‘খাইখাই কেষ্ট’ আর ‘খ্যাঁটন গোপাল’এর পেটপুজোর জম্পেশ প্ল্যান
পুজোয় পেটপুজো নিয়ে রম্যরচনা। লিখেছেন সন্দীপন বিশ্বাস
পুজো মানে শুধু জামাকাপড় কেনা বা ঠাকুর দেখা নয়। পুজো মানে পেটপুজোও। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত বাঙালির জমিয়ে খাওয়া দাওয়া চলে। এবার পুজোয় কী খ্যাঁটন হবে, তার মেনু তৈরি করে ফেলেছে দুই পেটুক। নাম ওদের কেষ্ট আর গোপাল। কিন্তু খাইখাই স্বভাবের জন্য তাদের পাড়ায় নাম হয়েছে ‘খাইখাই কেষ্ট’ আর ‘খ্যাঁটন গোপাল’। পুজোর মণ্ডপে প্রতিমা দেখার আগে এদের চোখ খোঁজে ফুচকা কিংবা কাবাবের স্টল আর বিরিয়ানির দোকান। ঠাকুরের সামনে যতটা সময় দাঁড়ায়, তার চেয়ে বেশি সময় দাঁড়ায় ওরা খাবারের লাইনে। এবার তো পুজো এসে গেল। তাই খাবারের রোডম্যাপ তৈরি করতে ব্যাপক পরিশ্রম করতে হয়েছে দুই পেটুককে।
এক সন্ধ্যায় পাড়ার চায়ের দোকানে বসে কেষ্ট বলল, ‘গোপাল, পুজোর আর দেরি নেই কিন্তু!’
গোপাল চায়ে বিস্কুট ডুবিয়ে বলল, ‘সে আর বলতে! অঙ্কে কাঁচা ছিলাম বলে কী আর পুজোর দিন গুনতে পারব না?’
কেষ্ট: ‘তাহলে! মেনু নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য নেই কেন? পেট-পঞ্জিকার সূচিগুলো মিলিয়ে নিতে হবে তো!’
গোপাল: ‘তাহলে এক কাজ কর, ভবেশদার দোকান থেকে দু’টো ভেজ চপ আর দু’টো বেগুলি নিয়ে আয়। খেতে খেতে আলোচনা করা যাবে।’
কেষ্ট: ‘ধুর! ভবেশদা আর ধার দেবে না বলেছে।’
গোপাল: ‘যাত্তেরি! ওপেনিং ওভারের বল যদি এভাবে ওয়াইড হয়, তাহলে খেলব কীভাবে!’ বলেই গোপাল পকেট থেকে দু’টো দশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘ক্যাশে নিয়ে আয়। বাড়তি যা লাগবে, দিয়ে দিস।’
চপ খেতে খেতে শুরু হল আলোচনা। কেষ্ট বলল, ‘শোন, এবার কিন্তু পরিকল্পনা করে খেতে হবে। প্রতিদিন নতুন একটা পদ থাকবে। আবার এমন যেন না হয় যে, দশমীর দিন বাড়ির সামনে অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়াচ্ছে।’
গোপাল মাথা নেড়ে বলল, ‘ঠিক কথা। পুজো পাঁচদিন হলে হবে কী, পেট তো একটাই!’
কেষ্ট: ‘এই প্রথম জীবনে তুই একটা কথা জ্ঞানীর মতো বললি।’
গোপাল: ‘ষষ্ঠী থেকেই পেটকে ধীরে ধীরে পুজোর মুডে আনতে হবে কিন্তু। হাঁউহাঁউ করে খেলে হবে না। মেপে মেপে ফিজিক্যালি আপলোড করতে হবে।’
কেষ্ট বলল, ‘বেশ। ষষ্ঠীতে হালকা দিয়ে শুরু হোক।’
গোপাল: ‘কী রকম?’
কেষ্ট: ‘দুপুরে ভাত, মুগ ডাল, আলুভাজা, মাছের ঝোল।’
গোপাল মুখ বেঁকাল। বলল, ‘প্রথম দিনেই রুগী বানিয়ে দিলি!’
কেষ্ট: ‘সবটা শোন আগে। সঙ্গে থাকছে কাঁচা আমের টক-মিষ্টি চাটনি। আর রাবড়ি। ওপরে হালকা করে ছড়ানো গাওয়া ঘিয়ের ভাজা মিহিদানা।
গোপাল: ‘এবার খাওয়াটা একটা জীবন পেল। মানে ষষ্ঠীর পুষ্টি।’
কেষ্ট: ‘এরপর রাতে বিরিয়ানি—’
তাকে থামিয়ে গোপাল বলল, ‘প্রথম রাতে বেড়াল মারলেও বিরিয়ানি মারতে নেই। আমার সাজেশন মিক্সড ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন। শেষে কুলফি।’
কেষ্ট চেঁচিয়ে বলল, ‘জয় ষষ্ঠীর জয়।’
গোপাল বলল, ‘পরের দিন আয়। কেননা সপ্তমী থেকে পাওয়ার প্লে শুরু।’
কেষ্ট বলল, ‘দুপুরে যদি একটু বাসন্তী পোলাও হয়, কেমন হবে?’
গোপাল বলল, ‘থামলে হবে না। এগোতে হবে। তারপর কী?’
কেষ্ট বলল, ‘এই ধর, ছোলার ডাল।’
গোপাল মুখ কুঁচকে বলল, ‘ধুস। পুরো লোপ্পা ক্যাচ। ফুড কালচার সম্পর্কে কোনও কালচার নেই তোর। পোলাওয়ের সঙ্গে ছোলার ডাল, বাঁধাকপির সঙ্গে শুক্তের ফিউশন, ভেটকির পাতুড়ির সঙ্গে নটে শাকের ডালনা! কী চাইছিস বলতো?’
কেষ্ট বলল, ‘ঠিক আছে, ডিআর এস নিচ্ছি। থাকবে চিংড়ির মালাইকারি।’
গোপাল একটু ভেবে বলল, ‘চলবে। পরের বল করতে হবে।’
কেষ্ট: ‘সঙ্গে চাটনি আর পান্তুয়া।’
গোপাল: ‘টমেটো-খেজুর চাই কিন্তু। সেই সঙ্গে একটু ঘন মিষ্টি দই রাখলে পেটটা ঠান্ডা হয়।
কেষ্ট: ‘বাজে কথা বলিস না। তোর ওটা তো পেট নয়, রাবণের চিতা। দিনরাত জ্বলছে।’
গোপাল বলল, ‘মেলা কপচাস না, এবার রাতে আয়।’
কেষ্ট বলল, ‘এবার তোর ওভার।’
গোপাল: ‘অষ্টমী কিন্তু নিরামিষ। তাই নো মাছ-মাংস।’
কেষ্ট বলল, ‘আরে বাবা জানি। ভেজ একটা আর্ট। ঠিকমতো সাজাতে পারলে নন ভেজকে ইনিংস ডিফিট দেবে।’
গোপাল: ‘লুচি থাকবে। সঙ্গে ছোলার ডাল। ছানার ডালনা।
কেষ্ট সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘ছানাটা যেন ফুল ক্রিম ছানা হয়, ওসব বাজারের ছিবড়ে পনির হলে খাব না।’
গোপাল বলল, ‘হবেরে বাবা। বাকিটা শোন। আলু-ফুলকপির রসা। শেষ পাতে পায়েস।’
কেষ্ট বলল, ‘ফাটাফাটি। তবে গণতন্ত্রের অভাব থেকে গেল।’
গোপাল বলল, ‘ভয় নেই। নবমীতে আসবে পূর্ণ গণতন্ত্রের ঝোড়ো হাওয়া।’
কেষ্ট: ‘সে তো জানি। নবমীতে খাসি—’
গোপাল চোখ কুঁচকে বলল, ‘বড্ড ভালোবাসি। সঙ্গে কি পোলাও?’
কেষ্ট: ‘আবার পোলাও? খাসির মাংসের সঙ্গে থাকবে সাদা ভাত, সঙ্গে থাকবে ভাজা সোনা মুগের ডাল, হালকা করে কপি দেওয়া, ঝুরো আলুভাজা, তপসে ফ্রাই, আমের চাটনি।’
গোপাল: ‘মিষ্টি?’
কেষ্ট: ‘সেও থাকবে। ভালো জলভরা তালশাঁস পেলে শেষপাতে মোক্ষলাভ হয়ে যাবে।’
গোপাল বলল, ‘রাতে?’
কেষ্ট: ‘ওটা তোর ওপর ছাড়লাম। যা বলবি।’
গোপাল: ‘বলার কোনও ব্যাপারই নেই ন্যাচরাল চয়েস, মাটন বিরিয়ানি আর ফিরনি। সঙ্গে কোল্ড ড্রিঙ্কস। ব্যস!’
কেষ্ট: ‘না ওটা পরদিন হবে। বরং রাতে একটু মেডেন ওভার দেওয়া যাক। সব ঠিক আছে তবে বিরিয়ানির বদলে মিক্সড চাউ।’
গোপাল: ‘বেশ চলবে। দশমীর বড় ম্যাচের কথা মাথায় রেখে নবমীর রাতে চাউ মাউ খাউ খেয়ে গাইব, যোয়ো না রজনী আজি।’
কেষ্ট: ‘এবার দশমী। দুপুরে থাকবে বিশাল ধামাকা।’
গোপাল: ‘জানি তো বিরিয়ানি।’
কেষ্ট: ‘শুধু বিরিয়ানি নয়। ইলিশ বিরিয়ানি।’
গোপাল: ‘শুনেই আমার মনটা কেমন যেন কাশফুলের মতো হাওয়ায় দুলছে। তবে খোকা ইলিশের বিরিয়ানি আমি খাব না।’
কেষ্ট: ‘খোকা কেন হবে। মিনিমাম এক কেজি সাইজের হবে। আর পেটটা হবে সাত ইঞ্চি চওড়া।’
গোপাল: ‘ঢপ দিও না বস, এমন ইলিশ সারা ভারতে নেই।’
কেষ্ট: ‘ওরে যা নেই ভারতে, তাই পাবি গাবলুর আড়তে। আমার সঙ্গে মাছ বিক্রেতা গাবলুর কথা হয়েছে। দশমীর সকালে দুই বোমকাই ইলিশ আমাকে দেবে। জেনে রাখ, টেনশন লেনে কা নেহি।’
গোপাল বলল, ‘আর কিছু লাগবে না। শুধু রাইস আর দু’ পিস ইলিশ।’
কেষ্ট: ‘আরও কিছু লাগবে।’
গোপাল: ‘কী?’
কেষ্ট: ‘অ্যান্টাসিড এবং ও আর এস।’
দু’জনেই এবার হেসে উঠল। গোপাল বলল, ‘সত্যি এটা যদি হয়, তাহলে পেটপুজো শব্দটার একটা সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যাবে।’
