বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
বেলুড় মঠে মহাসাড়ম্বরে হয়ে গেল কুমারী পুজো পাঁজরে হাড় ভেঙে ফুসফুসে, চোরবাগানের ময়নাতদন্তের ভয়াবহ রিপোর্ট টাইগার শ্রফের উপর গুলি, হামলা, গ্রেপ্তার ৩ টাইগার শ্রফকে হামলায় দায়স্বীকার বিষ্ণোই গ্যাংয়ের

শিক্ষা ব্যবস্থা কোনদিকে?

17 August, 2026 5:02 PM Sumantra Mukherjee
শেয়ার করুন

একটি দেশের ভবিষ্যৎ কোথায় তৈরি হয়? না, সংসদে নয়, মন্ত্রিসভার বৈঠকে নয়, তা তৈরি হয় স্কুলে। স্কুলে বসে যে শিশুটি আজ অক্ষর চিনছে, আগামী দিনে তার হাতেই সুরক্ষিত থাকবে দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, বিজ্ঞান, সংস্কৃতি এবং গণতন্ত্র। তাই রাজনৈতিক নেতা বা মন্ত্রীরা যদি মনে করেন, শিক্ষা একটি সরকারি প্রকল্পমাত্র, তাহলে তাঁরা ভুল করবেন। শিক্ষা হল রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রধান ভিত্তি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হল, সেই ভিত্তিটাই আজ কোথাও কোথাও যেন নড়বড়ে হয়ে উঠছে।

একদিকে স্কুলছুটের সমস্যা বাড়ছে, অন্যদিকে একের পর এক স্কুল বন্ধ হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, কোথাও পড়ুয়ার সংখ্যা কম, কোথাও পরিকাঠামোর অভাব, কোথাও শিক্ষক নেই। পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতা, পরীক্ষা নিয়ে বিতর্ক, দুর্নীতির অভিযোগ এবং প্রশ্নফাঁসের মতো ঘটনায় শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের অনাস্থা বাড়ছে। এমন একটি অবস্থানে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে, শিক্ষা ব্যবস্থা কোনদিকে যাচ্ছে?

একটি স্কুল মানে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীর স্বপ্ন। শিক্ষাসরণি থেকে সরে যাওয়া কোনও শিশুর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। তার পিছনে থাকে দারিদ্র্য, পরিবারের আর্থিক চাপ, যাতায়াতের সমস্যা, শিক্ষার পরিবেশ, প্রযুক্তিগত বৈষম্য এবং কখনও কখনও রাষ্ট্রের উদাসীনতা। তাই ড্রপ আউটের সংখ্যা কমানোর জন্য শুধু পরিসংখ্যান প্রকাশ করলেই হবে না। জানতে হবে, কেন শিশুটি স্কুল ছেড়ে দিল?

এছাড়া একটি ভালো স্কুলের প্রাণ তার শিক্ষক। আধুনিক ভবন, স্মার্ট ক্লাসরুম, কম্পিউটার সবই প্রয়োজন। কিন্তু একজন দক্ষ, প্রশিক্ষিত এবং পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক ছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থা কখনও শক্তিশালী হতে পারে না। অথচ শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে বছরের পর বছর অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু চাকরিপ্রার্থীর উপর পড়ে না। তার সরাসরি প্রভাব পড়ে শ্রেণিকক্ষে। একজন শিক্ষককে যদি একসঙ্গে বহু শ্রেণি, বহু বিষয় এবং বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিতে হয়, তাহলে শিক্ষার মান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষায় অনিয়ম কিংবা নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ!

কর্তাদের মনে রাখা দরকার, পরীক্ষা শুধু একটি পরীক্ষা নয়। একজন ছাত্র বা চাকরিপ্রার্থীর কাছে সেটি তার বহু বছরের পরিশ্রমের মূল্যায়ন। প্রশ্নফাঁস হলে শুধু একটি প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় না, বিনষ্ট হয় যোগ্যতার মূল্য। পরিশ্রমী ছাত্রের আত্মবিশ্বাস ভেঙে যায়। আর সমাজে জন্ম নেয় একটি বিপজ্জনক ধারণা। যোগ্যতার থেকে সিস্টেম তাহলে বেশি শক্তিশালী?

আজকের প্রজন্ম প্রযুক্তির যুগে বড় হচ্ছে। তারা পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা, বিজ্ঞান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং নতুন নতুন আবিষ্কারের সঙ্গে পরিচিত। অথচ তাদের সামনে যদি থাকে দুর্বল পরিকাঠামো, শিক্ষক সংকট, অনিশ্চিত পরীক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রশ্নফাঁসের আতঙ্ক, তাহলে আমরা তাদের কাছে কী বার্তা দিচ্ছি? তাদের সামনে দাঁড়ালে আমাদের মাথা কি হেঁট হয়ে যাবে না?

শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি কখনওই বরদাস্ত করা উচিত নয়। সরকারের নীতি নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। কোন পাঠ্যক্রম হবে, কোন ভাষায় শিক্ষা হবে, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষার ভারসাম্য কী হবে— এসব নিয়ে মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অঙ্গ। কিন্তু শিক্ষার ভিতকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার শিকার করা উচিত নয়। সরকার বদলাবে, নীতি বদলাবে, পাঠ্যক্রম বদলাবে। কিন্তু একটি শিশুর শিক্ষাজীবনের যে কয়েকটি বছর চলে যায়, তা আর ফিরে আসে না। তাই মনে রাখা দরকার,শিক্ষার বাজেট শুধু খরচের হিসাব নয়, সেটি দেশের ভবিষ্যতের বিনিয়োগ।

প্রতিবেদন

Sumantra Mukherjee