মৃত্যুর প্রান্তে, চেতনার শেষ মুহূর্তে মানুষ ঠিক কী ভাবে?
পুলকেশ সেনগুপ্ত
শরশয্যায় শায়িত ভীষ্ম উত্তরায়ণের জন্য অপেক্ষা করছেন। শরীর ছিন্নভিন্ন, তবু চেতনা অটুট। বরং তা স্বাভাবিকের থেকেও তীক্ষ্ণ। এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবকাশেই তিনি যুধিষ্ঠিরকে ধর্ম, রাজনীতি ও জীবনের গূঢ়তম প্রশ্নগুলি নিয়ে উপদেশ দেন। মহাভারতের এই দৃশ্যটি নিছক একটি নাটকীয় মুহূর্ত নয়। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি প্রাচীন প্রত্যয়। মানুষ যখন মৃত্যুর প্রান্তে উপনীত হয়, ততক্ষণ মানুষের মন নিভে যায় না। বরং এক অদ্ভুত সংহতি ও তীব্রতা সে অর্জন করে। আধুনিক বিজ্ঞান সাম্প্রতিক কালে এই একই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়েছে, ভিন্ন পথ ধরে হলেও।
গীতার অষ্টম অধ্যায়ে কৃষ্ণ অর্জুনকে বলেন, ‘যং যং বাপি স্মরণ ভাবং ত্যজত্যন্তে কলেবরম্। তং তমেবৈতি কৌন্তেয় সদা তদ্ভাবভাবিতঃ।’ অর্থাৎ মৃত্যুকালে মানুষ যে ভাব স্মরণ করে দেহত্যাগ করে, পরজন্মে সে সেই ভাব গ্রহণ করে নতুন জন্ম নিয়ে এই পৃথিবীতে ফিরে আসে। এই শ্লোকের কেন্দ্রে একটি গভীর অনুমান আছে। সেটি হল, অন্তিম মুহূর্তের চিন্তা নিছক এলোমেলো স্মৃতির ভিড় নয়, বরং একটি নির্ধারক, দিশা-নির্দেশক শক্তি। তাই ভীষ্মের শেষ দিনগুলিকে তিনি জ্ঞানচর্চায় নিবেদিত করেছিলেন। অর্থাৎ তিনি সচেতনভাবেই তাঁর অন্তিম চিন্তাকে ধর্মের দিকে চালিত করার সাধনা করেছিলেন।
গরুড় পুরাণে এই ধারণা আরও বিস্তৃত রূপ পায়। মৃত্যুর মুহূর্তে যমদূতগণ উপস্থিত হন, আর মানুষের সমগ্র জীবনের কর্মফল যেন এক লহমায় তার সামনে প্রতিভাত হয়ে ওঠে। এটি একরকম হিসেব নিকেশের দৃশ্য। তা নৈতিক বিচারের প্রস্তুতি মাত্র। কিন্তু এই বর্ণনার মধ্যে একটি অভিজ্ঞতামূলক দাবিও নিহিত: যেমন মৃত্যুর প্রান্তে দাঁড়িয়ে মানুষের স্মৃতি দ্রুত এবং সংহত রূপে ফিরে আসে। উপনিষদের ভাষায় একে বলা যায়, আত্মার এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় উত্তরণ। কঠোপনিষদে নচিকেতা যে প্রশ্ন নিয়ে যমের কাছে গিয়েছিলেন, তার মূলেও ছিল এই রূপান্তরের প্রকৃতিকে বোঝার আকাঙ্ক্ষা।
তিন সহস্রাধিক বছর পরে, স্নায়ুবিজ্ঞান প্রায় একই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতিতে। ২০২২ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক একটি ঘটনাক্রমে অস্বাভাবিক তথ্য হাতে পান। হৃদরোগে আক্রান্ত এক রোগীর মস্তিষ্কের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপ (EEG) রেকর্ড করা হচ্ছিল, আর রেকর্ডিং চলাকালীনই তাঁর মৃত্যু ঘটে। হৃদস্পন্দন থেমে যাওয়ার আগে ও পরে প্রায় ত্রিশ সেকেন্ড ধরে মস্তিষ্কে গামা-তরঙ্গের এক তীব্র, সংহত কার্যকলাপ ধরা পড়ে। ঠিক সেই ধরনের তরঙ্গ, যা সাধারণত স্বপ্নদর্শন, গভীর স্মৃতিচারণ বা তীব্র মনোযোগের সময় সক্রিয় হয়। মৃত্যু তাহলে হয়তো ধীরে ধীরে নিভে যাওয়া প্রদীপ নয়, শেষ মুহূর্তে হয়তো এক আকস্মিক, সংক্ষিপ্ত উদ্ভাসন। দপ্ করে জ্বলে উঠে নিভে যায়।
এখানেই পুরাণ আর পরীক্ষাগারের রাস্তা এক বিন্দুতে মেলে। দু’টি ঐতিহ্যই, সহস্র বছরের ব্যবধানে দাঁড়িয়েও একই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করছে বলে মনে হয়। মৃত্যুর মুহূর্তে মন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে না, বরং একটি সংহত, তীব্র সক্রিয়তার মধ্য একটি অন্তিম লক্ষ্যে এগিয়ে যায়, যার কেন্দ্রে থাকে স্মৃতি। গরুড় পুরাণের কর্মফল-দর্শন আর গামা-তরঙ্গের ঝলকানি, দুটোই বলছে অতীতের এক দ্রুত, ঘনীভূত প্রত্যাবর্তন ঘটে জীবনের শেষ প্রান্তে।
তবু এই মিলকে অতিরিক্ত প্রসারিত করার আগে থমকে দাঁড়ানো দরকার। বিজ্ঞান যা প্রমাণ করে, তা কেবল এইটুকু। মস্তিষ্কে একধরনের বৈদ্যুতিক সংকেত ঘটে, যা স্বাভাবিক অবস্থায় স্মৃতি বা স্বপ্নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এই সংকেতের প্রকৃত ‘subject’ কী? অর্থাৎ মৃত্যুপথযাত্রী মানুষ সত্যিই কিছু দেখছেন কিনা বা অনুভব করছেন কিনা, তার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই। সম্ভবত কখনো তা উদ্ভাবন করা যাবে না। একটিমাত্র রোগীর তথ্যকে কেন্দ্র করে সার্বিকভাবে কোনও সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া ঠিক নয়। গীতা ও গরুড় পুরাণ একটি সম্পূর্ণ নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সিদ্ধান্তের কথা বলে। কর্মের ধারাবাহিকতা, পরজন্মের সম্ভাবনা, আত্মার যাত্রা ইত্যাদি। বিজ্ঞান কিন্তু সেই প্রশ্নে এখনও সম্পূর্ণ নীরব। স্নায়ুতরঙ্গ কোথায় গিয়ে থামে, তার পরে কী থাকে বা থাকে না, তা পরীক্ষাগারের সীমানার বাইরে।
তাহলে হয়তো এই মিলের প্রকৃত মূল্য প্রমাণে নয়, প্রশ্নের ধারাবাহিকতায়। ভীষ্মের শরশয্যা আর মিশিগানের ECG Monitor — দুটোই একই মানুষী জিজ্ঞাসার দুই প্রান্ত। মৃত্যু কি নিছক নিভে যাওয়া, নাকি শেষ মুহূর্তে এক সংহত, সচেতন প্রত্যাবর্তন? পুরাণ এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল নৈতিক আখ্যানের ভাষায়, বিজ্ঞান দিচ্ছে তরঙ্গ ও সংকেতের ভাষায়। ভাষা পাল্টেছে, যন্ত্র পাল্টেছে, কিন্তু মানুষ এখনও সেই একই অন্ধকার প্রান্তে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করছে, শেষ মুহূর্তে সে কী ভাবে? কোন ভাবনার ঢেউয়ে সে ভেসে যায়? সে কী অন্ধকার না আলো? শেষ মুহূর্ত কি যন্ত্রণাঋদ্ধ, নাকি তখন চৈতন্যের ভিতরে বয়ে যায় অভূতপূর্ব আনন্দের স্রোত? উত্তর এখনও অধরা।
