বুধবার, ১৪ মে, ২০২৫
ব্রেকিং নিউজ
বেলুড় মঠে মহাসাড়ম্বরে হয়ে গেল কুমারী পুজো পাঁজরে হাড় ভেঙে ফুসফুসে, চোরবাগানের ময়নাতদন্তের ভয়াবহ রিপোর্ট টাইগার শ্রফের উপর গুলি, হামলা, গ্রেপ্তার ৩ টাইগার শ্রফকে হামলায় দায়স্বীকার বিষ্ণোই গ্যাংয়ের

আজ বাঙালির প্রয়োজন এমনই একজন ‘ঈশ্বর’এর

26 September, 2026 2:09 PM UTSAB RC
শেয়ার করুন

উনিশ শতকের বাংলায় সমাজ ছিল এক বিভ্রান্তির মধ্যে দাঁড়িয়ে। একদিকে ঔপনিবেশিক আধুনিকতার অভিঘাত, অন্যদিকে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের টানাপোড়েন। সেই বিভ্রান্তিকালে যে ক’জন মানুষ যুক্তি, শিক্ষা ও মানবতাকে সামনে রেখে নতুন সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, বিদ্যাসাগর তাঁদের অন্যতম। বরং অনেকের থেকে তিনি আলাদা। কারণ তাঁর কাছে মানবতা কোনও বিমূর্ত দর্শন ছিল না, ছিল জীবনের প্রত্যক্ষ অনুশীলন।

তিনি শুধু নিজে শিক্ষিত ছিলেন না, শিক্ষাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। সংস্কৃত কলেজে শিক্ষার সংস্কার থেকে শুরু করে বাংলায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, নারীশিক্ষার প্রসার— প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর লক্ষ্য ছিল জ্ঞানের দরজা খুলে দেওয়া। সেই উন্মুক্ত দরজা দিয়ে অন্ধকার ভাঙা আলোয় নতুন প্রজন্ম যেন দু’ চোখে আলো মাখিয়ে নেয়। ঔপনিবেশিক শাসনের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ইংরেজি ও পাশ্চাত্য জ্ঞানের সঙ্গে বাঙালির পরিচয় ঘটিয়ে আধুনিক শিক্ষার ভিত শক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।সমাজের বহু পুরনো, বস্তাপচা সংস্কারের বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই ছিল আরও কঠিন। বিধবা বিবাহের পক্ষে তাঁর আন্দোলন, বহুবিবাহ ও সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান, নারীর শিক্ষার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা—এসব কোনও বিচ্ছিন্ন সংস্কারকর্ম নয়। এগুলির ভিতরে ছিল একটি স্পষ্ট বিশ্বাস: মানুষের মর্যাদা কোনও প্রথা, শাস্ত্র বা সামাজিক অনুমোদনের চেয়ে বড়।সেই কারণেই বিদ্যাসাগরকে শুধু সমাজসংস্কারক বললে তাঁর পরিচয়ের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়। তিনি ছিলেন এক গভীর মানবতাবাদী মননের মানুষ।

বিদেশি সাহিত্য ও সংস্কৃত সাহিত্যকে বাংলায় নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। বেতাল পঞ্চবিংশতি, শকুন্তলা, সীতার বনবাস, ভ্রান্তিবিলাস ইত্যাদি অনুবাদ ও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে তিনি শুধু গল্প বাংলায় আনেননি, বাংলা গদ্যের একটি নতুন পথও নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর বর্ণপরিচয় আজও বাংলা শিক্ষার ইতিহাসে এক অনিবার্য নাম। কিন্তু বিদ্যাসাগরের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো তাঁর অদম্য মেরুদণ্ড। তিনি আপস করতে জানতেন না। মানুষের মর্যাদাt প্রশ্নে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ় মানসিকতার। তাঁর যুক্তিবাদের পিছনে ছিল মানবতাবাদ। দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবনে অসংখ্য মানুষের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেখানে জাত, ধর্ম, সম্প্রদায়ের তিনি কোনও ধার ধারেননি। এসব কাজই তাঁর জীবন দর্শনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

আজ, যখন যুক্তির জায়গায় অন্ধ বিশ্বাস, মানবিকতার জায়গায় বিভাজন এবং প্রশ্ন করার জায়গায় আনুগত্য কখনও কখনও বড় হয়ে উঠতে চায়, তখন বিদ্যাসাগরকে স্মরণ করা শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়। বরং বর্তমানকে একটি আয়নার সামনে দাঁড় করানো। আজ তাই মনে হয়, আমাদের আবার একজন ‘ঈশ্বর’এর দরকার। কিন্তু সেই ঈশ্বর যিনি ঈশ্বরের মাহাত্ম্য প্রচার করবেন না। যিনি বলবেন, মানুষের আগে কোনও পরিচয় নয়; মানুষের মর্যাদার আগে কোনও প্রথা নয়; যুক্তির আগে কোনও অন্ধ আনুগত্য নয়। যিনি বলবেন— ঈশ্বর নয়, মানুষই শেষ কথা। এই বিশ্বাসই হয়তো বিদ্যাসাগরের জন্মদিনে সবথেকে বড় শ্রদ্ধা হিসাবে নতুন আলোর দরজা খুলে দিতে পারে। জন্মদিনে সেই ঋজু মানুষটির প্রতি জানাই শ্রদ্ধা।

প্রতিবেদন

UTSAB RC