ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের কূটনৈতিক জয়, বলছেন বিশেষজ্ঞরা
সুকমল মজুমদার
শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন নয়, ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনকে ভারতের কূটনৈতিক সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবেই দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একাংশ। কারণ, মতপার্থক্য, যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও সদস্য দেশগুলিকে একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে ঐকমত্যে পৌঁছতে সফল হয়েছে নয়াদিল্লি। ‘নিউ দিল্লি ডিক্লারেশন ২০২৬’ গৃহীত হয়েছে সর্বসম্মতিতে।
ভারতের জন্য সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ জায়গাগুলির একটি হল সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান। ঘোষণাপত্রে পাহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলার নিন্দা, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর বার্তা এবং সন্ত্রাসে অর্থ জোগান, জঙ্গি নেটওয়ার্ক ও নিরাপদ আশ্রয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এই ঘোষণাপত্রে চিনও ভারতের সঙ্গে সই করেছে। ফলে বিষয়টি নয়াদিল্লির কূটনৈতিক অবস্থানের পক্ষে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি, ভারত যে ভূমিকাটি নিতে চাইছে, সেটিও স্পষ্ট হয়েছে। ব্রিকসকে কোনও নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে জোট হিসেবে না দেখে সামগ্রিক বিশ্বব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছে নয়াদিল্লি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বারবার বলেছেন, ব্রিকস কারও বিরুদ্ধে নয়; বরং বিশ্বব্যবস্থাকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ করার একটি প্ল্যাটফর্ম। ঘোষণাপত্রেও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কার এবং আরও ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ভারত-চিন সম্পর্ক। ব্রিকসের মঞ্চে মোদি ও জিনপিংয়ের বৈঠকে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখার পাশাপাশি বাণিজ্য, যোগাযোগ, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং সরবরাহ-শৃঙ্খল নিয়ে সহযোগিতার কথা হয়েছে। সীমান্ত সমস্যা এখনও অমীমাংসিত—তাই এই বৈঠককে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চূড়ান্ত সাফল্য বলা যাবে না। তবে দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের এই যোগাযোগ নিঃসন্দেহে কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘস্থায়ী কৌশলগত সম্পর্কও ব্রিকসের মঞ্চে আরও একবার পরিস্ফুট হয়েছে। মোদি ও ভ্লাদিমির পুতিনের বৈঠকে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, মহাকাশ, শিল্প, বাণিজ্য-সহ একাধিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির অবস্থানের মধ্যে দূরত্ব ছিল। দীর্ঘ আলোচনার পরও শেষ পর্যন্ত যৌথ ঘোষণাপত্রে ঐকমত্য তৈরি হওয়াকে তাই ভারতের সভাপতিত্বের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে এখানেই প্রশ্ন—এটি কি ভারতের ‘কূটনৈতিক জয়’? উত্তর—হ্যাঁ, তবে শর্তসাপেক্ষে। কারণ ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য এখনও প্রবল। চিন-ভারত সীমান্ত সমস্যা মেটেনি, ডলার-নির্ভরতা কমানোর মতো বৃহৎ অর্থনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়নও সময়সাপেক্ষ। ব্রিকসকে কার্যকর শক্তিতে পরিণত করতে ঘোষণার পাশাপাশি বাস্তব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।
তবু এই সম্মেলন ভারতের সামনে একটি বড় সম্ভাবনা খুলে দিয়েছে। একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক, অন্যদিকে চিনের সঙ্গে সংলাপ; একই সঙ্গে গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বের দাবি এবং পশ্চিমের সঙ্গেও ভারতের সম্পর্ক—এই চারটি ভারসাম্য একসঙ্গে ধরে রাখার ক্ষমতাই নয়াদিল্লির আসল কূটনৈতিক শক্তি।
ব্রিকসের দিল্লি সম্মেলনে ভারত সেই ভারসাম্যের পরীক্ষায় আপাতত বেশ ভালোভাবেই উত্তীর্ণ।
