি অন্যরকম, জানালেন ট্রাম্প দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে দশেরা

আল্পসের কোলে এক টুকরো কলকাতা: মিউনিখে বাঙালির দুর্গাপুজো

11 October, 2026 8:15 PM Lopa Bhowmik
শেয়ার করুন

শুভ্রাংশু মুখোপাধ্যায়
মিউনিখ

মিউনিখে অক্টোবর মাসটা একটু অন্যরকম। গ্রীষ্মের রেশ তখন প্রায় মিলিয়ে গেছে। গাছের পাতায় সবুজের বদলে হলুদ, কমলা আর লালের ছোঁয়া। সকাল বেলা বাড়ি থেকে বেরোলেই গায়ে লাগে হিমেল বাতাস। কলকাতার মতো এখানে শিউলির গন্ধ নেই, কাশফুলের সারিও চোখে পড়ে না। অথচ এই সময়টাতেই মনটা কেমন যেন কলকাতা কলকাতা করে।

কারণ একটাই। পুজো আসছে!

২০১৪ –তে প্রথম জার্মানি আসি। পরের বছর থেকে মিউনিখে থাকা শুরু। তখন দুর্গাপুজোর খোঁজ করতে গিয়ে মূলত বাংলাদেশি বাঙালিদের আয়োজিত একটি পুজোর কথাই জানতে পেরেছিলাম। সেই মিউনিখেই আজ প্রায় পাঁচটি দুর্গাপুজোর আয়োজন হয়!‌ গত এক দশকে শহরের বাঙালি সমাজ যে কতটা বড় হয়েছে, সেটা ভাবলেই অবাক লাগে।

তবে প্রবাসের পুজোর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা আরও মজবুত হয় করোনা কালে। ২০২০ আর ২০২১ সালে জমায়েতের বিধিনিষেধে বহু পুজোতেই সদস্য ছাড়া ঢোকার সুযোগ ছিল না। আমি আর আমার স্ত্রী তখনও কোনও আয়োজক সংগঠনের সদস্য নই। কলকাতায় যে উৎসবকে ঘিরে সারা বছর অপেক্ষা করতাম, সেই পুজোর দিনগুলোতেই বিদেশের মাটিতে নিজেদের কেমন যেন একা, নিঃসঙ্গ মনে হতো।

তখনই ঠিক করলাম, শুধু পুজো দেখতে গেলে হবে না। আয়োজনের সঙ্গেও জড়াতে হবে। সেই শুরু। তারপর ধীরে ধীরে পুজোর প্রস্তুতি, কাজকর্ম আর মানুষগুলোর সঙ্গে মিলেমিশে যাওয়া। আজ তাঁদের অনেকেই আমাদের প্রবাসজীবনের আপনজন।

এভাবেই হয় আমাদের পুজো।

এরমধ্যে ২০২৪ সালের পুজোটা আমার কাছে বিশেষ হয়ে থাকবে। সেবার বাবা–মাকে কলকাতা থেকে মিউনিখে নিয়ে এসেছিলাম। ওঁদের সঙ্গে এখানে পুজোয় বেরিয়ে মনে পড়ছিল ছোটবেলার কথা। কলকাতার ভিড়, প্যান্ডেলের সামনে লম্বা–চওড়া লাইন, আর হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে শক্ত করে ধরে রাখা বাবা বা মায়ের হাত। তখন কোথায় যাব, কী খাব, কখন বাড়ি ফিরব, সব দায়িত্বই তো ছিল ওঁদের। আমার কাজ ছিল শুধু নতুন জামা পরে হুল্লোড় করা। সময় যে কখন ঝপাঝপ এতটা পথ পেরিয়ে গেল! সেই ছোট্ট ছেলেটা আজ সাত হাজার কিলোমিটার দূরে নিজের সংসার পেতেছে। যাঁদের হাত ধরে একদিন পুজো চিনেছিলাম, তাঁদেরই মিউনিখের পুজো দেখাতে নিয়ে গলাম। বাবা–মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে বিদেশ–বিভঁইয়ে অঞ্জলি দেওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, কিছু অনুভূতি বোধহয় কখনও পুরনো হয় না। শুধু বদলে যায় আমাদের ভূমিকা।

এখানেও ষষ্ঠী থেকে দশমী, অঞ্জলি, সন্ধিপুজো, ধুনুচিনাচ আর সিঁদুরখেলা চলে এক্কেবারে রীতি মেনে। কুমোরটুলি থেকে আসা প্রতিমা, কলকাতা থেকে আসা পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ, ঢাক আর কাঁসর–ঘণ্টার আওয়াজে চারপাশটা যেন বদলে যায়। এখানে আমাদের পুজোয় আবার এক মহিলা ঢাকিও আছেন। যিনি সম্পর্কে আমার স্ত্রী! ফলে ঢাকের আনন্দটা আমার কাছে একটু বেশিই। গত বছরের পুজোয় আরও এক আনন্দের অভিজ্ঞতা হল। আমাদের মিউনিখের পুজোর ছবি ও খবর বাংলা মিডিয়ার মাধ্যমে কলকাতার মানুষের কাছে পৌঁছে গেল। এতদিন আমরা দূর থেকে কলকাতার পুজো দেখেছি। এবার কলকাতাও যেন আলতো চোখ তুলে তাকাল আমাদের দিকে। এ বছর মানে ২০২৬ সালে আমরা একেবারে শূন্য থেকে নতুন একটি বারোয়ারি পুজোর আয়োজন করছি। কলকাতার মতো এখানেও জুলাই থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। আগস্টে স্কুলের ছুটিতে বহু প্রবাসী পরিবার কলকাতায় যান। তাঁদের কলকাতা যাওয়ার খবর পেলেই শুরু হয় কেনাকাটার তালিকা। কার সুটকেসে ধূপ, কার ব্যাগে পুজোর উপকরণ, কে কতটা জায়গা ছাড়তে পারবেন, এসব নিয়ে চলে বিস্তর আলোচনা। এবার তো ঢাক থেকে পুজোর বাসনপত্র— প্রায় সবই আনতে হয়েছে কলকাতা থেকে।

আমাদের সেই ‘মহিলা ঢাকি’।

জানেন তো, এখানে কিন্তু কলকাতার মতো রাস্তার ধারে প্যান্ডেল বেঁধে পুজো করা যায় না। কোথাও অগ্নিনিরাপত্তার নিয়মে হোমযজ্ঞের আগুন জ্বালানো নিষেধ, কোথাও আবার দর্শনার্থীর সংখ্যায় কড়া নিয়ন্ত্রণ। সব শর্ত মেনে প্রেক্ষাগৃহ পাওয়াটাই যেন এক বিরাট যজ্ঞ!তার ওপর রয়েছে সময়ের হিসেব–নিকেশ। সেন্ট্রাল ইউরোপিয়ান সামার টাইম অনুযায়ী মিউনিখ কলকাতার থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা পিছিয়ে। তবু অঞ্জলি কিংবা সন্ধিপুজোর মতো আচারগুলোর সময় ঠিক করতে আমরা যথাসম্ভব কলকাতার পুজোর নির্ঘণ্ট মাথায় রাখার চেষ্টা করি। এদিকে আবার আরেক সমস্যা। এখানে পুজোর দিনগুলোয় অফিসও খোলা থাকে। ফলে ঘড়ির কাঁটা, কাজের ব্যস্ততা আর পুজোর নিয়ম, সবকিছুর মধ্যে সমন্বয় করাটাও একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ।

এরপর তো রয়েইছে অনুষ্ঠানের জন্য শিল্পী আনা, অন্য শহরের আয়োজকদের সঙ্গে যৌথ অনুষ্ঠানের আলোচনা, প্রসাদ, ভোগ, আমন্ত্রণ, প্রচার আর খাবারের মেনু ঠিক করা। অফিস আর সংসার সামলে কত মানুষ যে স্বেচ্ছায় এসব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন ভাবলেই অবাক হয়ে যাবেন! আমার স্ত্রীর ব্যস্ততা আবার গান আর নাচের অনুষ্ঠান নিয়েই বেশি। পুজোর আগে কখনও অন্য সদস্যদের বাড়িতে, কখনও আমাদের বাড়িতেও জমজমাট মহড়া বসে। বসার ঘরই তখন ছোটখাটো মঞ্চ। কোথাও গানের সুর ঠিক হচ্ছে, কোথাও নাচের তাল মেলানো চলছে। তার ফাঁকে বারেবারে চা আর দেদার আড্ডা। মহড়ার সংখ্যা যত বাড়ে, বুঝতে পারি পুজো তত কাছে আসছে। কলকাতায় প্যান্ডেল তৈরির শব্দে পুজোর আগমন টের পেতাম। মিউনিখে সেই বার্তা আসে আমাদের বসার ঘরের গান থেকে।

মূর্তি আনা–নেওয়াও কম ঝক্কির ব্যাপার নয়। এখানে প্রতি বছর নতুন প্রতিমা আনা সম্ভব হয় না। তাই পুজো শেষে প্রতিমাকে স্টোরেজ ইউনিটে যত্ন করে রেখে দেওয়া হয়। পরের বছর আবার সেখান থেকে নিয়ে আসা হয়। এই কাজে জুড়ে গিয়ে বুঝেছি কতখানি পরিশ্রম লুকিয়ে থাকে এর পেছনে। কিন্তু আশ্চর্য কী জানেন, কাজ করতে গিয়ে কষ্টের চেয়ে আনন্দের ভাগটাই হয় বেশি। কেউ প্রতিমা সাজাচ্ছেন, কেউ পুজোর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, কেউ আবার খাবারের দায়িত্বে কোমর বেঁধে নেমেছেন। মনে হয়, এ যেন একটা বিরাট যৌথ পরিবার।

পুজোর পোশাক নিয়েও আমাদের উৎসাহ কিন্তু কম নয়। বছরের যে সময়েই কলকাতায় যাই, নতুন শাড়ি আর পাজামা–পাঞ্জাবি কিনে আনি। মিউনিখের রাস্তায় অক্টোবরফেস্টের সময় লেডারহোজেন আর ডির্ন্ডল দেখতেই অভ্যস্ত আমাদের চোখ। কিন্তু পুজোর দিনগুলোয় আমাদের শাড়ি–পাঞ্জাবিও যেন এই শহরের রঙিন ছবিতে এক টুকরো জায়গা করে নেয়। যদিও ঠান্ডায় অনেক সময়ই তার ওপর জ্যাকেট চাপাতে হয়। তবে সুযোগ পেলেই জ্যাকেট খুলে পুরোদস্তুর বাঙালি সাজটা কড়ায় গন্ডায় উপভোগ করি। স্থানীয় জার্মানরা একরাশ কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে দেখেন আমাদের দিকে। আমার স্ত্রীকে শাড়ি পরতে দেখে জার্মানদের কাছ থেকে যে কতবার শাড়ির প্রশংসা শুনতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।
মিউনিখের ভারতীয় কনস্যুলেটও আমাদের উদ্যোগে সহযোগিতা করেন।পুজো মানেই তো শুধু অঞ্জলি আর ভোগ নয়। নাচ, গান, শ্রুতিনাটক, নাটক, সবই থাকে। নবরাত্রির কথা মাথায় রেখে ডান্ডিয়াও হয়। ভালো লাগে যখন জার্মান অতিথিরাও আমাদের সঙ্গে ডান্ডিয়া কিংবা ধুনুচি নাচে পা মেলান। কলকাতার তুলনায় আয়োজন ছোট হলেও পাঁচ দিনে প্রায় এক হাজার মানুষের সমাগম হয় আমাদের পুজো চত্বরে থুড়ি প্রেক্ষাগৃহে।

তবে পুজো এসেছে সেটা বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় কী জানেন? আমাদের বাড়িতে ওই পাঁচ দিন আর হাঁড়ি চড়ে না! সবাই মিলে খাওয়াদাওয়া, আড্ডা আর হইহুল্লোড়। কেউ নিজের হাতে তৈরি বাঙালি পদ নিয়ে আসেন, আবার কেউ বা নতুন ফিউশন রান্না। ছোট ছোট খাবারের স্টলগুলো দেখে কখনও মনে হয় কলকাতার কোনও পুজোমণ্ডপের পাশের রাস্তাতেই বুঝি দাঁড়িয়ে আছি।

আবার এসো মা।

তবে এদেশেই জন্ম হয়েছে যে সব বাঙালি খুদেদের, তাদের কাছে পুজোর অর্থটা এক্কেবারে আলাদা। তাদের প্রশ্নবাণে তখন বড়দের অবস্থা কাহিল!‌ মা দুর্গার দশটা হাত কেন? ঢাক কেন বাজে? অঞ্জলি কী? অজস্র প্রশ্ন আর অফুরন্ত কৌতূহল! এই পাঁচটা দিন ওরা ছড়া বলে, গান গায়, নাচে, বাদ্যযন্ত্র বাজায়। আমাদের কাছে পুজো যেখানে শৈশবের স্মৃতি, ওদের কাছে সেটা নিজেদের শিকড় চিনে নেওয়ার সুযোগ।

পুজো শেষে প্রতিমাকে আবার যত্ন করে রেখে আসার গুরু দায়িত্ব। প্রেক্ষাগৃহ খালি হয়। সবাই ফিরে যাই নিজেদের রোজনামচায়। কিন্তু মনটা পড়ে থাকে এই পাঁচটা দিনের মধ্যেই। মাঝেমধ্যে মনে হয়, মা দুর্গা শুধু শুধু বাংলা বা ভারতেই আসেন না। বিদেশের মাটিতে ছড়িয়ে থাকা আমাদের মতো প্রবাসীদেরও এক জায়গায় জুটিয়ে দেন। কলকাতা থেকে সাত হাজার কিলোমিটার দূরে, আল্পসের কোলে এই কয়েকটা দিন তাই শুধু দুর্গাপুজো নয়। এ আমাদের কদিনের জন্য কলকাতা ফিরে পাওয়া। শিকড়ে ফেরা। আর অনেকটা ঘরের মানুষ হয়ে ওঠার গল্প।

প্রতিবেদন

Lopa Bhowmik