পদকের ঔজ্জ্বল্যে নতুন আত্মবিশ্বাসে জেগে উঠবে ভারত
এশিয়ার ক্রীড়ামঞ্চে ভারতের পতাকা উঠেছে বারবার। বেজেছে জাতীয় সঙ্গীত। একের পর এক সাফল্যে সোনা, রুপো ও ব্রোঞ্জে সমৃদ্ধ হয়েছে ভারতীয় ক্রীড়াবিদদের ঝুলি। শেষ পর্যন্ত ২১টি সোনা, ২৭টি রুপো এবং ৩৭টি ব্রোঞ্জ অর্থাৎ মোট ৮৫টি পদক নিয়ে এশিয়ান গেমসের পদক তালিকায় চতুর্থ স্থানে শেষ করেছে ভারত।
একজন ভারতবাসী হিসেবে এই সাফল্যে গর্বিত হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু একজন সচেতন ক্রীড়াপ্রেমী হিসেবে এখানেই থেমে যাওয়া যায় না। কারণ এই ৮৫টি পদকের পিছনে যেমন অসাধারণ সাফল্যের গল্প আছে, তেমনই আছে আগামী দিনের জন্য কিছু কঠিন প্রশ্ন।
এই গেমসে ভারতের অন্যতম বড় সাফল্য এসেছে দলগত খেলায়। পুরুষ ক্রিকেটে পাকিস্তানকে ১৯ রানে হারিয়ে সোনা জিতেছে ভারত। মহিলারাও আগেই জিতেছিলেন সোনা। অর্থাৎ এশিয়ান গেমসে ক্রিকেটে ভারতীয় দলের দ্বিমুকুট এসেছে।
হকিতেও এসেছে ঐতিহাসিক সাফল্য। মালয়েশিয়াকে ৫-১ গোলে হারিয়ে পুরুষ দল সোনা জিতেছে। তার আগে চীনকে হারিয়ে মহিলা দলও সোনা জিতেছিল। এশিয়ান গেমসের ইতিহাসে এই প্রথম ভারত একই আসরে পুরুষ ও মহিলা, দুই হকি দলেই সোনা জিতল। পুরুষ দলের সোনা আবার লস অ্যাঞ্জেলেস ২০২৮ অলিম্পিকের যোগ্যতাও নিশ্চিত করেছে।
তিরন্দাজিতেও ভারতীয় সাফল্য বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। নতুন প্রজন্মের ক্রীড়াবিদরা নিজেদের মেলে ধরেছেন। শুটিং, কুস্তি, গল্ফ সহ একাধিক খেলায় এসেছে পদক। ফলে ভারতের ক্রীড়া-সাফল্যের পরিধি যে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
প্রতিটি পদকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সেই অনন্য মুহূর্ত। পদকজয়ীর গলায় ঝুলছে মেডেল, হাতে তেরঙ্গা আর ক্রীড়াঙ্গনে বাজছে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত। কত ক্রীড়াবিদকে অআমরা দেখলাম পদক গলায় ভিক্ট্রি স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন। এই দৃশ্য শুধু আবেগ তৈরি করে না। এটি একটি দেশের আত্মবিশ্বাসও তৈরি করে। ভারতের কোটি কোটি মানুষের মনে একটা শপথ তৈরি করে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথাও বলা দরকার।
২০২৩ সালের হাংঝৌ এশিয়ান গেমসে ভারত ১০৬টি পদক জিতেছিল। ২৮টি সোনা সহ। এবার মোট পদক ৮৫, সোনা ২১। অর্থাৎ মোট পদকের সংখ্যায় ২১টি এবং সোনায় সাতটি কমেছে। তাই এবারের সাফল্যকে যেমন ছোট করে দেখার কোনও কারণ নেই, তেমনই শুধুমাত্র ‘চতুর্থ স্থান’ দেখে আত্মতুষ্ট হওয়ারও কারণ নেই। বরং এই ফলাফলকে দেখতে হবে দু’টি দিক থেকে।
প্রথমত, ভারতীয় ক্রীড়াবিদদের সামর্থ্য বেড়েছে। তাঁরা এখন শুধু ক্রিকেট, হকি বা কয়েকটি পরিচিত খেলায় নয়, বিভিন্ন ডিসিপ্লিনে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করছেন। নতুন প্রতিভা উঠে আসছে। একাধিক খেলায় আন্তর্জাতিক মানের পারফরম্যান্স দেখা যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, কিছু ঐতিহ্যগত শক্তিক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল না আসার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করতে হবে। কারণ একটি ক্রীড়াশক্তির পরিচয় শুধু কয়েকজন তারকা বা কয়েকটি সাফল্য দিয়ে হয় না। শক্তিশালী ক্রীড়া পরিকাঠামো তৈরি হয় তৃণমূল স্তর থেকে। একজন পদকজয়ী তৈরি হন পদকজয়ের দিন নয়, তার বহু বছর আগে। কোনও ছোট শহরের মাঠে, কোনও স্কুলের অনুশীলন কেন্দ্রে, কোনও প্রত্যন্ত গ্রামের মাটিতে শুরু হয় সেই যাত্রা। সেখানে প্রয়োজন প্রশিক্ষক, পরিকাঠামো, পুষ্টি, স্পোর্টস সায়েন্স, চিকিৎসা, মানসিক প্রস্তুতি এবং সবচেয়ে বড় কথা হল, দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ।
আমাদের কাজ তাই শুধু পদকজয়ীদের অভিনন্দন জানানো নয়। তাঁদের সাফল্য থেকে একটি বৃহত্তর ক্রীড়া-সংস্কৃতি তৈরি করা। আজ যে শিশু টেলিভিশনে বা মোবাইলের পর্দায় ভারতীয় অ্যাথলিটের গলায় পদক দেখছে, তার মনে যদি এই প্রশ্ন জন্মায়, ‘আমিও কি একদিন দেশের হয়ে খেলতে পারি?’—তাহলেই এই সাফল্যের প্রকৃত সামাজিক মূল্য তৈরি হবে।
এশিয়ান গেমস শেষ হয়েছে। পদক তালিকাও এখন ইতিহাস। কিন্তু ইতিহাসের এই অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত, ভারত এগোচ্ছে। তবে আরও বেশি পারার ক্ষমতা ভারতের আছে। ৮৫টি পদক আমাদের গর্ব দিয়েছে। ২১টি সোনা আমাদের আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। আর ২০২৩-এর ১০৬ থেকে এবার ৮৫-তে নেমে আসা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, সাফল্যকে ধরে রাখার জন্য আত্মতুষ্টি নয়, আরও কঠোর প্রস্তুতি দরকার।
আজ আমরা গর্বিত। আগামীকাল আমাদের আরও প্রস্তুত হতে হবে। কারণ ভারতীয় ক্রীড়ার আসল সাফল্য ৮৫টি পদকে শেষ নয়, এটি আরও বড় এক যাত্রার শুরু। আত্মতুষ্টি প্রতিভার বিনাশ করে, অগ্রগতির পথ রুদ্ধ করে এটুকু না বুঝলে লাভের থেকে ক্ষতিই বেশি।
