সার্ডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে কীভাবে মোকাবিলা করবেন?
ডাঃ শুভদীপ লস্কর
ক্রিটিক্যাল কেয়ার ফিজিশিয়ান
* সার্ডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে মৃত্যু নানা পাটেকরের। সাধারণ মানুষ এমন সমস্যায় পড়লে কীভাবে মোকাবিলা করবেন, জানিয়েছেন চিকিৎসক।
আচমকাই চলে গেলেন ভারতীয় সিনেমার কিংবদন্তি অভিনেতা নানা পাটেকর। জানা গিয়েছে বৃহস্পতিবার ভোরে নিজের বাড়িতে হঠাৎই অসুস্থ হয়ে পড়েন। অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের প্রায় ৪৫ মিনিটের মরিয়া চেষ্টার পরেও শেষরক্ষা হয়নি। কিন্তু কী হয়েছিল নানার? কোনও পূর্ব লক্ষণ ছাড়াই এভাবে আচমকা কেন মারা গেলেন অভিনেতা? ডাক্তারি পরিভাষায় একে বলে সার্ডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট। এই রোগ হঠাৎই হানা দেয় শরীরে। মুহূর্তে বন্ধ করে দেয় হৃদযন্ত্রে রক্তচলাচল। আরও সহজ করে বলতে গেলে হৃৎপিণ্ড হঠাৎ ও আকস্মিকভাবে রক্ত পাম্প করা বন্ধ করে দেয়। তার ৪–৫ মিনিটের মধ্যেই কাজ করা বন্ধ করে দেয় মস্তিষ্কও। তখন আর ফেরানোর কোনও উপায় থাকে না।
নানার মৃত্যুর পর চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, প্রায় ৪৫ মিনিট একটানা CPR দেওয়ার পরও বাঁচানো যায়নি তাঁকে। এখন প্রশ্ন হল কী এই CPR? এরকম ক্ষেত্রে কীভাবে কাজ করে এই প্রক্রিয়টি? CPR অর্থাৎ Cardiopulmonary Resuscitation। বুকের ওপর ক্রমাগত চাপ দিয়ে হৃদযন্ত্রকে চালানোর চেষ্টা করা হয় এক্ষেত্রে। অনেক সময় কাজও হয়। চাপের ফলে ঘুমিযে পড়া হৃদযন্ত্র হঠাৎ করে জেগে ওঠে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত নানার ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি। সাধারণত ৩০ মিনিট থেকে ৪৫ মিনিট পর্যন্ত CPR দেওয়া যেতে পারে। এটি মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ সচল রাখতে সাহায্য করে।
জানা গেছে, যখন নানা পাটেকরের সার্ডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়, তখন তিনি বাড়িতে একা ছিলেন। বন্ধুকে মেসেজ করেছিলেন। কিন্তু তিনি পৌঁছোতে পৌঁছোতেই সব আশা প্রায় শেষ হয়ে যায়। এই বিষয়টি এক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এরকম ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা শুরু করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে হয়ত বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া গেলেও যেতে পারে। দেরি হলেই সবটা হাতে বাইরে বেরিয়ে যায়। এরকম ক্ষেত্রে তাই প্রত্যেকটা সেকেন্ডই খুব গুরুত্বপূর্ণ।
এখন প্রশ্ন হল কী করে বোঝা যাবে যে, কেউ সার্ডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের শিকার হয়েছেন? প্রথমত যে লক্ষণটি দেখা দেবে সেটি হল, বুকের মধ্যিখানের পেছন দিকে তীব্র ব্যথা। ব্যথা হতে পারে বুকের বাঁদিকেও। এছাড়াও, হঠাৎ চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা, কাশতে কাশতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলা, নাড়ি বা পালস রেড খুব বেড়ে যাওয়া, কমে যাওয়া, সাড় না থাকা, রোগীকে ডাকলে বা ঝাঁকুনি দিলেও কোনও প্রতিক্রিয়া না পাওয়ার মতো একাধিক লক্ষণ রয়েছে।
সবকিছুর পেছনেই যেমন কিছু কারণ থাকে, এর পেছনেও কিছু মূল কারণ আছে। তারমধ্যে অন্যতম অবশ্যই করোনারি আর্টারি ডিজিজ। এক্ষেত্রে হৃদরোগের কারণে রক্তনালী সরু হয়ে যায়। মূলত প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সার্ডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের এটাই বড় কারণ। আগে যদি হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকে, তাহলেও সার্ডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ঘটনা ঘটতে পারে। যদি হৃৎপিণ্ডের পেশী অতিরিক্ত মোটা বা বড় হয়ে যায়, মানে কার্ডিওমাইওপ্যাথির ফলেও কেউ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। জন্ম থেকেই যদি হৃৎপিণ্ডে কোনও গঠনগত সমস্যা থাকে তাহলেও এই বিপদ আচমকা হানা দিতে পারে। এছাড়াও তীব্র রক্তক্ষরণ, শরীরে অক্সিজেনের চরম অভাব, জলে ডুবে যাওয়া, অতিরিক্ত মাত্রায় ড্রাগ বা ওষুধের প্রতিক্রিয়া, এবং তীব্র বৈদ্যুতিক শকের ফলেও সার্ডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের ঘটনা ঘটে। প্রয়োজনে এনজিওপ্লাস্টি, স্টেন্ট পরানো বা করোনারি আর্টারি বাইপাস সার্জারিও করা হয়।
এক্ষেত্রে ধুমপান বা অন্যান্য নেশার কথা উল্লেখ না করলে অন্যায় হবে। ধুমপান বা নেশা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। সময়ের আগেই বুড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়। ফলে সার্ডেন কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের মতো ঘটনা ঘটে যায়। তবে দুঃখের বিষয়, এই রোগটি এখন আর কেবল বয়স্কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বাচ্চা, তরুণ, মাঝবয়সী সবাইকেই এই রোগে আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে আজকাল। তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে যে, যাঁরা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট থেকে বেঁচে ফেরেন বা যাঁদের ঝুঁকি বেশি তাঁদের সবসময়ই চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে। কখনও কোনও অসুবিধে হলে পরিবারের লোককে জানান।
